১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে, তিনি ট্রিবিউনাল পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করবর অপরাধে কারারুদ্ধ হলেন। ইংল্যান্ডের মিত্রপক্ষ আমেরিকার বিরুদ্ধে এই লেখার জন্য ছ মাসের জন্য তাকে কারারুদ্ধ করা হল। কারাদণ্ড ভোগ করার অপরাধে তাকে ট্রিনটি কলেজের অধ্যাপকের পদ থেকে বিতাড়িত করা হয়।
কারাগারে বসেও এই জ্ঞানতাপস বৃথা সময় নষ্ট করেননি। এই সময় রচনা করলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Introduction to Mathematical Philosophy। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘ কয়েক বছর তিনি কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাননি। এই সময় লেখা ও বক্তৃতা দিয়ে উপার্জন করতেন।
ইতিমধ্যে রাশিয়ায় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। দেশে গড়ে উঠেছে সমাজতন্ত্র। রাসেল। সমাজবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন।
১৯২০ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। রাসেল ইংল্যান্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি হিসাবে রাশিয়ায় গেলেন। এখানে সাক্ষাৎ হল লেনিনের সাথে। রাশিয়ার নতুন সমাজব্যবস্থা দেখে হতাশ হয়েছিলেন রাসেল।
তার এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখেন “The practice and theory of Bolshevism”। রাশিয়ার ভ্রমনের পর তিনি চীনে যান। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
চীনে এসে পিকিং ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বক্তৃতা দিলেন। ছাত্রদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন।
চীন ভ্রমণের পর তিনি “চীনের সমস্যা” বলে একটি বই লেখেন। তাতে চীনের মানুষ, তাদের সংস্কৃতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
চীনে থাকার সময় ঠাণ্ডা লেগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শরীরের অবস্থা এত খারাপ হয়েছিল, সকলে তার জীবনের আশা প্রায় ত্যাগ করেছিল।
কিন্তু রাসেল অদম্য প্রাণশক্তির জোরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই সময় তাকে যিনি অক্লান্ত সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন তার নাম ডোরা ব্লাক। ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে রাসেল ডোরাকে বিবাহ করেন।
তিনি জীবনে চারবার বিবাহ করেছিলেন, এছাড়া বহু নারীর প্রেমে পড়েছিলেন।
তার প্রথমা স্ত্রী অ্যালিস ছিলেন স্বামীর প্রতি খুবই অনুরক্ত। কিন্তু একদিন পাহাড়ি পথে সাইকেল চালাতে চালাতে হঠাৎ তার মনের মধ্যে অ্যালিসের সম্বন্ধে অদ্ভুত এক শূন্যতা সৃষ্টি হল। তার প্রতি সব আকর্ষণ হারিয়ে ফেললেন। বাড়ি ফিরেই অ্যালিসের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা আনলেন।
ইতিমধ্যে মোরেল নামে এক বিবাহিত মহিলার প্রেমে পড়ে গেলেন রাসেল। অল্পদিনের মধ্যেই এই প্রেম ছিন্ন হয়ে গেল। এবার রাসেলের সঙ্গিনী হলেন মিস ডোরা ব্ল্যাক। বিবাহ না করলেও দুজনে স্বামী-স্ত্রীর মত থাকতেন। চীন থেকে ফেরার পর রাসেল ডোরাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেন।
রাসেলের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল না। নিজে পৈত্রিক সম্পত্তি বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে দান করে দিয়েছিলেন। এই সময় শুধুমাত্র লেখাই ছিল তার জীবিকা অর্জনের পথ। রাসেল শিক্ষা সম্বন্ধে বরাবরই গভীরভাবে চিন্তা করতেন। শিক্ষা সম্বন্ধীয় এই সব চিন্তা-ভাবনাকে তিনি প্রকাশ করেছেন তার দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “On education” ও “Education and the social order”-এ।
১৯২৯ সালে তিনি রচনা করলেন তার চেয়ে বিতর্কিত এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “ম্যারেজ অ্যান্ড মরালস” (Marriage and Morals)।
ডাক এল আমেরিকা থেকে। সপরিবারে গেলেন আমেরিকাতে। প্রথমে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন তারপর লস এঞ্জেলসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিলেন। এক বছর পর (১৯৪১) ডাক এল নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনের অধ্যাপনা করবার জন্য। কিন্তু তার ম্যারেজ অ্যান্ড মরালস বই-এর ইতিমধ্যে চারদিকে তর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। কলেজের এক ছাত্রীর মা অভিযোগ জানাল রাসেলের মত মানুষ শিক্ষক হলে তার মেয়ের সর্বনাশ হবে।
এছাড়া একজন বিশপ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাল তিনি ধর্ম ও নৈতিকতার বিরোধী। বিচারক ম্যাকগীহান এই অভিমতের সমর্থন করে আদেশ দিলেন রাসেলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না। এর জন্যে তিনটি কারণ দেখালেন। প্রথমত, রাসেল আমেরিকার নন, দ্বিতীয়ত, অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হবার জন্য তিনি কোন পরীক্ষা দেননি, তৃতীয়ত, তিনি যা লিখেছেন তা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক।
এই প্রসঙ্গে আইনস্টাইন মন্তব্য করেছিলেন এই সুন্দর পৃথিবীতে যাজকরাই বার বার মানুষকে উত্তেজিত করে আর প্রতিভাবানরা হয় নির্বাসিত।
এই সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউলিয়াম জেমস স্মারক বক্তৃতা দেবার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানান হল। তাকে বারনেস ফাউনডেশনের তরফ থেকে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত করা হল। তিনি এখানে পর পর বেশ কয়েকটি বক্তৃতা দিলেন। হঠাৎ তাকে পদচ্যুত করা হল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি যে সব বক্তৃতা দিয়েছেন তা মোটেই উন্নত মানের নয়। সবচেয়ে বিস্ময়ের, এই সময় তিনি যে সব বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা সংকলন করে প্রকাশিত হল “পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস।” এই যাবকাল পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস প্রসঙ্গে যত বই লেখা হয়েছে এটি তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
