পিকাসোর জীবনের প্রথম নারী ফেরানডে অলিভিয়ের। ১৯০৪ সালে পিকাসো যখন আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছেন, সেই সময় অলিভিয়ের সাথে পরিচয়। অলিভিয়ের সৌন্দর্য ব্যক্তিত্ব তাকে মুগ্ধ করেছিল। দীর্ঘ ৯ বছর দুজনের মধ্যে ছিল গভীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ না হলেও দুজনে থাকতেন স্বামী-স্ত্রীর মত।
১৯১৭ সালে একটি রাশিয়ান ব্যালে দল নৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য প্যারিসে এসেছিল। পিকাসোর খ্যাতির কথা শুনে তাকে শিল্পী দলের পোশাকের পরিকল্পনা এবং মঞ্চের দৃশ্যপট আঁকবার দায়িত্ব দেওয়া হল। এই দলের প্রধান শিল্পী ছিলেন এলগা কোকোলভা। দুজনে পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। প্যারিসের অনুষ্ঠান শেষ করে দশটি গেল মাদ্রিদ এবং বার্সিলোনায়। পিকাসোও এই দলের সঙ্গী হলেন। স্পেনে থাকার সময়েই ওলগাকে বিবাহ করেন পিকাসো। বিবাহের এক বছর পরেই পিকাসোর প্রথম পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করল।
বিয়ের অল্প কিছুদিন পরেই সস্ত্রীক প্যারিসে ফিরে এলেন পিকাসো। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হয়েছে, পিকাসোর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু কবি এ্যাপোনিয়ার আহত হয়ে মারা গিয়েছেন। এই সংবাদ যখন পিকাসোর কাছে এসে পৌঁছাল, তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রতিকৃতি আঁকছিলেন। এইভাবে পিকাসো নিজের বহু ছবি এঁকেছেন। বন্ধুর মৃত্যুতে এতখানি বিহ্বল হয়ে পড়লেন, সেই ছবি আর সমাপ্ত করেননি এবং এর পর জীবনে আর কোন দিনই নিজের ছবি আঁকেননি।
বন্ধুর স্মৃতিতে তিনি আঁকলেন তার একটি বিখ্যাত ছবি The Three Dancers বা তিন নর্তকী। এতে ফুটে উঠেছে মানুষের যন্ত্রণার এক তীব্র বিলাপ।
মানবিক যন্ত্রণার এই রূপ পরবর্তীকালে বারবার নানাভাবে দেখা দিয়েছে তার ছবিতে। এক একটি ছবিতে ফুটে উঠেছে খণ্ড-বিখণ্ডিত দেহ, ছিন্ন মুখ, উৎপাটিত চোখ দাঁত। তিনি দেখেছিলেন মানুষের উপরে শক্তিমানের অত্যাচার অত্যাচারিত পীড়িত মানুষের যন্ত্রণার করুণ প্রতিচ্ছবি। এরই মূর্ত প্রকাশ ঘটেছে ‘গোয়ের্নিকা ছবিতে।
১৯৩৭ সালে স্পেনের অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ ঘোষণা করল। দেশে শুরু হল গৃহযুদ্ধ। ১৯৩৯ সালে শাসকদের বোমারু বিমান স্পেনের ছোট্ট শহর গোয়ের্নিকার উপর বোমা বর্ষন করল। এই ঘটনায় ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়লেন পিকাসো। স্পেনের সরকারের তরফে তাকে বহু সম্মান খেতাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি ছিলেন মাদ্রিদ আর্ট কলেজের ডিরেকটার। সব কিছুকে ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করে তিনি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে তুলি ধরলেন। তার ছবি গোয়ের্নিকা হয়ে উঠল এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। ছবিটি ১১ ফুট চওড়া, লম্বায় ২৬ ফুট। এই বিশাল ছবিটি আঁকতে তার সময় লেগেছিল মাত্র সাত সপ্তাহ। কালো সাদা ধূসর রঙে আঁকা এই ছবি আধুনিক চিত্রশিল্পের জগতে এক অনন্য সৃষ্টি।
১৯২৭ সালে পিকাসোর জীবনে এল আরেক নারী। নাম মারি থেরেসা ওয়ালটার। মারি ছিল পিকাসোর ছবির মডেল। অল্পদিনের মধ্যেই দুজনের সম্পর্ক গড়ে উঠল। এই সম্পর্কের পরিণতিতেই ভাঙন ধরল ওলগার সম্পর্কে। ক্রমশই দুজনের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠল। চরম ঘৃণার মধ্যেই ১৯৩৫ সালে দুজনের বিচ্ছেদ ঘটে গেল। পরের বছর মারির একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। মারি ছিল অসাধারণ সুন্দরী। পিকাসোর ছবিতে বার বার কামময়ী নারীমূর্তি হিসাবে দেখা গিয়েছে মারিকে কন্যা সন্তান জন্মবার পরেই দুজনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় তাছাড়া পিকাসোর জীবনের তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। কারণ সেই সময় তর সঙ্গী হয়েছে যুগোশ্লাভ ফটোগ্রাফার ডোরা মা।
ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে এসেছিল। তিনি ফরাসী কমিউনিস্ট মাটিতে যোগ দিলেন।
মস্কোর সাথে কোন সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। কমিউনিস্ট পার্টির তরফে যে আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন বসেছিল তাতে তিনি পর পর তিন বছর যোগদান করেছিলেন। প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় শান্তি সম্মেলনে পিকাসো লিথোগ্রাফে শান্তির প্রতীক হিসাবে সাদা পায়রার ছবি আঁকেন। উত্তরকালে এই ছবিকেই শান্তি প্রতীক হিসাবে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ গ্রহণ করেছে।
শিল্পের ইতিহাসে ছবি বিক্রি করে পিকাসো যে পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন তার এক শতাংশও কেউ পায় নি। তার ছবির বাজার ছিল সমস্ত পৃথিবীর জুড়ে। ইউরোপ আমেরিকার ধনী মানুষেরা তার একটি ছবির জন্য লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করতে সামান্যতম দ্বিধা করত না। ছবির বিক্রির সময় পিকাসো পাকা ব্যবসাদারদেরও লজ্জা দিতেন।
অর্থ, খ্যাতি, সম্মান, নারীসঙ্গ পিকাসোর জীবনে অপরিমেয়ভাবে এলেও তা কখনো তার শিল্পসৃষ্টিকে ব্যাঘাত করেনি। শিল্প সাধনার সময় তিনি প্রায় সাধকের স্তরে উত্তীর্ণ হতেন।
তিনি কি না করেছেন–কিউবিজম, এক্সপ্রেশনিজম, সুরিয়ানিজম, ভাস্কর্য, কারুশিল্প, মঞ্চসজ্জা, পোশাক পরিকল্পনা, পোস্টার এচিং, লিথোগ্রাফ বই-এর অলংকরণ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অনন্য সাধারণ। লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চির পর শিল্পজগতের ইতিহাসে এমন বহুমুখী প্রতিভার আর জন্ম হয়নি।
শুধু শিল্পী নয়, পিকাসো ছিলেন কবি। তার কবিতা সে যুগে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিল।
