ফিলিপ অনুভব করতে পারলেন তাঁর ছেলে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। এখন শুধু প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষার এবং সে ভার আলেকজান্ডারের জন্মের সময়েই সমর্পণ করেছেন মহাজ্ঞানী অ্যারিস্টটলের উপর। অ্যারিস্টটল ফিলিপের আমন্ত্রণে ম্যাসিডনে এলেন।
দীর্ঘ তিন বছর ধরে অ্যারিস্টটলের কাছে শিক্ষালাভ করেছিলেন আলেকজান্ডার। পরবর্তীকালে অনেক ঐতিহাসিকের অভিমত, নিজেকে বিশ্ববিজয়ী হিসাবে গড়ে তোলার শিক্ষা আলেকজান্ডার পেয়েছিলেন অ্যারিস্টটলের কাছে।
আমৃত্যু গুরুকে গভীর সম্মান করতেন আলেকডান্ডার। তাঁর গবেষণার সমস্ত দায়িত্বভার নিজেই গ্রহণ করেছিলেন। নিজের গুরুর প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে আলেকজান্ডার বললেন, এই জীবন পেয়েছি পিতার কাছে। কিন্তু সেই জীবনকে কি করে আরো সুন্দর করে তোলা যায়, সেই শিক্ষা পেয়েছি গুরুর কাছে।
আলেকজান্ডারের বয়স যখন মোল, ফিলিপ বাইজানটাইন অভিযানে বার হলেন। পুত্রের উপর রাজ্যের সমস্ত ভার অর্পণ করলেন। ফিলিপের অনুপস্থিতিতে কিছু অধিনস্থ অঞ্চলের নেতারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল। কিশোর আলেকজান্ডার নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে রইলেন না। বীরদর্পে সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শুধু বিদ্রোহীদের পরাজিত করলেন। না, তাদের বন্দী করে নিয়ে এলেন ম্যাসিডনে।
এই যুদ্ধজয়ে অনুপ্রাণিত আলেকজান্ডার সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন। প্রথম যে দেশ জয় করলেন, নিজের নামে সেই দেশের নাম রাখলেন আলেকজান্ডা পোলিস।
পিতা-পুত্রের মধ্যেকার সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে মায়ের প্ররোচনাও ছিল যথেষ্ট। আলেকজান্ডারের যখন কুড়ি বছর বয়স, ফিলিপ আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। এর পেছনে রানী অলিম্পিয়াসেরও হাত ছিল। ফিলিপ নিহত হতেই সিংহাসন অধিকার করলেন আলেকজান্ডার। প্রথমেই হত্যা করা হল নতুন রানীর কন্যাকে, নতুন রানীকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করলেন রানী অলিম্পিয়াস। যাতে ভবিষ্যতে কেউ তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
এই সময় ম্যাসিডনের চতুর্দিকে শক্ররাষ্ট্র। ফিলিপের হত্যার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অধিনস্থ রাষ্ট্র স্বাধীনতা ঘোষণা করল। ম্যাসিডনের নেতৃস্থানীয় সকলেই আলেকজান্ডারকে পরামর্শ দিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্র সম্পর্ক স্থাপন করতে।
কিন্তু এই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করলেন আলেকজান্ডার। সুসংহত সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুদের উপর। প্রথমে আক্রমণ করলেন থেবেস। তাদের সমস্ত বাধা চূর্ণ বিচূর্ণ করে শহর দখল করলেন, যাতে তার শক্তি সম্বন্ধে সমস্ত গ্রীসের মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। তাই শুধু নগর ধ্বংস করে নিবৃত্ত হলেন না, ছয় হাজার লোককে হত্যা করা হল এবং ত্রিশ হাজার লোককে দাস হিসাবে বিক্রি করা হল।
এবার থেবেস থেকে আলেকজান্ডার এগিয়ে চললেন দক্ষিণের দিকে। প্রথমে কিছু রাষ্ট্র বাধা দিলেও একে একে সমস্ত দেশই তার অধীনতা স্বীকার করে তাঁকে নেতা হিসাবে মেনে নিল।
অবশেষে তিনি এলেন কর্নিথে। এখানে সমস্ত গ্রীক রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে তাঁকে প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করল এবং এশিয়া অভিযানের সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করা হল।
যখন আলেকজান্ডার কর্নিথে ছিলেন, দেশের সমস্ত জ্ঞানীগুণী মানুষেরা নিয়মিত তাকে অভিনন্দন জানাতে আসত। কিন্তু আলেকজান্ডার মহাজ্ঞানী ডায়োজেনিসের সাথে সাক্ষাতের জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আলেকজান্ডারের কাছে গেলেন না। শেষে আলেকজান্ডার নিজেই গেলেন তাঁর কাছে।
বাড়ির সামনে একটি খোলা জায়গায় শুয়ে রোদ পোহাচ্ছিলেন বৃদ্ধ দার্শনিক। আলেকজান্ডার তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনি কি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করেন?
ডায়োজেনিস শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি আমার আর সূর্যের মাঝে আড়াল করে দাঁড়াবেন না, এবং বেশি আর কিছু প্রার্থনা করি না।”
সামান্যতম ক্রুদ্ধ হলেন না আলেকজান্ডার। বৃদ্ধ দার্শনিকের নিলোর্ভ স্পষ্ট উত্তর শুনে শ্রদ্ধায় বলে উঠলেন, আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম তাহলে ডায়োজেনিস হতে চাইতাম।
আলেকজান্ডার জানতেন উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া কোন যুদ্ধজয় অসম্ভব। শুরু হল তাঁর যুদ্ধের প্রস্তুতি। অল্পদিনের মধ্যেই গড়ে তুললেন সুদক্ষ বিশাল এক সৈন্যবাহিনী। তার মধ্যে ছিল ত্রিশ হাজার পদাতিক, চার হাজার অশ্বারোহী। তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিল পারস্য অভিযান। পারস্য দখলের পর তার লক্ষ্য এশিয়া। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪ সালে বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন।
প্রথমে আলেকজান্ডার এলেন হেলসম্পটে। এখানে বয়ে চলেছে Granicus নদী। নদীর ওপারে পারস্য সম্রাটের বিশাল সৈন্যবাহিনী।
দুই পক্ষে শুরু হল মরণপণ লড়াই। ক্রমশই দারিয়ুসের বাহিনী বিধ্বস্ত হতে থাকে। তাদের পক্ষে প্রায় ২৫০০০ হাজার সৈনিক মারা পড়ল। প্রাণ বাঁচাতে দারিয়ুস তার পরিবারের সকলকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেলেন।
এই বার আলেকজান্ডার এশিয়ামাইনর অভিমুখে অভিযান শুরু করলেন-ক্রমাগত যুদ্ধ জয়ে এক অপরাজের মনোভাব গড়ে উঠল তার মধ্যে। পৃথিবীর কোন কিছুতেই তাঁর ভয় নেই। ধ্বংসের জন্যেই যেন তার আবির্ভাব।
যা অসম্ভব অন্যরা যা দেখে পিছিয়ে যায় তিনি তাকে সম্ভব করে তুলতেন। যেখানে দুরন্ত নদী তার পথে বাধার সৃষ্টি করত, সকলে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত, সুকৌশলে সেই নদী পার হয়ে যেতেন আলেকজান্ডার। যখন বিশাল পাহাড় তার পথে অবরোধ করে দাঁড়াত তিনি অসীম সাহসে সেই পাহাড় অতিক্রম করে শত্রু সৈন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
