শিক্ষক হিসাবে আচার্য হিসাবে তার খ্যাতি ক্রমশই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। এতদিন শুধু সাধারণ ঘরের ছেলেরাই তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করত। ক্রমশই অভিজাত ঘরের ছেলেরাও তার কাছে জ্ঞান লাভের জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে আরম্ভ করল। কনফুসিয়াস কোন দরিদ্র ছাত্রের কাছ থেকে অর্থ না নিলেও ধনীদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। ক্রমশই কনফুসিয়াস আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল হয়ে উঠলেন।
এই সময় আরো একটি ঘটনার অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে কনফুসিয়াসের প্রভাব আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেল।
কিন্তু আকস্মিকভাবে দেশে দেখা দিল সামরিক বিপর্যয়। প্রতিবেশী দেশের আক্রমণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন কনফুসিয়াস। অন্য এক দেশে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। সেই রাজ্যের শাসনকর্তার নাম ছিল চিং।
কনফুসিয়াসের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই করে দিলেন। মাঝে মাঝেই তিনি কনফুসিয়াসের কাছে এসে নানান বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, একজন শাসনকর্তার প্রকৃত সাফল্য কিভাবে নিরূপণ করা যায়?
কনফুসিয়াস বললেন, একজন শাসক তখনই সফল যখন তিনি প্রকৃতই শাসক। ভৃত্য সকল সময়েই ভৃত্য, পিতা প্রকৃতই পিতা, পুত্র সত্যিকারের পুত্র।
ডিউক চিং উপলব্ধি করলেন কনফুসিয়াসের কথার প্রকৃত তাৎপর্য। যিনি প্রকৃতই শাসক তার মধ্যে একাধিক গুণের সন্নিবেশ ঘটবে। একটি গুণের অভাব ঘটলেও তিনি প্রকৃত শাসক বলে পরিগণিত হবেন না।
দীর্ঘ সাত বছর ডিউক চিং-এর রাজ্যে সুখেই দিন কাটিয়ে দিলেন কনফুসিয়াস।
সেই সময় ইয়াং হু নামে চি রাজবংশের এক ভৃত্য ছিল। নিজের বুদ্ধি চতুরতায় রাজাকে নির্বাসিত করে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে নিল। কনফুসিয়াসকে নিজের রাজ্যে
আমন্ত্রণ করে এনে তাঁকে উচ্চপদ দিতে চাইল।
তিনি জানতেন ইয়াং হু শুধু মাত্র প্রবুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, সে পররাজ্যলোভী হীন চরিত্রের মানুষ। এমন মানুষকে সাহায্য করবার সামান্যতম ইচ্ছা ছিল না কনফুসিয়াসের।
একদিন ইয়াং হু নিজে গিয়ে কনফুসিয়াসের সাথে সাক্ষাৎ করল। ইয়াং হুর আন্তরিক ইচ্ছা লক্ষ্য করে কনফুসিয়াস সাময়িকভাবে বিচলিত হয়ে পড়লেন। প্রথমে স্থির করলেন মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। কিন্তু অল্প কয়েক দিনেই অনুভব করলেন, নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালনের দায়িত্ব অস্বীকার করা নৈতিক অপরাধ হলেও ইয়াং হুর মত শাসকের কাছে স্বাধীনভাবে রাজ্যের উন্নতি সাধন করা সম্ভব নয়।’
দৈবক্রমে সেই সময় পার্শ্ববতী লু রাজ্য থেকে কনফুসিয়াসের কাছে প্রধানমন্ত্রী হবার আমন্ত্রণ এল। এই রাজ্যের প্রধান ছিলেন ডিউক তিং। তিনি রাজ্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে কনফুসিয়াসকে নিযুক্ত করলেন। ডিউক তিং নিজেও কোন দরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবার সময় কনফুসিয়াসের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
অল্প দিনের মধ্যেই লু রাজ্যের অভূতপূর্ব উন্নতি দেখা দিল। সকল বিশৃঙ্খলা দূর হল। দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পেল। সাধারণ নাগরিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ বহুগুণ বৃদ্ধি পেল।
লু রাজ্যের এই সর্বাঙ্গীন উন্নতি দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা। তারা গোপনে ষড়যন্ত্র করতে আরম্ভ করল কিভাবে রাজা তিং ও প্রধানমন্ত্রী কনফুসিয়াকে হত্যা করা যায়।
কনফুসিয়াসের এতখানি দূরদৃষ্টি ছিল, তিনি জানতেন শুধু আভ্যন্তরিণ শান্তি বজায় রাখলে চলবে না,বিদেশী শত্রুর প্রতিও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন, শত্রুপক্ষের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল।
রাজ্যে মধ্যে কিছু কিছু সামন্ত ছিল যারা ডিউক তিং-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি। একে একে তাদের সকলকে পরাজিত করে তিং-এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিদের সামন্ত পদে বসালেন।
কনফুসিয়াস জানতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লোভ প্রবল হয়ে ওঠে। যাতে তারা বিদ্রোহ করে ডিউকের বিরুদ্ধে কোন বিপদের সৃষ্টি না করতে পারে, সেই কারণে সমস্ত সমস্ত রাজাদের অস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যা সীমিত রাখবার হুকুম দিলেন।
কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন মানুষের মধ্যে যদি নৈতিক চরিত্রের উন্নতি বিধান না করা যায়, শুধুমাত্র আইনের শাসনে মানুষকে সংযত রাখা সম্ভব হয় না-তাছাড়া সুদীর্ঘ কালও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। তাই কনফুসিয়াস নিজেই তাদের মধ্যে ধর্মবোধ নীতিবোধ জাগ্রত করবার জন্য নানান উপদেশ দিতেন। অল্প দিনেই এর সুফল দেখা দিল।
সমগ্র চীনদেশে সেই সময় লু ছিল একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে চুরি, ডাকাতি, খুন হত না। সকলেই নির্ভয়ে নিরাপদে নিজের দ্ৰব্য রাখতে পারত। গভীর রাতেও পর্যটকরা নির্ভয়ে পথ চলতে পারত।
একদিন রাজা ডিউক শিকারে যাচ্ছিলেন। পথে একদল সুন্দরী মেয়েকে তার রথের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। তাদের রূপে মুগ্ধ ডিউক ভুলে গেলেন শিকার। তাদের নিয়ে আনন্দে মত্ত হয়ে রইলেন কয়েক দিন। রাজকার্যে মন নেই! বন্ধ হয়ে গের পূজা আচার অনুষ্ঠান।
কনফুসিয়াস মনে মনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। রাজার এই নৈতিক স্খলন গুরুত্বর অপরাধ বলে মনে হল তাঁর।
তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিয়ে লু রাজ্য ত্যাগ করে পথে বেরিয়ে পড়লেন। তখন তার বয়স চুয়ান্ন। সঙ্গে কয়েকজন মাত্র অনুগত শিষ্য।
