১৮৬৫ সালে যখন লিঙ্কনকে হত্যা করা হল, বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন কবি। লিঙ্কন তাঁর কাছে ছিলেন স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক। এই মর্মান্তিক বেদনায় তিনি চারটি মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা করেন। এমন শোকাবহ কবিতা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এর মধ্যে একটি কবিতা “O Captain my Captain.” যাত্রার শেষ লগ্ন সমাহত, তীরভূমি অদূরে, কিন্তু কাণ্ডারীর দেহ প্রাণহীন। হোয়েন লাইল্যাকস লাস্ট কবিতাটির ফুটে উঠেছে মৃত্যুর বর্ণনা।
All over bouquets of roses
O death! I cover you over with roses and early lilies:
১৮৭৩ সালে কবি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই সময়ে তিনি থাকতেন ওয়াশিংটনে তার ছোট ভাই জর্জের বাড়িতে।
১৮৯২ সালে বাহাত্তর বছর বয়সে মানুষের প্রিয় কবি হারিয়ে গেলেন তার প্রিয় সূর্যের দেশে।
২৮. ফিওদর মিখাইলভিচ দস্তয়ভস্কি (১৮২১-১৮৮১)
২৮. ফিওদর মিখাইলভিচ দস্তয়ভস্কি (১৮২১-১৮৮১)
তাঁর সম্বন্ধে বলা হয় তিনি লেখকের লেখক ফিওদর দস্তয়ভস্কি (জন্ম অক্টোবর ৩০, ১৮২১। মৃত্যু ২৮ জানুয়ারি, ১৮৮১)। সাত ভাইবোনের মধ্যে দস্তয়ভস্কি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান। পিতা মিখায়েল আন্দ্রিয়েভিচ ছিলেন মস্কোর এক হাসপাতালের ডাক্তার। কয়েক বছর পর দস্তয়ভস্কির পিতা টুলা জেলায় Darovoye তে একটা সম্পত্তি কিনলেন। প্রতিবছর গ্রীষ্মের ছুটিতে মা ভাই বোনেদের সাথে নিয়ে সেখানে বেড়াতে যেতে দস্তয়ভস্কিকে পাঠিয়ে দেওয়া হল Chemak’s বোর্ডিং স্কুলে। তিন বছর সেখানে (১৮৩৪-৩৭) পড়াশুনা করার পর বাড়িতে ফিরে এলেন দস্তয়ভস্কি। এক বছরের মধ্যে মার মৃত্যু হল।
স্ত্রী মৃত্যু মাইকেলের জীবনে এক পরিবর্তন নিয়ে এল। শহরের পরিমণ্ডলে থাকতে আর ভাল লাগল না, হাসপাতালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন। দস্তয়দস্কি আর তার ভাইকে ভর্তি করে দিলেন মিলিটারি ইনজিনিয়ারিং একাডেমিতে।
গ্রামে গিয়ে অল্পদিনেই সম্পত্তি বাড়িয়ে ফেললেন মাইকেল। মাইকেলে অত্যাচার অন্যায় আচরণে প্রজাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। কয়েকজন তাঁর কোচওয়ানের সাথে শলাপরামর্শ করে নির্জনে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করল। পিতার মৃত্যু দস্তয়ভস্কির জীবনে নিয়ে এল বিরাট আঘাত।
পিতা নিহত হবার পর এক অপরাধবোধ তাঁর মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। পিতার মৃত্যুর পর নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হল তাঁর। এর থেকে জন্ম নিল এক অসুস্থ মনোবিকার। তাই পরবর্তীকালে কোন মৃত্যু শোক আঘাত উত্তেজনার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন, ঘন ঘন দেখা দিত মৃগীরোগ। সমস্ত জীবনে আর তিনি এই রোগ থেকে মুক্তি পাননি।
ইনজিনিয়ারিং একাডেমি থেকে পাশ করে সামরিক বিভাগে ডিজাইনারের চাকরি নিলেন। নিঃসঙ্গতা ক্লান্তি ভোলবার জন্য জুয়ার টেবিলে গিয়ে বসেন দস্তয়ভস্কি। অধিকাংশ দিনই নিজুের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। মাইনের টাকা কয়েকদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়।
অর্থ সংগ্রহের তাগিদে ঠিক করলেন ফরাসী জার্মান সাহিত্য অনুবাদ করলেন। তিনি এবং তার ভাই মিখায়েল একসঙ্গে ফরাসী সাহিত্যিক বালজাকের উপন্যাস অনুবাদ করতে আরম্ভ করলেন। ১৮৪৪ সালে একটি রাশিয়ান পত্রিকায় তা প্রকাশিত হতে আরম্ভ হল। কিছু অর্থও পেলেন।
ক্রমশই চাকরির জীবন অসহ্য হয়ে উঠল। সাহিত্য জগৎ তাঁকে দুর্নিবারভাবে আকর্ষণ করছিল। তিনি চাকরি ছাড়লেন। নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করলেন সাহিত্য সাধনায়।
৩০শে সেপ্টেম্বর ১৮৪৪ তার ভাইকে একটা চিঠিতে দস্তয়ভস্কি লিখলেন “একটা উপন্যাস শেষ করলাম। এটা সম্পূর্ণ আমার নিজের লেখা। এখন পাণ্ডুলিপি থেকে নকল করছি। একটা পত্রিকায় পাঠাব। জানি না তারা অনুমোদন করবে কি না। তা আমি এই রচনায় সন্তুষ্ট হয়েছি।”
প্রথম উপন্যাস পুতুর ফোক বা অভাজন প্রকাশিত হওয়ার পর কয়েকটি ছোট গল্প রচনা করলেন দস্তয়ভস্কি। তারপর লিখলেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস “দি ডবল”। প্রথম উপন্যাসে তিনি লেখক হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, দ্বিতীয় উপন্যাসে পেলেন খ্যাতি। তার লেখার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছিল মানুষের বেদনাময় জীবনের ছবি। মানুষ সহজেই। তাঁর রচনার প্রতি আকৃষ্ট হল। সমাজের শিল্পী সাহিত্যিক সমালোচক মহলের দ্বার তার কাছে উন্মুক্ত হল।
এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে নেমে এল বিপর্যয়। রাশিয়ার সম্রাট জার ছিলেন এক অত্যাচারী শাসক। তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট সংগঠন। এক বন্ধুর মারফত দস্তয়ভস্কি পরিচিত হলেন এর একটি সংগঠনের সাথে এদের আসর বসত প্রটাসভস্কি নামে এক তরুণ সরকারী অফিসারের বাড়িতে।
কিন্তু অত্যাচারী জার প্রথম নিকোলাসের গুপ্তচরদের নজর এড়াল না। তাদের মনে হল এরা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। রিপোের্ট গেল সরকারী দপ্তরে। যথারীতি একদিন প্রটাসভস্কির আসর থেকে বাড়িতে ফিরে এসে খাওদা-দাওয়া করে রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। হঠাৎ শেষ রাতে পুলিশের পদশব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চেয়ে দেখলেন তাঁর ঘরে জারের পুলিশ বাহিনী। কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে গ্রেফতার করা হল (এপ্রিল ১৩,১৮৪৯)।
