কলম্বাসের সহযোগীরাও তার কাজে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সম্রাটের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, তিনি স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তিনি ফ্রান্সিসক্যে দ্য ববাবদিলা নামে একজন রাজকর্মচারীকে সৈন্যসামান্ত দিয়ে পাঠালেন কলম্বাসের বিরুদ্ধে তদন্ত করবার জন্য। কয়েকদিন ধরে অনুসন্ধান করে রাজ্য স্থাপনের কোন অভিযোগ না পেলেও কলম্বাসের বিরুদ্ধে নির্বুদ্ধিতার অভিযোগ আনা হল। কারণ কলম্বাস কোন সম্পদশালী দেশ আবিষ্কার করবার পরিবর্তে সম্পদহীন দেশ আবিষ্কার করেছেন। যার জন্যে সম্রাটের বিরাট পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে।
এই অভিযোগে প্রথমে বন্দী করা হল কলম্বাসের ভাই ও পুত্রকে। তারপর কলম্বাসকে। কলম্বাসকে শৃঙ্খলিতে করে নিয়ে আসা হল স্পেনে। তাঁকে রাখা হল নির্জন করাগারে। সেখান থেকেই রানী ইসাবেলাকে চিঠি লিখলেন কলম্বাস।
রানী ইসাবেলা ছিলেন দয়ালু প্রকৃতির। তাছাড়া কলম্বাসের প্রতি বরাবরই ছিল তার সহানুভূতিবোধ। তাঁর চিঠি পড়ে তিনি মার্জনার আদেশ দিলেন।
পঞ্চাশ বছরে পা দিলেন তিনি। শরীরে তেমন জোর নেই কিন্তু মনের অদম্য সাহসে ভর দিয়ে চতুর্থ বারের জন্য সমুদ্র যাত্রার আবেদন করলেন। সম্রাট সম্মতি দিলেন, শুধু হিস্পানিওয়ালাতে প্রবেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।
১৫০২ সালের ১৯শে মে কলম্বাস শুরু করলেন তার চতুর্থ সমুদ্রযাত্রা। তার ইচ্ছে ছিল আরো পশ্চিমে যাবেন। পথে তুমুল ঝড় উঠল। নিরুপায় কলম্বাস আশ্রয় নিলেন এক অজানা দ্বীপে।
কলম্বাস পৌঁছেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক দ্বীপে। সেখান থেকে ফিরে যান জামাইকা দ্বীপে। ক্রমশই তার দেহ ভেঙে পড়েছিল। অজানা রোগে তার সঙ্গীদের অনেকেই মারা গিয়েছিল। দু বছর পর নিরুৎসাহিত মনে স্পেনে ফিরে এলেন।
এরপর আর মাত্র দু বছর বেঁচে ছিলেন। যদিও অর্থ ছিল কিন্তু মনের শান্তি ছিল না। রাজ অনুগ্রহ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছিলেন। তার আবিষ্কারের গুরুত্ব উপলব্ধি করবার ক্ষমতা দেশবাসীর ছিল না।
১৫০৬ সালে ভ্যাসাডোলিড শহরে এক সাধারণ কুটিরে সকলের অগোচরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কলম্বাস। সেখানে থেকে তার মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে ডেমিঙ্গোতে সমাধি দেওয়া হয়।
৩৬. হেলেন কেলার (১৮৮০-১৯৬৮)
হেলেনের জন্ম ১৮৮০ সালের ২৭ জুন উত্তর আমেরিকার টুসকুমবিয়া নামে এক ছোট শহরে। বাবার নাম আর্থার কেলার, মায়ের নাম ক্যাথরিন। আর্থার ছিলেন সামরিক বিভাগের একজন অফিসার। জন্ম সূত্রে সুইডিশ। তার পূর্বপুরুষরা ভাগ্য অন্বেষণে আমেরিকায় এসেছিল।
জনের সময় হেলেন ছিলেন সুস্থ সবল স্বাভাবিক আর দশটি শিশুর মত। এক বছর বয়সে তার কলকাকলি আর চঞ্চল পদশব্দে সমস্ত ঘর ভরে উঠত। দেখতে দেখতে এক বছর সাত মাসে পা দিলেন হেলেন। একদিন মা তাকে গোসল করিয়ে ঘর থেকে বার হচ্ছিলেন। মায়ের কোল থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন হেলেন। সাথে সাথে জ্ঞান হারালেন হেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল তখন প্রবল জ্বর। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখলেন আর জ্বর নেই হেলেনের। হঠাৎ যেমন জ্বর এসেছিল তেমনিভাবেই জ্বর ছেড়ে গিয়েছে। আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠলেন মা-বাবা। তখন তারা কল্পনাও করতে পারেননি ভয়ঙ্কর এক দুর্যোগ নেমে এসেছে তাদের একমাত্র সন্তানের জীবনে।
অল্প কিছুদিন যেতেই অনুভব করলেন, আকস্মিক আসা সেই জ্বর কেড়ে নিয়েছে হেলেনের দৃষ্টিশক্তি আর শ্রবণশক্তি। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বললেন, পাকস্থলী আর মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার জন্যই হেলেনের জীবনের এই বিপর্যয়।
মেয়ের এই অসহায়তা দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন কেলার দম্পতি। তারা ধরেই নিয়েছিলেন এই মেয়ের জীবনে আর কোন আশা নেই, আলো নেই। একমাত্র যদি কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটে।
হেলেন তখন পাঁচ বছর বয়স। চিকিৎসকদের উপর সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন আর্থার। এমন সময় সংবাদ পেলেন গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শী এক ব্যক্তি নাকি দুরারোগ্য যে কোন ব্যাধি সারাতে পারেন। হেলেনকে তার কাছে নিয়ে গেলেন আর্থার। গুপ্তবিদ্যার প্রভাব হেলেনের জীবনে কোন পরিবর্তন হল না, কিন্তু সেই ভদ্রলোক হেলেনকে লেখাপড়া শেখাবার পরামর্শ দিলেন। তাহলে হয়ত হেলেনের জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে।
আর্থার ভেবে পেলেন না তার এই বোবা অন্ধ মেয়েকে কিভাবে লেখাপড়া শেখাবেন।
ভাগ্যক্রমে সেই সময় ওয়াশিংটনের বিখ্যাত ডাক্তার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে পরিচয় হল। ডাক্তার বেল তাকে পরামর্শ দিলেন বোস্টনের পার্কিনস ইনষ্টিটিউশনের সাথে যোগাযোগ করতে। এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন ডাক্তার
হো। এখানে অন্ধদের কিভাবে শিক্ষা দেওয়া যায় তাই শিক্ষা দেওয়া হত।
ডাক্তার হো হেলেনের মত একটি অন্ধ বোবা মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। স্বামীর সাথে ক্যাথারিনও এই প্রতিষ্ঠানটির সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।
সেই সময়ে হো মারা গিয়েছিলেন। পার্কিনস ইনস্টিটিউশনের নতুন ডিরেক্টর হয়ে এসেছিলেন মাইকেল এ্যাগানোস। তিনি কেলার দম্পতির মুখে হেলেনের সমস্ত কথা শুনে একজন শিক্ষয়িত্রীর উপর তার শিক্ষার ভার দেবার পরামর্শ দিলেন।
একদিন সকালে আলবামা শহরে কেলার পরিবারের বাড়িতে এসে হাজির হলেন একুশ বছরের এক তরুণী মিস অ্যানি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড। হেলেন কেলারের অন্ধকার জীবনে তিনি নিয়ে এলেন প্রথম আলো।
