চারদিকে ধিক্কারধ্বনি উঠল। শয়তান ফাউস্টকে নিয়ে এল তার পুরনো পাঠাগারে। সেখানে সব কিছুই আগের মত আছে। ভাগনার সেখানে গবেষণা করে চলেছে কৃত্রিম। মানুষ সৃষ্টির। তৈরি হয়েছে এক ক্ষুদ্র মানুষ।
ফাউস্টের জ্ঞান ফিরে আসতেই সে বলল, হেলেনকে ছাড়া জীবনে সে কোন কিছুই চায় না। শয়তান নিয়ে এল হেলেনকে। ফাউস্ট তখন আর্কেডিয়া রাজ্যের রাজা। মিলন হল দুজনের। একটি সন্তান জন্মাল কিন্তু তাকে মৃত্যুবরণ করতে হল। পুত্রের মৃত্যুর বেদনায় মারা গেল হেলেন। স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুতে ফাউস্টের মনোলোকে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। সকল তুচ্ছতা সংকীর্ণতার ঊর্ধের উঠে যায় তার মন। সে এক মহত্তর পরিপূর্ণতার ধ্যানে আত্মমগ্ন হতে চায়। সমুদ্রের তীরে এক নির্জন অনুর্বর প্রান্তরে গড়ে তুলতে চায় শস্যক্ষেত্র, নতুন জনবসতি।
ফাউস্টের চিন্তা-ভাবনায় অস্থির হয়ে ওঠে শয়তান। এ ফাউস্টযেন তার ইচ্ছাশক্তির দাস নয়। শয়তানের সাহায্যে গড়ে ওঠে নতুন জনপদ। সেখানে তৈরি হয়েছে প্রাসাদ, বাগান, বাড়ি, ঘর। তৈরি হয়েছে জলাশয়, খাল।
ফাউস্ট এখন বৃদ্ধ, ধীর শান্ত। নিজের মধ্যেই আত্মমগ্ন হয়ে থাকে। সেই প্রাসাদের কাছেই থাকত এক বুড়ো-বুড়ি। তাদের কুটিরে বসে উপাসনা করত। তাদের উপসনার ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠত। মাঝে মাঝে এত তন্ময়তার গভীরে ডুব দিত ফাউস্ট, যে সেই মৃদু ঘণ্টাধ্বনিও তার তন্ময়তা ভঙ্গ করত। ফাউস্ট আদেশ দিল ঐ বুড়ো-বুড়িকে সরিয়ে দিতে।
সাথে সাথে শয়তান গিয়ে আগুন জ্বানিয়ে দিল কুটিরে। এই দৃশ্য দেখে রাগে ফেটে পড়ল ফাউস্ট। সে তো দুই বুড়ো-বুড়িকে হত্যা করতে চায়নি চেয়েছিল অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে।
বয়েসের ভারে ক্রমশই স্থবরি আসে ফাউস্ট। চোখের দৃষ্টি কমে আসে। কিন্তু তবুও কাজ করে চলে ফাউস্ট। তার অপর কোন কামনা নেই, স্বর্গের কোন ভাবনা নেই তার, যা কিছু কাজ এই পৃথিবীতে শেষ করে যেতে হবে।
শ্রমিকেরা কাজ করে। তাদের বিচিত্র শব্দ ভেসে আসে। ফাউস্টের মনে হয় কর্মের মধ্যে যেন সঙ্গীতের সুর। এক অপার্থিব আনন্দে তার সমস্ত অন্তর ভরে ওঠে।
গড়ে উঠেছে নতুন জনপদ, কৃষিক্ষেত্র, জীবনের প্রবাহ। ফাউস্টের মন আনন্দে ভরে ওঠে। মনে তার সব কাজ শেষ হয়েছে। পরম শান্তিতে মৃত্যুবরণ করে।
শয়তান আসে ফাউস্টের আত্মাকে দখল করতে। কিন্তু তার আগে এসে দাঁড়াল দেবদূতের দল। শয়তান চেয়েছিল সুখ আর ভোগের বিলাসে ফাউস্টকে ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু সেই সুখ আর ভোগবিলাসকে অতিক্রম করে ফাউস্ট খুঁজে পেয়েছিল এক মহত্তর জীবন। তাই শয়তানের কোন অধিকার নেই তার উপর। দেবদূতের দল তার আত্মাকে নিয়ে গেল ঈশ্বরের কাছে।
সংক্ষেপে এই ফাউস্টের কাহিনী। মহাকবি গ্যেটে তাঁর জীবনব্যাপী সাধনা দিয়ে গড়ে তুলেছেন এই ফাউস্টের। ফাউস্ট যেন তাঁরই আত্মার প্রতিরূপ। সে সমস্ত জীবন কর্মের সাধনায়, জ্ঞানের সাধনায় নিজেকে ব্যাপ্ত রেখেছিল। ফাউস্টের মধ্যে ফুটে উঠেছে। মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি। মানব জীবনের সব আশা-নিরাশা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পাপ-পুণ্য নিয়ে আত্মিক-আধ্যাত্মিক সংকটের বিচিত্র রূপ এখানে ফুটে উঠেছে। এই কাব্য পৃথিবীর সাহিত্য জগতের এক অনন্য সম্পদ।
ফাউস্টের রচনাপর্বেই গ্যেটে রচনা করেন তার আত্মজীবনীমূলক রচনা “কাব্য এবং সত্য”। যদিও এতে তিনি সঠিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি তবুও তাঁর জীবন সম্বন্ধে। অনেক কিছু জানা যায়।
জীবনের শেষ পর্বে এসে প্রাচ্যের কবি হাফিজের কাব্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং তারই প্রভাবে রচনা করেন বেশ কিছু কবিতা।
বৃদ্ধ হয়েও যৌবনের মত তারুণ্যের দীপ্তিতে ভরপুর হয়ে থাকতেন গ্যেটে। শোনা যায় ভাইমারের যুদ্ধের পর যখন নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনী জার্মানি দখল করে, নেপোলিয়ন আদেশ দিয়েছিলেন গ্যেটের প্রতি সামান্যতম অমর্যাদা যেন না করা হয়। তিনি গ্যেটেকে আমন্ত্রণ করেছিলেন তাঁর প্রাসাদে।
গ্যেটে যখন এলেন, নেপোলিয়ন বিস্ময়ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছিলেন, একটা মানুষ আপনি!
বৃদ্ধ গ্যেটের ব্যক্তিত্ব, তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন নেপোলিয়ন। তার সাথে নানান বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। বহু বিষয়ে গ্যেটে নেপোলিয়নের মতের সাথে একমত হতে পারেননি। গ্যেটে স্পষ্টভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। গ্যেটে যখন চলে : যান, নেপোয়িন গভীর শ্রদ্ধায় আবার বলেছিলেন একটা মানুষ বটে।
গ্যেটে সম্বন্ধে নেপোলিয়নের এই মন্তব্য যথার্থই সত্য। একজন পরিপূর্ণ মানুষ।
জীবনের অন্তিম লগ্নে এসেও এই মানুষটি বিস্মৃত হননি তিনি মানুষ, ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ জীব-যে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে উত্তরণ করে চলেছে অন্ধকার থেকে আলোকে।
১৮৩২ সালের ২২শে মার্চ। কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন গ্যেটে। অনুরাগীরা তাঁকে এনে বসিয়ে দিল তাঁর পাঠকক্ষের চেয়ারে। সকলেই অনুভব করছিল কবির জীবনদীপ নির্বাপিত হয়ে আসছে। এক বিষণ্ণ বেদনায় আচ্ছন্ন হয়েছিল তাদের মন। দিন শেষ হয়ে এসেছিল। বাইরে অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছিল।
গ্যেটে চোখ মেলে তাকালেন। অস্ফুটে বলে উঠলেন, “আরো আলো।”
তারপরই স্তব্ধ হয়ে গেল চির আলোর পথিক গ্যেটের মহাজীবন।
২৬. আলেকজান্ডার ফ্লেমিং
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর জন্ম হয় ১৮৮১ সালের ৬ই আগস্ট স্কটল্যাণ্ডের অন্তর্গত লকফিল্ড বলে এক পাহাড়ি গ্রামে। বাবা ছিলেন চাষী। আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। দারিদ্র্যের মধ্যেই ছেলেবেলা কাটে ফ্লেমিংয়ের। যখন তার সাত বছর বয়স, তখন বাবাকে হারান। অভাবের জন্য প্রাইমারী স্কুলের গণ্ডিটুকুও শেষ করতে পারেননি। যখন ফ্লেমিংয়ের বয়স চৌদ্দ, তাঁর ভাইরা সকলে এসে বাসা বাঁধল লণ্ডন শহরে। তাদের দেখাশুনার ভার ছিল এক বোনের উপর। কিছুদিন কাজের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করবার পর ষোল বছর বয়স এক জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি পেলেন ফ্লেমিং। অফিসে ফাইফরমাশ খাটার কাজ।
