কলম্বাসের সাথে এই সময় একদিন পরিচয় হল ফাদার পিরেজ-এর। ফাদার পিরেজ ছিলেন রাজ পরিবারের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং রানী ইসাবেলা তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন।
কলম্বাসের ইচ্ছার কথা ফাদার নিজেই রাণী ইসাবেলাকে বললেন। অনুরোধ। করলেন যদি তাকে কোনভাবে সাহায্য করা যায়। ফাদারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না রাণী। নতুন দেশ আবিষ্কারের সাথে সাথে বহু মানুষকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার পুণ্য অর্জন করা যাবে।
ফাদার পিরেজ ছাড়াও আরো কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি কলম্বাসের সমর্থনে এগিয়ে এলেন।
কলম্বাসের সব অনুরোধ স্বীকার করে নিলেন সম্রাট। ১৭ই এপ্রিল, ১৪৯২ তাদের মধ্যে চুক্তি হল। কলম্বাসকে নতুন দেশের শাসনভার দেওয়া হবে আর অর্জিত সম্পদের এক দশমাংশ অর্থ দেওয়া হবে।
সম্রাটের কাছ থেকে অর্থ পেয়ে তিনখানা জাহাজ নির্মাণ করলেন কলম্বাস। সবচেয়ে বড় ১০০ টনের সান্তামারিয়া, পিণ্টা ৫০ টন, নিনা ৪০ টন। জাহাজ তৈরির সময় কোন বিঘ্ন দেখা গেল না। সমস্যা সৃষ্টি হল নাবিক সংগ্রহের সময়। কলম্বাসের সাহায্যে এগিয়ে এল পিনজন ভাইরা। তাদের সাথে আরো কিছু বিশিষ্ট লোকের চেষ্টায় সর্বমোট ৮৭ জন নাবিক পাওয়া গেল।
অবশেষে ৩ আগস্ট, ১৪৯২ কলম্বাস তার তিনটি জাহাজ নিয়ে পাড়ি দিলেন অজানা সমুদ্রে। সেদিন বন্দরে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের অধিকাংশই ভেবেছিলেন কেউই আর সেই অজানা দেশ থেকে ফিরে আসবে না।
ভেসে চললেন কলম্বাস। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। দিনের পর দিন অতিক্রান্ত হয়। কোথাও স্থলের দেখা নেই, অধৈর্য হয়ে ওঠে নাবিকরা। সকলকে সান্ত্বনা দেন, উৎসাহ দেন কলম্বাস কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈৰ্য্য রাখতে পারে না নাবিকরা। সকলে একসাথে বিদ্রোহ করে, জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
কলম্বাসের চোখে পড়ে ভাঙা গাছের ডাল। সবুজ পাতা। অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, তারা স্থলের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছেন। নাবিকদের কাছে শুধু একটি দিনের প্রার্থনা করেন। দিনটি ছিল ১২ অক্টোবর। একজন নাবিক, নাম রোডরিগো প্রথম দেখলেন স্থলের চিহ্ন। আনন্দে উল্লাসে মেতে উঠলেন সকলে।
পরদিন কলম্বাস নামলেন বাহমা দ্বীপপুঞ্জের এক অজানা দ্বীপে। পরবর্তীকালে তিনি সেই দ্বীপের নাম রাখেন সান সালভাদর। (বর্তমান নাম ওয়েস্টলিং আইল্যাণ্ড)। এই দিনটি আজও উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বাস দিবস হিসাবে উদ্যাপন হয়।
কলম্বাস ভেবেছিলেন সমুদ্র পথে তিনি এশিয়ায় এসে পৌঁছেছেন। যেখানে অফুরন্ত সোনাদানা ছড়ানো আছে। কিন্তু কোথায় আছে সেই সম্পদ…? দিনের পর দিন চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না ধনসম্পদের কোন চিহ্ন। কলম্বাস গেলেন কিউবা এবং হিস্পানিওয়ালাতে দ্বীপে স্থির করলেন, এখানে সাময়িক আস্তানা স্থাপন করে ফিরে যাবে স্পেনে। এরপর আরো বিরাট সংখ্যক লোক এনে অনুসন্ধান করবেন ধনরত্নের। হিস্পানিওয়ালাতে সাময়িক আস্তানা গড়ে তুললেন। সেখানে ৪২ জন নাবিকের থাকার ব্যবস্থা করে রওনা হলেন স্বদেশভূমির পথে। নতুন দ্বীপে পৌঁছবার প্রমাণস্বরূপ কিছু স্থানীয় আদিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।
শূন্য হাতে ফিরে এলেও দেশে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন কলম্বাস। তাঁর সম্মানে রাজা-রাণী বিরাট ভোজের আয়োজন করলেন। স্বয়ং পোপ কলম্বাসকে আশীর্বাদ জানিয়ে ঘোষণা করলেন, নতুন আবিষ্কৃত সমস্ত দেশ স্পেনের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সম্রাট ফার্দিনান্দ নতুন অভিযানের আয়োজন করলেন। বিরাট নৌবহর, অসংখ্য লোকজন নিয়ে ১৪৯৩ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর কলম্বাস আটলান্টিক পার হয়ে দ্বিতীয় সমুদ্র অভিযানে যাত্রা করলেন।
দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার পর কলম্বাস গিয়ে পৌঁছলেন হিস্পানিওয়ালাতে। সেখানে গিয়ে দেখলেন তার সঙ্গী-সাথীদের একজনও আর জীবিত নেই। কিছু মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য মারা গিয়েছে। অবশিষ্ট সকলে স্থানীয় আদিবাসীদের হাতে মারা পড়েছে।
এই দ্বিতীয় অভিযানের সময় কলম্বাস চারদিকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেও কোন ধনসম্পদের সামান্য মাত্র চিহ্ন খুঁজে পেলেন না। শুধু মাত্র নতুন কিছু দ্বীপ আবিষ্কার করলেন। কোন অর্থ সম্পদ না পেয়ে জাহাজ ভর্তি করে স্থানীয় আদিবাসীদের দার্স হিসাবে বন্দী করে স্পেনে পাঠলেন। তখনো ইউরোপের বুকে দাস ব্যবসায়ের ব্যাপক প্রচলন ঘটেনি। কলম্বাসের এই কাজকে অনেকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করতে পারল না। তাছাড়া আদিবাসীদের বিরাট অংশই নতুন পরিবেশে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যে মারা পড়ল। ইসাবেলা কলম্বাসের এই আচরণকে অন্তর থেকে সমর্থন করত পারলেন না।
এই সংবাদ কলম্বাসের কাছে পৌঁছতে বিলম্ব হল না। তিনি আর মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব করলেন না। আড়াই বছর পর ১৪৯৬ সালের ১১ জুন ফিরে এলেন স্পেনে। কিন্তু প্রথম বারের মত এবারে কোন সম্বর্ধনা পেলেন না। কিন্তু অজেয় মনোবল কলম্বাসের।
নতুন অভিযানের জন্য আবেদন জানালেন কলম্বাস। প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিলেন সম্রাট।
১৪৯৮, ৩০শে মে তৃতীয়বারের জন্য অভিযান শুরু করলেন কলম্বাস। এই বার তার সঙ্গী হল তার পুত্র এবং ভাই। কলম্বাসের জীবনের সৌভাগ্যের দিন ক্রমশই অস্তমিত হয়ে এসেছিল। হিস্পানিওয়ালার স্থানীয় মানুষেরা ইউরোপীয়ানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঘোষণা করল। মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত কলম্বাস অত্যাচারী শাসকের মত কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন করলেন। শত শত মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল।
