ক্রাইম এ্যাণ্ড পানিশমেন্ট উপন্যাস রচনার পেছনে যখন তার সমস্ত মন একাগ্রতাটুকু অর্পণ করেছিলেন তখন প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তিমত তাকে নতুন উপন্যাস জমা দেবার দিন এগিয়ে আসছিল। কিন্তু একটি লাইনও তখনো তিনি লিখে উঠতে পারেননি। হাতে মাত্র দু মাস সময়। কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। এমন সময় তার এক বন্ধু পরামর্শ দিল স্টেনোগ্রাফার রাখতে। বন্ধু তার চেনা-জানা একটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন তার কাছে।
১৮৬৬ সালের ৪ অক্টোবর কুড়ি বছরের সাদামাটা চেহারার অ্যানা এসে দাঁড়াল দস্তয়ভস্কির দরজায়।
চব্বিশ দিনের মাথায় শেষ করলেন “এক জুয়াড়ির গল্প”-এ জুয়াড়ি আর কেউ নয়, দস্তয়ভস্কি নিজেই।
চব্বিশ দিন দস্তয়ভস্কির সংসারে যাতায়াত করতে করতে অ্যানা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন তার মানসিক, সাংসারিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলতা।
দস্তয়ভস্কির মনে হল মারিয়া, পলিনা তাঁকে যা দিতে পারেনি, সেই সংসারের সুখ হয়তো দিতে পারবে অ্যানা। তাই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। দস্তয়ভস্কির বয়স তখন ৪৫, অ্যানার ২০। সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁদের বিয়ে হল।
দেনার টাকা শোধ করবার জন্য লিখতে আরম্ভ করলেন “দি ইডিয়ট”।
ইডিয়ট উপন্যাস শেষ করে কয়েক মাস আর কিছু লেখেননি দস্তয়ভস্কি। ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। এরই মধ্যে লিখলেন “দি এটারনাল হ্যাঁসবেন্ড” (The etemal husband), পরে দীর্ঘ উপন্যাস “দি পজেজড” (The possesed)।
দেখতে দেখতে চার বছর কেটে গেল। যাযাবরের মত ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন দস্তয়ভস্কি।
দেশে ফেরার জন্য মন টানছে কিন্তু কেমন করে ফিরবেন। হাত শূন্য। স্ত্রী, শিশুকন্যার জন্যে রাখা শেষ সম্বলটুকু নিয়ে গিয়ে জুয়ার টেবিলে বসলেন। কিন্তু সেটুকুও হারাতে হল।
এই বিপদের দিনে এগিয়ে এলেন তার এক বন্ধু। তার কাছে থেকে অর্থ সাহায্য পেয়ে দীর্ঘ চার বছরের প্রবাস জীবনের পর জুলাই ৪, ১৮৭১ স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে পিটসবার্গে ফিরলেন দস্তয়ভস্কি।
আর্থিক সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি না পেলেও তাঁর সমস্ত মন জুড়ে তখন চলছিল সেই মহতী সৃষ্টির প্রেরণা। দীর্ঘ চার বছর লেখার পর ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হল “দি ব্রাদার্স কারামাজোভ”। এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। ব্যাপ্তিতে, গভীরতায়, চরিত্র সৃষ্টিতে ক্রাইম এ্যাণ্ড পানিশমেন্টের পাশাপাশি এই উপন্যাসও তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
সমস্ত দেশ জুড়ে তিনি পেলেন এক অভূতপূর্ব শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। তাকে বলা হল জাতির প্রবক্তা। ক্রমশই তার শরীর ভেঙে পড়ছিল। শেষে অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
সন্ধ্যেবেলায় চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। ৩১ বছর আগে যে পথ দিয়ে শৃঙ্খলিত অবস্থায় লোকের ধিক্কার কুড়োতে কুড়োতে গিয়েছিলেন সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে, আজ সেই পথ দিয়ে হাজার হাজার মানুষের বেদনা আর ভালবাসার মধ্যে দিয়ে চললেন অমৃতলোকে।
২৯. আলেকজান্ডার দি গ্রেট (৩৫৬ খ্রিস্ট পূর্ব-৩২৩ খ্রিস্ট পূর্ব)
খ্রিস্ট পূর্ব চারশো বছর আগেকার কথা। গ্রীসদেশ তখন অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এমন একটি রাষ্ট্রের অধিপতি ছিলেন ফিলিপ। ফিলিপ ছিলেন বীর, সাহসী, রণকুশলী। সিংহাসন অধিকার করবার অল্প দিনের মধ্যেই গড়ে তুললেন সুদক্ষ এক সৈন্যবাহিনী। ফিলিপের পুত্রই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে বীর আলেকজান্ডার।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ সালে আলেকজান্ডারের জন্ম। আলেকজান্ডারের মা ছিলেন কিছুটা অস্বাভাবিক প্রকৃতির। সম্রাট ফিলিপকে কোন দিনই প্রসন্নভাবে গ্রহণ করতে পারেননি।
ছেলেবেলা থেকেই আলেকজান্ডারের দেহ ছিল সুগঠিত। বাদামী চুল, হালকা রং। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল-আলেকজান্ডারের শরীর থেকে সব সময় একটা অপূর্ব সুগন্ধ বার হত। সমকালীন অনেকেই এই সুগন্ধের কথা উল্লেখ করেছেন।
যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকলেও পুত্রের শিক্ষার দিকে ফিলিপের ছিল তীক্ষ্ণ নজর। আলেকজান্ডারের প্রথম শিক্ষক ছিলেন লিওনিদোস নামে অলিম্পিয়াসের এক আত্মীয়। আলেকজান্ডার ছিলেন যেমন অশান্ত তেমনি জেদী আর একরোখা। শিশু আলেকজান্ডারকে পড়াশুনায় মনোযোগী করতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হত লিওনিদোসকে। কিন্তু তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার। লিওনিদোসের কাছে শিখতেন অঙ্ক, ইতিহাসের বিভিন্ন কাহিনী, অশ্বরোহণ, তীরন্দাজী।
কিশোর বয়েস থেকেই তার মধ্যে ফুটে উঠেছিল বীরোচিত সাহস। এই সাহসের সাথে সংমিশ্রণ ঘটেছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধির। একদিন একজন ব্যবসায়ী একটি ঘোড়া বিক্রি করেছিল ফিলিপের কাছে। এমন সুন্দর ঘোড়া সচরাচর দেখা যায় না। ফিলিপের লোকজন ঘোড়াটিকে মাঠে নিয়ে যেতেই হিংস্র হয়ে উঠল। যতবারই লোকেরা তার পিঠের উপরে উঠতে চেষ্টা করে, ততবারই তাদের আঘাত করে দূরে ছিটকে ফেলে দেয়। শেষ আর কেউই ঘোড়ার পিঠে উঠতে সাহস পেল না। কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন ফিলিপ আর আলেকজান্ডার। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন নিজের ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছে। ঘোড়াটি। তাই ঘোড়ার পাশে গিয়ে আস্তে আস্তে তার মুখটা সূর্যের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। তারপর ঘোড়াটিকে আদর করতে করতে একলাফে পিঠের উপর উঠে পড়লেন। উপস্থিত সকলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। যদি ঐ ঘোড়া আলেকজান্ডারকে আহত করে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এলেন আলেকজান্ডার। ঘোড়া থেকে নেমে ফিলিপের সামনে আসতেই পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ফিলিপ। বললেন, তোমাকে এইভাবে নতুন রাজ্য জয় করতে হবে। তোমার তুলনায় ম্যাসিডন খুবই ছোট।
