কনফুসিয়াস একাত্তর বছরে পা দিয়েছেন। মাঝে মাঝেই তার শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। বুঝতে পারছিলেন তার জীবন শেষ হয়ে আসছে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৯, সঠিক দিনটি জানা যায় নি। কনফুসিয়াস তার শিষ্যদের কাছে ডাকলেন, বললেন, তোমারই আমার শেষ কাজ করবে। কোন আড়ম্বর করো না। বিলাস আড়ম্বরের মধ্যে দিয়ে গেলে ঈশ্বরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারব না।
কনফুসিয়াসের মৃত্যুর পর শিষ্যরা তাঁর সমাধিস্থলকে ঘিরে মন্দির গড়ে তুলল। সেখানেই কুঁড়েঘর করে বাস করতে থাকে। তিন বছর ধরে এইভাবে তারা শোক পালন করে।
কনফুসিয়াস নতুন কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেননি। কোন মতবাদ বা দর্শনের জন্ম দেননি। বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। যা কিছু ছিল তাকেই নতুনভাবে প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তন করেছেন। যখন কেউ তাকে স্বর্গ, ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রশ্ন করত, তিনি নিজের বুকের উপর হাত রেখে বলতেন, এখানেই আছে স্বর্গ ঈশ্বর।
তিন বলতেন, দয়া, সততা, পবিত্রতা, ভালবাসা, জ্ঞান, মহত্ত্বতা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। এই সব গুণের মধ্যে দিয়েই মানুষ নিজেকে দেবত্বে উন্নীত করতে পারে, অন্যের শ্রদ্ধা-ভালবাসা অর্জন করতে পারে।
কনফুসিয়াসের মধ্যে এই সমস্ত গুণের সমাবেশ ঘটেছিল বলেই আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে তার শ্রদ্ধার আসন পাতা রয়েছে।
৩৩. বারট্রান্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০)
এ প্রজ্ঞাবান মানুষটির জন্ম হয় ইংল্যন্ডের মন্মথশায়ারের ট্রেলাক গ্রামে। জন্মতারিখ (১৮৭২ সালে ১৮ই মে)। ইংল্যন্ডের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। দাদু লর্ড জন রাসেল ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। বাবা ভাইকাউন্ট ছিলেন পার্লামেন্টের সদস্য। পরিবার পরিকল্পনা সপক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি তার সদস্যপদ হারান। তার মাও ছিলেন উদারনৈতিক চরিত্রের মহিলা। শৈশবেই বাবা-মাকে হারান রাসেল।
এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “আমার ছেলেবেলা ছিল চরম বিয়োগান্তক। জন্মের এক বছর পরেই বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। চাচা হঠাৎ উন্মাদ হয়ে গেলেন। মা আর বোন একই সাথে ডিপথেরিয়ার মারা গেলেন। ১৮ মাস পর বাবা মারা গেলেন। ভাই ফ্রাঙ্ক কাঁদছিল, আমি চুপ করে সব দেখছিলাম।”
মা-বাবার অবর্তমানে শিশু রাসেলের সব ভার নিজের হাতে তুলে নেন দাদী রাসেল।
বাড়িতেই পড়াশুনা শুরু হল। একজন জার্মান গভর্নেস ও ইংরেজ শিক্ষকের তত্ত্ববধানে তিনি সাহিত্য, বিজ্ঞান, অঙ্কের পাঠ নিতে আরম্ভ করলেন। ভাইয়ের কাছে শিখতেন জ্যমিতি। কিন্তু তার প্রিয় বিষয় ছিল বীজগণিত।
১৮৯০ সালে আঠারো বছর বয়সে কেমব্রিজের ট্রিনটি কলেজে ভর্তি হলেন। তার বিশেষ আগ্রহ ছিল গণিতে। এখান থেকে গণিতে প্রথম হলেন ট্রাইপোস। পরে সপ্তম বাংলার।
গণিত ছাড়াও তার আকর্ষণ ছিল দর্শনে। দর্শনে সম্মানের সাথে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে কলেজের ফেলো নির্বাচিত হলেন।
কেমব্রিজে ছাত্র অবস্থাতেই পরিচয় হয় অ্যালিস পিয়ার্সন স্মিথ নামে এক আমেরিকান তরুণীর সাথে। অল্পদিনেই দুজনে গভীর প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন ১৮৯৪ সালে দুজনের বিয়ে হল। রাসেল তখন মাত্র ২২ বছরের যুবক।
বিয়ের অল্প কিছুদিন পর রাসেল জার্মানিতে গিয়ে সেই সময়কার বিখ্যাত অঙ্কশাস্ত্রবিদ অধ্যাপক ভায়ারট্রাসের সাথে একসাথে গণিত সংক্রান্ত কিছু কাজকর্ম করলেন। এখানে তিনি গণিতে অধ্যাপনাও করেছেন।
১৯০০ সালে রাসেলের জীবনে ঘটল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্যারিসে বসেছিল দর্শনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন।
ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি এবং অধ্যাপক হোয়াইটহেড একই সাথে গবেষণা শুরু করলেন। ১৯০২ সাল থেকে ১৯১০ দীর্ঘ আট বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর প্রকাশ করলেন গণিতশাস্ত্র সম্বন্ধনীয় যুগান্তকারী রচনা প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Principia Mathematica)।
প্রিন্সিপিয়া উত্তরকালে গণিতজ্ঞদের কাছে এক অমূল্য গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। অঙ্কশাস্ত্রের উপর এমন প্রামাণ্য গ্রন্থ খুব কমই রচিত হয়েছে। দুই মহান পণ্ডিতের অক্লান্ত সাধনার ফলশ্রুতি এই গ্রন্থ।
১৯০৮ সালে তিনি লন্ডনের রয়াল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন। তার প্রিন্সিপিয়া রচনা শেষ করে তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেন। তিনি পার্লামেন্টের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার ব্যাপারে মনস্থির করলেন।
১৯১০ সালে লিবারেল পার্টির প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়ালেন। কিন্তু স্থানীয় ভোটদাতারা সরাসরি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলল, রাসেল ঈশ্বর মানেন না, চার্চে যান না। এমন লোককে ভোটে নির্বাচিত করার কোন অর্থই হয় না। ভোটে পরাজিত হলেন রাসেল।
উত্তরকালে আরো দুবার তিনি পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, দুবারই পরাজিত হন।
১৯১৪ সালে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রাসেল ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। তিনি ইংল্যান্ডের মানুষদের সঙ্গী মনোবৃত্তির তীক্ষ্ণ সমালোচনা করলেন।
তার এই যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের জন্য সমস্ত দেশবাসীর কাছে অপ্রিয়ভাজন হয়ে উঠলেন। রাসেলকে অভিযুক্ত করা হল এবং তার বিরুদ্ধে জরিমানা ধার্য করা হল। তিনি জরিমানা দিতে অস্বীকার করলেন। এর জন্যে তার গ্রন্থাগারের অধিকাংশ বই বিক্রি করে জরিমানার অর্থ আদায় করা হল।
