কনফুসিয়াস উপলব্ধি করতে পারেন তার আদর্শকে গ্রহণ করবার মত মানুষ কোথাও নেই। তবুও তিনি শিক্ষা দিতে থাকেন। তাঁর ছাত্র সংখ্যা বেড়েই চলে। তিনি যেখানে যখন যেতেন সেখানেই তার সঙ্গে ছাত্রেরা যেত।
কনফুসিয়াস যখন যে রাজ্যে যেতেন সেইখানে খোঁজ করতেন, কোথায় গ্রন্থাগার আছে। সেখানে কোন প্রাচীন পুঁথির সন্ধান পেলেই গভীর মনোযোগ সহকারে তা পড়তেন। সমস্ত জীবন তিনি নিজেকে মনে করতেন একজন শিক্ষার্থী। তাই যখন যেখানেই কোন জ্ঞানের সন্ধান পেতেন আগ্রহভরে তাকে গ্রহণ করতেন।
কনফুসিয়াসের জ্ঞানের কোন সীমা ছিল না। অতলান্ত সমুদ্রের মতই ছিল তার প্রজ্ঞা তাই দেশের যে প্রান্তেই যেতেন না কেন, সাধারণ প্রজা থেকে আরম্ভ করে ডিউজ রাজারও অবনত মস্তকে শ্রদ্ধায় তাঁর কাছে মাথা নত করত।
যখন কেউ কনফুসিয়াসকে প্রশ্ন করত মহত্ত্বতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কি? তিনি উত্তর দিতেন দয়া ও ত্যাগ। অন্যের প্রতি যখন মানুষের দয়া ও ভালবাসা জাগ্রত হবে তখন সে হবে প্রকৃত অর্থেই মহৎ মানুষ। তার উপরেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ত বর্ষীত হয়। অর্থলিন্দু মানুষ কখনো মহৎ হতে পারে না। সে নিয়তই ঈশ্বরের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
একদিন কনফুসিয়াসের এক শিষ্য তাঁকে প্রশ্ন করলেন, আমাদের সমাজ জীবনে মাঝে মাঝে মহৎ মানুষের আবির্ভাব হয়-এই মহৎ মানুষের সাথে অন্য সাধারণ মানুষের তফাৎ কি?
কনফুসিয়াস উত্তর দিলেন, একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ তার পারিপার্শ্বিক সমস্ত কিছুকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কোন কিছুই গভীরভাবে চিন্তা করে না। শ্রেষ্ঠ মানুষেরা মনে করেন ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু চালিত হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভাগ্যের হাতেই নিজেকে সঁপে দেয়। শ্রেষ্ঠ মানুষ সর্বদাই নিজের ক্রটি বিচ্যুতিকে বড় করে দেখে। এই ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে জীবনকে আরো ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়াই থাকে তার লক্ষ্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ সর্বদাই অন্যের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে বড় করে দেখে-নিজেকে মনে করে সর্বদোষ মুক্ত।
সেই সময় কনফুসিয়াস ছিলেন চেন রাজ্যে। তখন চীনের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে চলছে বিশৃঙ্খলতা। চেন রাজ্যেও শুরু হয়েছে অরাজকতা। শত্রু সৈন্য সীমান্ত অঞ্চলে জড় হয়েছে।
কনফুসিয়াস তাঁর শিষ্যদের বললেন, এই দেশ ত্যাগ করে অন্য কোন দেশে যেতে হবে।
কনফুসিয়াস বুঝল, আমরা মানব সমাজে বাস করি। মানুষের সমস্যা দেখে যদি পালিয়ে যাই তবে কখনোই যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারব না। পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
আবার চেন রাজ্যে ফিরে এলেন কনফুসিয়াস। তিনি তিন বছর সেখানে রয়ে গেলেন। তারপর কনফুসিয়াস গেলেন সাই নামে এক রাজ্যে। এই সময় চু নামে এক রাজ্যের বাইরে শিবির করেছিলেন। তারা কনফুসিয়াসকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানাল।
চু রাজার ইচ্ছে ছিল কনফুসিয়াসকে তার রাজ্যে একটি জমিদারী দান করবেন যাতে কনফুসিয়াস তাঁর রাজ্যেই স্থায়ীভাবে বাস করতে পারেন। কিন্তু চু রাজার প্রধানমন্ত্রী কনফুসিয়াসকে পছন্দ করত না। তার ভয় ছিল কনফুসিয়াসের মত জ্ঞানী পণ্ডিত মানুষ যদি চু রাজ্যে থাকে তবে রাজা তার পরামর্শ মতই সকল কাজ করবে। তাই প্রধানমন্ত্রী রাজাকে জমি দান করতে নিষেধ করল।
কনফুসিয়াস আবার পথে বেরিয়ে পড়লেন। মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ল রাজ্যের কথা। এই লু রাজ্যেই নিজের নীতি আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন তিনি। এক এক বার মনে হত তিনি ফিরে যাবেন লু রাজ্যে। পরমুহূর্তেই মনে হত যদি তারা তাকে গ্রহণ না করে। মনে মনে ব্যথিত হতেন কনফুসিয়াস।
অবশেষে কনফুসিয়াসের মনের আকাক্সক্ষা পূর্ণ হল। একদিন কনফুসিয়াস তাঁর শিষ্যদের নিয়ে এক শিবিরে বিশ্রাম করছিলেন। এমন সময় তিনখানি রথ এসে দাঁড়াল সেখানে। রথ থেকে নামল লু রাজ্যের তিন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তারা কনফুসিয়াসকে অভিবাদন করে বলল, তারা মহামান্য ডিউকের আদেশে কনফুসিয়াসকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন।
কনফুসিয়াস শিষ্যদের নিয়ে ফিরে এলেন লু রাজ্যে। রাজ্যের ডিউক ব্যারন উচ্চপদস্থ কর্মচারী সকলেই তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। কারণ তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিল কনফুসিয়াসের মত মানুষ খুব বেশি জন্মগ্রহণ করেন না। তাঁকে পরামর্শদাতা হিসাবে পাওয়া সকল রাজ্যের ভাগ্যের ঘটে না।
কিছুদিনের মধ্যেই লু রাজ্যে ফিরে এল তার পূর্বের সমৃদ্ধি। তিনি রাজ্যের শাসনভার পরিচালনার জন্য যে সব উপদেশ দিতেন তা আধুনিককালেও সমান গুরুত্পূর্ণ। তিনি বলতেন সরকার শুধু গরীবদেরই দেখাশুনা করবে না, বৃদ্ধ ও অশক্তদেরও সাহায্য করবে। তিনি কাজের শ্রমবিভাগ করে দিলেন। যে যার যোগ্যতা সামর্থ্য অনুসারে কাজ করবে। তিনি বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বেঁধে দিলেন। দেশের উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাবার জন্য ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের উপর নির্দিষ্ট হারে কর ধার্য করা হল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা হল। পুরনো রাস্তা ব্রিজ যাতে নিয়মিত মেরামত করা হয় সেই দিকে নজর রাখবার জন্য কর্মচারী নিয়োগ করা হল। তিনি বলতেন দেশের সর্বত্রই যেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের ধনী-দরিদ্র কোন মানুষই যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।
