মায়ের স্নেহে অভাব অনটনের মধ্যেই দিন কাটছিল কনফুসিয়াসের। কনফুসিয়াসের তখন ১৫ বছর বয়স। হঠাৎ তার মা মারা গেলেন। কনফুসিয়াসের জীবনে মাই ছিলেন সব। তার এই অকাল মৃত্যুতে কনফুসিয়াস বিরাট আঘাত পেলেন।
কিন্তু সেই কিশোর বয়েসেই নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, এত বড় বিয়োগ বেদনাতেও ভেঙে পড়লেন না। আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিজেকে সংযত রাখলেন।
তখনকার প্রচলিত নিয়ম ছিল স্ত্রীকে স্বামীর পাশেই কবর দেওয়া হবে। পিতার সমাধির পাশে মায়ের দেহ সমাহিত করলেন কনফুসিয়াস। নিজের গৃহে ফিরে এসে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হতেই পরিচিত জনেরা সকলে তাকে পরামর্শ দিল পিতার সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে।
কিন্তু কনফুসিয়াসের আত্মমর্যাদাবোধ এতখানি প্রবল ছিল, তিনি বললেন, যে সম্পত্তি পিতা আমাকে দিয়ে যেতে পারেননি তাতে আমার কোন লোভ নেই।
পরবর্তীকালে কনফুসিয়াস বলতেন, আত্মমর্যাদা না থাকলে কোন মানুষই অন্যের কাছে মর্যাদা পেতে পারে না। যে মানুষের মধ্যে এই আত্মসম্মানবোধ আছে একমাত্র সেই হতে পারে প্রকৃত জ্ঞানী।
মায়ের মৃত্যুতে সাময়িক অসুবিধার মধ্যে পড়লেও নিজের বিদ্যাশিক্ষা অধ্যয়ন বন্ধ করলেন না কনফুসিয়াস। অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান, পাণ্ডিত্যের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কনফুসিয়াস থাকতেন লু প্রদেশে। এই প্রদেশের অন্যতম প্রধান শাসক ছিলেন চি চি-র কানেও গিয়ে পৌঁছেছিল কনফুসিয়াসের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি। প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ হলেন চি। কনফুসিয়াসের দারিদ্র্যের কথা শুনে তাঁকে হিসাব রাখবার কাজ দেওয়া হল অল্পদিনেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন কনফুসিয়াস। চি খুশি হয়ে তাকে আরো উঁচু পদ দিলেন। কিন্তু পদের কোন মোহ ছিল না কনফুসিয়াসের। তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল জ্ঞান অর্জন। যে কোন পুঁথি পেলেই গভীর মনোযোগ সহকারে তা পড়তেন। উপলব্ধি করতে চেষ্টা করতেন তার অন্তর্নিহিত সত্য। তাই যখনই সময় পেতেন পুঁথি সংগ্রহ করতেন। কিম্বা যেখানেই কোন পুঁথিসন্ধান পেতেন সেখানেই ছুটে যেতেন।
কনফুসিয়াসের চরিত্রের উদারতা মহত্ত্বতার কারণে সকলেই তাকে ভালবাসত। তখন কনফুসিয়াস সবেমাত্র যৌবনের পা দিয়েছেন। সকলের পরামর্শে বিবাহ করলেন। স্ত্রীর নাম পরিচয় সব কিছুই ছিল অজ্ঞাত। তার স্ত্রীর গর্ভে এক পুত্র, দুটি কন্যা (কারো মতে একটি কন্যা) জন্ম গ্রহণ করে। স্ত্রীর সঙ্গে কনফুসিয়াসের কি রকম সম্পর্ক ছিল তা জানা যায় না। সম্ভবত স্ত্রীর সাথে কনফুসিয়াসের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল। অনেকের মতে স্ত্রীর মৃত্যু হয়।
তাঁর কাজে খুশি হয়ে চি তাকে তার সমস্ত গবাদি পশুর দেখাশুনা করা, তাদের তত্ত্বাবধান করা, পালন করার সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। আপাতদৃষ্টিতে সহজসাধ্য মনে হলেও কাজটি ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ।
কনফুসিয়াস তখন ত্রিশ বছরে পা দিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করছিলেন প্রকৃত জ্ঞান শুধু পুঁথির মধ্যে পাওয়া যাবে না। চারপাশের জগতে ছড়িয়ে রয়েছে জ্ঞানের উপকরণ। তিনি বেরিয়ে পড়তেন শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
এই ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন চীনদেশের প্রকৃত অবস্থা। দেখলেন সমস্ত দেশ জুড়ে শুধু অভাব অনটন। রাজা, রাজপুরুষদের নৈতিক অধঃপতন। প্রতিনিয়তই এক দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধবিগ্রহ চলেছে। কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। নেই ন্যায়নীতি, ধর্মবোধ।
গভীর চিন্তার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন সমাজ জীবন, ব্যক্তি জীবন, রাষ্ট্রনৈতিক জীবন-সর্বক্ষেত্রেই প্রয়োজন শৃঙখলার। এই শৃঙ্খলা রয়েছে প্রকৃতির মধ্যে, ঈশ্বরের সমস্ত বিধানের মধ্যে। তাই দিন রাত্রি, সপ্তাহ, মাস, বৎসর বিভিন্ন ঋতু একই নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে।
কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন আইন বা দণ্ডের দ্বারা এই শৃঙ্খলাকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। আইন যতই কঠোর হবে ততই তাকে অমান্য করবার ইচ্ছা মানুষের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠবে। একমাত্র মানুষের অন্তরের বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে। আর এই বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে। আর এই বিবেকবোধ তখনই মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে যখন ধর্মীয় চেতনা জেগে উঠবে।
কনফুসিয়াসের মধ্যেকার এই উপলব্ধি, গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা আসতে আরম্ভ করল তার কাছে। তাদের শিক্ষাদনের জন্য তিনি একটি এ্যাকাডেমি স্থাপন করলেন।
কিন্তু কনফুসিয়াস শুধু জ্ঞানী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন একজন আদর্শ শাসক হতে।
তাই জ্ঞানী হিসাবে যেমন ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন, অন্যদিকে সংস্কারক হিসাবে সমাজের ক্রটি-বিচ্যুতিগুলোকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন। নানান বিষয়ে সুপরামর্শ দিতেন।
তাঁর আকৃতি ছিল কুৎসিত। অস্বাভাবিক দীর্ঘদেহ, মাথাটি ছিল বিশাল আকৃতির, চওড়া মুখ। ছোট দুটি যথেষ্ট বড়। নাকটি ছিল স্বাভাবিক দ্বিগুণ। যখন তিনি হাঁটতেন, হাত দুটো পাখির ডানার মত দুপাশে ছড়িয়ে থাকত। পিঠটা ছিল কালো কচ্ছপের মত।
এই দৈহিক অপূর্ণতা সত্ত্বেও ভ্রমর যেমন মধুর আকর্ষণে ফুলের কাছে আসে, মানুষও তেমনি তার জ্ঞানের প্রদীপ্ত শিখায় নিজেকে আলোকিত করবার জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে।
