অন্য অনেকের সাথে তাকে বন্দী করে রাখা হল আলোবাতাসহীন ছোট্ট একটি কুঠুরিতে। দিনে মাত্র তিন-চারবার ঘরের বাইরে আসার সুযোগ মিলত। এক দুঃসহ মানসিকতার মধ্যেই তিনি রচনা করলেন একটি ছোট গল্প “ছোট্ট নায়ক” A little Hero)।
নানান প্রশ্ন অনুসন্ধান-তারপর শুরু হল বিচার। বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দণ্ডাদেশ পত্র পাঠিয়ে দেওয়া হল সম্রাট নিকোলাসের কাছে। সম্রাট তাদের মৃত্যুদণ্ড রোধ করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিলেন। দস্তয়ভস্কির চার বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসন আর তারপর চার বছর সৈনিকের জীবন যাপন করবার আদেশ দেওয়া হল।
খ্রিস্টমাস ডেতে পায়ে চার সের ওজনের লোহার শেকল পরিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে (জানুয়ারি ১৮৫০)। চারদিকে নরকের পরিবেশ। খুনী বদমাইশ শয়তানের মাঝখানে দস্তয়ভস্কি একা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। ছোট অন্ধকার কুঠুরিতে শীতকালে অসহ্য ঠাণ্ডা। ছাদের ফুটোদিয়ে বরফ ঝরে পড়ে মেঝেতে পুরু হয়ে যায়। কনকনে তুষারজড়ে হাত-পা ফেটে রক্ত ঝরে। গ্রীষ্মের দিনে আগুনের দাবদাহ।
তারই মাঝে হাড়ভাঙা খাটুনি। ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে শরীর নুয়ে পড়েছে। সে তার জীবনের এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে জ্বলন্ত অক্ষরে লিখে গিয়েছেন তাঁর The house of the Dead (মৃত্যুপুরী) উপন্যাসে।
দীর্ঘ চার বছর (১৮৫০-১৮৫৪) সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে কাটিয়ে অবশেষে লোহার বেদির বন্ধন থেকে মুক্তি পেলেন।
ওমস্কের বন্দীনিবাস থেকে দস্তয়ভস্কিকে পাঠানো হল সেমিপালতিনস্ক শহরে। কিন্তু সামরিক জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা কুচকাওয়াজ তার রুগ্ন শীর্ণ অসুস্থ অনভ্যস্ত শরীরে মাঝে মাঝে অসহনীয় হয়ে উঠত। তবুও নিজের যোগ্যতার কিছুদিনের মধ্যেই সামরিক বিভাগে উঁচু পদ পেলেন।
এই সময় শহরের প্রধান সেনানায়ক জানতে পারলেন তাঁর সৈন্যদলের মধ্যে একজন শিক্ষিত লেখক আছেন। তিনি দস্তয়ভস্কিকে ডেকে পাঠালেন। তারপর থেকে প্রতিদিন দস্তয়ভস্কি তার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাতেন।
এখানেই একদিন পরিচয় হল এক মদ্যপ সরকারী কর্মচারী আলেকজাণ্ডার ইসায়েভ এবং তার সুন্দরী তরুণী স্ত্রী মারিয়া ডিমিট্রিয়েভনার সাথে। তারপর থেকে শুরু হল তাঁর সেখানে যাতায়াত।
এর কিছুদিনের মধ্যে ইসায়েভ বদলি হয়ে গেলেন চারশো মাইল দূরের এক শহরে। মারিয়ার অদর্শনে আবার মানসিক দিক থেকে বিপর্যয় হলে গেলেন দস্তয়ভস্কি।
কয়েক মাস পর তার স্বামী মারা গেলেন। বছর খানেক পর একদিন দস্তয়ভস্কি গেলেন মারিয়ার কাছে। সেখানে গিয়ে যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মারিয়া এক তরুণ স্কুল শিক্ষকের প্রেমে পড়েছে। অনেক অনুনয়-বিনয় করে তার মত পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেন।
১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুজনের বিয়ে হল। সারা দিনের পরিশ্রম উত্তেজনায় বাসরঘরেই মূৰ্ছিত হয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। সুখের পাত্র পূর্ণ হবার আগেই অপূর্ণ রয়ে গেল সব আকাঙ্ক্ষা।
আরো দুবছর থাকার পর শেষ হল তাঁর বন্দী জীবন। সামরিক বিভাগের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে এসে বাসা বাঁধলেন মস্কোর কাছাকাছি টিভর শহরে।
এবার সাইবেরিয়ার নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে লিখলেন The house of the Dead (মৃতের পরী)।
কিন্তু কে প্রকাশ করবে এই অখ্যাত তরুণের লেখা! দস্তয়ভস্কির বড় ভাই মাইকেলের সঙ্গে মিলিতভাবে প্রকাশ করলেন একটি পত্রিকা “সময়” (Time)। এতেই প্রকাশিত হল The house of the Dead।
প্রকাশের সাথে সাথে দস্তয়ভস্কির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সাইবেরিয়ার বন্দী জীবনের ছবি ইতিপূর্বে আর কোন লেখকের রজনাতেই এমন মূর্ত হয়ে ওঠেনি। খ্যাতির সাথে অর্থও আসতে আরম্ভ করল। কিন্তু মারিয়ার বিলাস-ব্যসনের সাথে তাল রাখতে ব্যর্থ হলেন দস্তয়ভস্কি।
যন্ত্রণা হতাশা ভোলবার জন্য ক্রমশই তিনি সৃষ্টির গভীরে ডুব দিলেন। এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে এল পলিনা। এক প্রাণ-উচ্ছল সুন্দরী তরুণী।
দুজনে গেলেন ফ্রান্সে। কিন্তু পলিনাকে কাছে পেলেন না দস্তয়ভস্কি। এক পুরুষে মন ভরে না তার। বিচ্ছেদ ঘটে গেল দুজনের। ততদিনে হাতের অর্থও ফুরিয়ে এসেছে। জুয়ার নেশায় মাতালের দস্তয়ভস্কি। এক একদিন সব হারিয়ে গায়ের কোট খুলে দিয়ে আসতেন। কোনদিন বা জিততেন কিন্তু তার পরদিন আবার সব হারাতেন। এই জুয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করেই তিনি পরবর্তীকালে লিখেছিলেন “জুয়াড়ি”।
ইতিমধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল মারিয়া। তার সেবা-যত্নের কোন ত্রুটি করলেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮৬৪ সালের এপ্রিল মাসে মারা গেল মারিয়া।
স্ত্রীর মৃত্যুর মাত্র তিন মাস বাদে মারা গেলেন বড় ভাই মাইকেল। মাইকেলের মৃত্যু তাঁর কাছে অনেক বেশি আঘাত নিয়ে এল। তাঁর জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল ভাইয়ের অস্তিত্ব।
এই দুঃখের মধ্যেই রচনা করলেন তাঁর “অপরাধ এবং শাস্তি” Crime and Punishment)। এক অনন্য সাধারণ উপন্যাস। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে যে কটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আছে, এটি তার মধ্যে একটি। কাহিনীর নায়ক রাসকলনিভ। দরিদ্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আদর্শবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু দারিদ্র্যের চাপে তার আদর্শবাদের বন্ধনটুকু শিথিল হয়ে পড়তে থাকে। বাড়ি থেকে খবর আসে সংসারের অভাব দূর করবার জন্যে ছোটবোন দুনিয়া ধনী লুজানকে বিয়ে করতে চলেছে। এক প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সে কিছু অর্থ ধার করতে গেল শহরের এক বুড়ির কাছে। বুড়ির বন্ধকী ব্যবসা। একাই থাকে বুড়ি। তার ঘরে জমিয়ে রাখা সোনা-দানা দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না রাসকলনিভ। বুড়িকে হত্যা করল। এই সময় বুড়ির বোন এসে পড়ায় নিজেকে বাঁচাবার জন্য তাকেও হত্য করল রাসকলনিকভ। সামান্য যা পেল তাই নিয়েই পালিয়ে এল কিন্তু এবার তার মধ্যে শুরু হল মানসিক যন্ত্রণা। মনে হতে লাগল পুলিশ বুঝি সব সময় তার পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ক্রমশই এক অপরাধ বোধ তার মনের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। এই সময় রাসকলনিকভের সঙ্গে দেখা হল সোনিয়ার। সে পতিতা। নিজের বিপন্ন পরিবারকে ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে সে এই পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু রাসকলনিকভ উপলব্ধি করতে পারল পাপের মধ্যে থেকেও সোনিয়ার অন্তর জুড়ে রয়েছে শুধু পবিত্রতা। তাই নিজেকে সোনিয়ার কাছে উৎসর্গ করে না। শুরু হল পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত নিজের অপরাধ স্বীকার করে সোনিয়ার কাছে। পুলিশও বুড়ির হত্যা রহস্য উদ্ধারের জন্য চারদিকে অনুসন্ধান করতে থাকে। তারা অনুমান করে রাসকলনিকভ খুনী। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাকে ধরতে পারছিল না। রাসকলনিকভের মনে হল সে যে অপরাধ করেছে তার জন্যে তাকে ধরতে পারছিল না। রাসাকলনিকভের মনে হল সে যে অপরাধ করছে তার জন্যে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। সোনিয়ার প্রেমের আলোয় সে তখন এক অন্য মানুষ। তাই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করল। সোনিয়াও তার সাথে যাত্রা করল। সে বাসা বাধল জেলের কাছে এক গ্রামে। ভালবাসা, ত্যাগ আর পবিত্রতার মধ্যে দুজনে প্রতীক্ষা করে নতুন জীবনের।
