ফাউস্টের কাহিনী প্রচলিত কাহিনী থেকেই নেওয়া। স্বর্গে ঈশ্বর ও দেবদূতেরা। মিলিত হয়েছেন। সকলে যখন ঈশ্বরের বন্দনা গান গাইছে, শয়তানদের প্রভু মেফিস্টোফিলিস বলল, ঈশ্বরের সৃষ্ট মানবের চরম ব্যর্থতার কথা।
ভগবান বললেন, তার অনুগত সেবক ফাউস্টের কথা।
শয়তান বলল, আমি তার বুদ্ধি বিনাশ করে আমার দলে নিয়ে আসব।
ভগবান বললেন, মানুষ হয়ত ভুল করতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবে তার অন্তরে এক সৎ আত্মা জেগে উঠছে।
ঈশ্বরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতার অহংকার নিযে মেফিস্টোফিলিস পৃথিবীতে ফিরে আসে। ফাউস্টকে সে জয় করবেই।
ফাউস্ট মহাজ্ঞানী। মানুষের সমস্ত জ্ঞানকে সে আত্মস্থ করেছে, তবুও তার মনে হয়েছে এই বিশ্বের রহস্য তার কাছে অজ্ঞাত। তাই সব জ্ঞান বর্জন করে আশ্রয় নিয়েছে জাদুবিদ্যার।
ফাউস্টের শিষ্য ভাগনার। সেও গুরুর মত জ্ঞানের সন্ধানী।
ফাউস্ট নিজের পাঠাগারে রাশি রাশি পুঁথির মধ্যে বসে অস্থির হয়ে ওঠে। মনে হয় এই প্রাণশূন্য শুষ্ক পুঁথি তার দুঃখ, মানসিক যন্ত্রণাকেই যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনের কোন অর্থই খুঁজে পায় না ফাউস্ট। বিষের শিশি তুলে নিয়ে স্থির করে এই যন্ত্রণাময় জীবনকে শেষ করবে।
এমন সময় কানে আসে ইস্টারের সঙ্গীত। প্রভু যীশুর পুনরভ্যুত্থান, তাঁর প্রেমের বন্দনা। মুহূর্তে ফাউস্টের সমস্ত অন্তর এক অজানা আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে। তার দু চোখ বেয়ে নামে অশ্রুধারা।
পরদিন ইস্টার। ফাউস্ট তাঁর শিষ্য ভাগনারকে নিয়ে নগর প্রাকারে আসে। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ আনন্দ করছে। ফাউস্টও তাদের সাথে যোগ দেয়। এই প্রথম সে উপলব্ধি করে সকলের আনন্দের সাথে নিজের আনন্দকে মিশিয়ে দেবার আনন্দ।
সন্ধ্যেবেলায় গৃহ পথে ফেরার সময় চোখে পড়ে একটা কুকুর তাদের অনুসরণ করছে। কুকুরটা সামনে এসে বিরাট আকার ধারণ করল, তারপর পরিণত হল এক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। সেই ধোয়া থেকে বেরিয়ে এল শয়তান মেফিস্টো ফিলিস। ফাউস্টের সামনে এসে বলল, প্রভুর কি হুকুম?
ফাউস্ট জানতে চায় তার পরিচয়। শয়তান ফাউস্টকে বলে সে ফাউস্টের দাসত্ব করবে। ফাউস্টের সকল আকাঙ্ক্ষাকে তৃপ্ত করবে।
কিন্তু তার বিনিময়ে ফাউস্টকে কি দিতে হবে?
শয়তান জবাব দিল জীবনে সে হবে ফাউস্টের ভৃত্য মৃত্যুর পর ফাউস্ট হবে তার ভূত।
জীবনের পর অনন্ত অন্ধকার। সেই অন্ধকারের কথা ভাবে না ফাউস্ট। তার চাই জীবনের সুখ।
রক্তের অক্ষরে চুক্তি লেখা হয় তাদের।
দুজনে বেরিয়ে পড়ল পথে। প্রথমে এল এক সরাইখানায়। সেখানকার আনন্দ উল্লাস ভাল লাগে না ফাউস্টের। তখন শয়তান তাকে নিয়ে এল ডাকিনীদের কাছে। তারা দিল জাদু পানীয়। সেই পানীয় খেতেই বয়োবৃদ্ধ ফাউস্ট হল সজীব উজ্জ্বল এক তরুণ।
দুজন পথে বেরিয়ে পড়ল। সেই পথে চলেছিল একটি মেয়ে, নাম মার্গারেট, নিষ্পাপ কুমারী। তাকে ভাল লাগে ফাউস্টের। এমন পবিত্র হৃদয়কে স্পর্শ করবার ক্ষমতা নেই শয়তানের। কিন্তু মার্গারেটের প্রেমে মুগ্ধ ফাউস্ট তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে চায়। কিন্তু তার সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেয় মার্গারেট। তার বাড়িতে গিয়ে এক বাক্স অলঙ্কার রেখে আসে। এমন বহুমূল্য গহনা দেখে কি করবে ভেবে না পেয়ে মার্গারেট পাদ্রীর কাছে দিয়ে আসে। তাই দেখে পরের দিন আরেক বাক্স গহনা রেখে এল শয়তান। আজ আর গহনা পাদ্রীর কাছে ফেরত দেয়া না। সে পাড়ার এক কাছে লুকিয়ে রেখে আসে। ইচ্ছে সেখান থেকেই মাঝে মাঝে এক-আধটা গহনা পরবে, মা কিছুই জানতে পারবে না।
শয়তান মেফিস্টোফিলিস আর ফাউস্ট আসে কাছে। শয়তান তরুণের বেশে প্রলুব্ধ করে অন্যদিকে নিয়ে যায়। আর ফাউস্ট মার্গারেটের কাছে আসে। মুগ্ধ হয় মার্গারেট। ফাউস্টের অন্তরে জাগে ভালবাসা। কোন কলুষতার স্পর্শ লাগে না সেখানে। কিন্তু শয়তান চায় কামনার আগুন জ্বালিয়ে দিতে। মার্গারেট শয়তানকে দেখে ভয় পায়। কিছুতেই ভেবে পায় না ফাউস্টের মত এমন একজন ভদ্র মানুষের কি করে সে অনুচর হল।
ফাউস্টের কামনার আগুন একদিন জ্বলে উঠল। শয়তান মার্গারেটের মাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিল। সেই ওষুধে মারা গেল মার্গারেটের মা। সন্তানসম্ভবা হল মার্গারেট।, মার্গারেটের ভাই ছিল সৈনিক। সে বোনের এই অধঃপতন সহ্য করতে পারল না। একদিন আক্রমণ করল ফাউস্ট আর শয়তানকে। শয়তানের প্ররোচনায় ফাউস্ট আঘাত করে হত্যা করল মার্গারেটের ভাইকে।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফাউস্ট জানতে পারল মার্গারেট তার শিশুসন্তানকে বিসর্জন দিয়েছিল, তাই তাকে বন্দী করা হয়েছে। তাছাড়া মা-ভাইয়ের মৃত্যুর জন্যেও তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিচারে তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। দুঃখে অনুশোচনায় ভেঙে পড়ল ফাউস্ট। তার সমস্ত ক্ষোভ ফেটে পড়ল শয়তানের উপর। স্থির করল যেমন করেই হোক সে উদ্ধার করবেই মার্গারেটকে। শয়তান তাকে কারাগারে নিয়ে গেল। মার্গারেট তখন উন্মাদ। অসহায়ের মত কারাগার থেকে বেরিয়ে এর ফাউস্ট। মৃত্যু হল মার্গারেটের।
এখানেই শেষ ফাউস্টের প্রথম খণ্ড।
দ্বিতীয় খণ্ডে ফাউস্টকে দেখা গেল এক সমাটের দরবারে জাদুকররূপে। সমাট ভোগবিরাসে মত্ত। রাজ্যে কোন শৃঙ্খলা নেই। শয়তান মেফিস্টোফিলিস উৎসবের আয়োজন করেছে। একের পর এক দৃশ্য সৃষ্টি করে চলেছে ফাউস্ট। তার পেছনে কাজ করছে শয়তান। সম্রাট চাইলেন জাদুবিদ্যার দ্বারা ট্রয়ের রানী হেলেন আর তার অপহরণকারী প্যারিসকে নিয়ে আসতে হবে। শয়তানের সাহায্যে কুয়াশার মধ্যে আবির্ভূত হল হেলেন আর প্যারিস। সকলে বিস্ময়ে মুগ্ধ হতবাক। কি অপরূপ এই নারী হেলেন। প্যারিস যখন তার প্রণয়ী হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে চলেছে, নিজেকে সংযত রাখতে পারল না ফাউস্ট। সে চাবি ছুঁড়ে আঘাত করে। সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে যায় সেই ছায়ামূর্তি। আর জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ফাউস্ট।
