জীবনের এই পর্যায়ের বেশ কিছু লিথোগ্রাফের মধ্যে তার একদিকে জীবন সাধনা অন্যদিকে নারীর প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ-এই দুই-এর মধ্যেকার অনুরাগ এবং দ্বন্দুকে অপূবং শৈলীতে মূর্ত করে তুলেছেন।
১৯৬৮ সালে ৮৭ বছর বয়েসে তিনি করলেন এক বিস্ময়কর কাজ “Tour de Force”। দীর্ঘ সাত মাস ধরে তিনি ৩৪৭টি এনগ্রেভিং-এর মধ্যে দিয়ে মানুষের জৈব কামনাকে চিত্রিত করেছেন। এর অনেক ছবির মধ্যেই ফুটে উঠেছে এক জটিল দুর্বোধ্যতা।
নিজের জীবিতকালেই পিকাসো হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সংগ্রহশালা প্যারিসের লুভর মিউজিয়াম। ১৯৫৫ সালে এই মিউজিয়ামে পিকাসোর সমস্ত শিল্পকীর্তির এক বিরাট প্রদর্শনী হয়েছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্প অনুরাগীরা এই প্রদর্শনীতে এসেছিলেন।
শুধু তার সৃষ্টির উৎকর্ষতা নয়, সৃষ্টির পরিমাণ দেখলেও বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। প্রায় ১৫০০ ক্যানভাস, ১০০০০ লিথো প্রিন্ট, ৩০০ ভাস্কর্য সিরামিক মাটির কাজ এছাড়াও প্রায় ৩৫০০০ ছোট ছোট ছবি।
১৯৭০ সালে তার সমস্ত জীবনব্যাপী শিল্পকর্ম বার্সিলোনার মিউজিয়ামকে দান করে যান। মাতৃভূমির প্রতি এই ছিল তার শেষ শ্রদ্ধার্ঘ।
১৯৭৩ সালের ৮ই এপ্রিল। ফ্রান্সের মুগা শহরে পিকাসোর শিল্পজীবনের পির সমাপ্তি ঘটল। প্রকৃত পক্ষে পিকাসোর জীবনটাই ছিল এক বিরাট শিল্প। মৃত্যুতেও যে শিল্পের লয় হয় না।
৩৫. ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬)
ইতালির জেনোয়া শহরে কলম্বাসের জন্ম। সঠিক দিনটি জানা যায় না। তবে অনুমান ১৪৫১ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর, এর মধ্যে কোন এক দিনে জন্ম হয়েছিল কলম্বাসের। বাবা ছিলেন তন্তুবায়। কাপড়ের ব্যবসা ছিল তার। সেই সূত্রেই কলম্বাস জানতে পেরেছিলেন প্রাচ্য দেশের উৎকৃষ্ট পোশাক, নানান মশলা, অফুরন্ত ধনসম্পদের কথা।
সেই ছেলেবেলা থেকেই মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে জাহাজ নিয়ে পাড়ি দেবেন ভারতবর্ষে। জাহাজ বোঝাই করে বয়ে নিয়ে আসবেন হীরে মণি মুক্তা মাণিক্য।
কলম্বাস ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী, অধ্যাবসায়ী। কিন্তু অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে ভাগ্য ছিল নিতান্তই প্রতিকূল। তাই অতিকষ্টে জীবন ধারণ করতেন কলম্বাস। কলম্বাসের ভাই তখন লিসবন শহরে বাস করতে। ভাই-এর কাছ থেকে ডাক পেয়ে কলম্বাস লিসবন শহরে গিয়ে বাসা বাধলেন। কলম্বাসের বয়স তখন আটাশ বছর।
অল্পদিনের মধ্যেই ছোটখাট একটা কাজও জুটে গেল। কাজের অবসরে মাঝে মাঝে গীর্জায় যেতেন। একদিন সেখানে পরিচয় হল ফেলিপা মোঞিস দ্য পেরেস্ত্ৰেল্লো নামে এক তরুণীর সাথে। ফেলিপার বাবা বার্থলোমিউ ছিলেন সম্রাট হেনরির নৌবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ অফিসার।
কলম্বাসের জীবনে এই পরিচয় একগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরিচর্য পর্ব অল্পদিনেই অনুরাগে পরিণত হল। তারপর বিবাহ। বিবাহের পর কলম্বাস শ্বশুরের গৃহেই থাকতেন। শ্বশুরের কাছে শুনতেন তার প্রথম যৌবনের সমুদ্র অভিযানের সব রোমাঞ্চকর কাহিনী। অন্য সময় লাইব্রেরী ঘরে বসে পড়তেন দেশ-বিদেশের নানান ভ্রমণ কাহিনী। এই সময়ে একদিন তার হাতে এল মার্কো পেলোর চীন ভ্রমণের ইতিবৃত্ত। পড়তে পড়তে মনের মধ্যে প্রাচ্য দেশে যাবার স্বপ্ন নতুন করে জেগে উঠল।
এর পেছনে কাজ করছিল দুটি শক্তি। রোমাঞ্চকর অভিযানের দূরন্ত আকাঙ্ক্ষা, দ্বিতীয়ত স্বর্ণতৃষ্ণা। তখন মানুষের ধারণা ছিল প্রাচ্য দেশের পথে ঘাটে ছড়িয়ে আছে। সোনা-রূপা। সে দেশের মানুষের কাছে তার কোন মূল্যই নেই। ইচ্ছা করলেই তা জাহাজ বোঝাই করে আনা যায়।
কলম্বাস চিঠি লিখলেন সে যুগের বিখ্যাত ভূগোলবিদ Pagolo Toscanelli কে। Pagolo কলম্বাসের চিঠির জবাবে লিখলেন–
“তোমার মনের ইচ্ছার কথা জেনে আনন্দিত হলাম। আমার তৈরি সমুদ্র পথের একটা নকসা পাঠালাম। যদিও এই নকশা নির্ভুল নয়, তবুও এই নকশার সাহায্যে প্রাচ্যের পথে পৌঁছতে পারবে। যেখানে ছড়িয়ে আছে অফুরন্ত হীরে জহরৎ সোনা রূপা মণি মুক্তা মানিক্য।
এট চিঠি পেয়ে কলম্বাসের মন থেকে সব সংশয় সন্দেহ দূর হয়ে গেলে শুরু হয়ে গেল তার যাত্রার প্রস্তুতি।
কলম্বাসের ইচ্ছার কথা শুনে সকলে অবাস্তব অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিল। অনেকে তাকে উপহাস করল। কেউ কেউ তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেও ছাড়ল না। একটি মানুষও এগিয়ে এল না তার সমর্থনে বা সাহায্যে।
কলম্বাসের অনুরোধে স্পেনের রানী ইসাবেলা সহৃদয় বিবেচনার আশ্বাস দিলেও সম্রাট ফার্দিনান্দ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন। ইতিমধ্যে কলম্বাসের স্ত্রী ফেলিপা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সমস্ত চিকিৎসা সত্ত্বেও অসুখ ক্রমশই গুরুতর হয়ে উঠল। দূর প্রাচ্য অভিযানে পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে ফুল। কিছুদিন পর মারা গেলেন ফেলিপা।
কলম্বাসের জীবনের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। এবার নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তার অভিযানে। দেশের প্রায় প্রতিটি ধনী সম্ভ্রান্ত মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ান। জাহাজ চাই, নাবিক চাই, অর্থ চাই।
কলম্বাসের দাবি ছিল যে দেশ আবিষ্কার হবে, তাকে সেই দেশের ভাইসরয় করতে হবে আর রাজস্বের একটা অংশ দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে দু-একজন সম্মতি দিলেও কলম্বাসের দাবির কথা শুনে সকলেই তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।
