তবে গ্যেটের সার্থক উপন্যাস কাইন্ডার্ড বাই চয়েস’ বা ‘সিলেকটিভ এ্যাফিনিটি’। একই পরিবেশের মধ্যে গড়ে উঠেছে কয়েকটি নরনারী-এডওয়ার্ড ও ওতিলে, শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন। একদিকে নায়ক-নায়িকাদের ইচ্ছাশক্তি অন্যদিকে নিয়তি, এই দুই-এর দ্বন্দ্ব, তার বিস্তারই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু।
উপন্যাস লিখলেও গ্যেটে অনুভব করেছিলেন উপন্যাসে নয়, নাটকেই তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটা সম্ভব। একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুললেন নাটকের দল লিটলট থিয়েটার। এই দলের প্রয়োজনে কয়েকটি অসাধারণ নাটক রচনা করেছিলেন। প্রথম পর্বের নাটকে দেখা যায় তারুণ্য আর যৌবনের উদ্দামতা। তার Stella নাটকে দেখা যায় নায়ক তার স্ত্রীর সাথে বাস করে, অন্যদিকে তার প্রেমিকাকেও ভালবাসে। তিনজনের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক পারস্পরিক সম্পর্ক। এ পরোক্ষভাবে দুই পত্নী গ্রহণের মতবাদ। এর বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে ওঠে। নিরুপায় হয়ে গ্যেটে নাটকের শেষ অঙ্কের পরিবর্তন ঘটালেন। নায়ক স্থির করতে পারে না কাকে বেছে নেবে স্ত্রী না প্রেমিকাকে? মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে।
কিন্তু ক্রমশই গ্যেটের মধ্যেকার এই বিদ্রোহ মনোভাব প্রশমিত হয়ে আসে। যৌবনের উদ্দামতায় যিনি বিদ্রোহী হয়ে সব কিছুকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, এখন হয়ে ওঠেন প্রজ্ঞাবান দার্শনিক, যিনি সব কিছুর মধ্যে অন্বেষণ করেন সৌন্দর্যের প্রজ্ঞার, তিনি জানতেন অভিজাতদের বাইরের সৌন্দর্যের মধ্যে প্রকৃত সৌন্দর্যকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একদল কয়লা খনির শ্রমিক, রুটি তৈরির কারিগরকে দেখে বলেছিলেন তথাকথিত এই নিচু সমাজের মানুষেরাই ঈশ্বরের চোখে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সুন্দর।
মানুষের প্রতি এই অন্তহীন ভালবাসাই ছিল তাঁর সৃষ্টির মূল উৎস। একবার ডিউক কার্ল ফরাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ডিউক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবার জন্যে ডেকে পাঠালেন গ্যেটেকে। গ্যেটে এলেন কিন্তু মানুষের এই বীভৎসতা তাঁর ভাল লাগল না। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে এক নির্জন অঞ্চলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন ফুল, প্রকৃতি। দেশকে তিনি ভালবাসতেন। যখন তাঁকে বলা হয়েছিল যুদ্ধের জন্য গান লিখতে, তিনি বলেছিলেন, যে বিষয়ে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই, সেই বিষয়ে আমি একটি শব্দও উচ্চারণ করি না। আমি যা ভালবাসি শুধু তারই গান গাইতে পারি।
১৭৮৮ সাল, তখন গ্যেটের বয়স ৩৯। তারুণ্যের প্রান্তে পৌঁছে পরিচয় হল ক্রিস্টেন ভারপাইনের সাথে। ক্রিস্টেন তার ভাইয়ের জন্য একটি সুপারিশপত্র নিয়ে এসেছিলেন গ্যেটের কাছে। ক্রিস্টেনের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য শান্ত স্বভাব, সম্বপূর্ণ ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হলেন গ্যেটে। ক্রিস্টেনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। দীর্ঘ আঠারো বছর তারা একত্রে রয়ে গেলেন। ১৮০৬ সালে শুধুমাত্র সন্তানের পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দুজনে বিবাহ করেন।
গ্যেটের জীবনের আরেকটি ঘটনা, কবি শীলারের সাথে পরিচয়। এই পরিচয় অল্পদিনের মধ্যেই গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হল। যদিও দুজনে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। গ্যেটের বয়স তখন ৪৫, শীলারের ৩৫। গ্যেটে প্রাণবন্ত সজীব, শীলার অসুস্থ। ধর্মের প্রতি গ্যেটের প্রাণবন্ত সজীব, শীলার অসুস্থ। ধর্মের প্রতি গ্যেটের কোন আগ্রহ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন অন্তরের প্রকৃতির সৌন্দর্যে। অন্যদিকে শীলার ছিলেন ধর্মভীরু, তিনি বিশ্বাস করতেন ন্যায়বিচারে। গ্যেটে পেয়েছেন ভাগ্যের অকৃপণ সহায়তা, নারীর প্রেম কিন্তু শীলার পেয়েছেন শুধু দারিদ্র্য আর বঞ্চনা। এত বৈষম্য সত্ত্বেও দুজনের বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম। এই বন্ধুত্ব দুজনের সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। শীলার Horen নামে একটি পত্রিকা সম্পাদন করতেন। গ্যেটে এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। এই সময় তাদের লেখার একাধিক বিরূপ সমালোচনা হতে থাকে। দুজনে সরস বুদ্ধিদীপ্ত কবিতায় তার জবাব দিতে থাকেন। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে। যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ Musen Almanach।
১৮০৫ সালে যখন শীলারের মৃত্যু হয়, গ্যেটে শিশুর মত কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এক বন্ধুকে লিখেছিলেন আমার অর্ধেক অস্তিত্ত্ব চলে গেল।
মাত্র ৪৫ বছর বয়েসে বন্ধু দেহরক্ষা করলেও ঈশ্বরের আশীর্বাদে দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন গ্যেটে। ১৭৪৯-১৮৩২ প্রায় তিরাশি বছর-এই সুদীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে তাঁকে-প্রিয় বন্ধু, আদরের বোন, প্রিয়তমা স্ত্রী, একমাত্র সন্তান। এত বেদনার মধ্যেও তাঁর জীবনের অপ্রতিহত গতি কখনো রুদ্ধ হয়নি। তিনি তাঁর সমস্ত যন্ত্রণা বেদনাকে ব্যর্থতাকে রূপান্তর ঘটিয়েছেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। এমন বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভা মানব ইতিহাসে দুর্লভ। কি ছিলেন না তিনি? কবি, নাট্যকার, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক।
তিনি প্রায় ৬০টি বই লিখেছেন-এর মধ্যে আছে গাথা, গীতিকবিতার ব্যঙ্গনাটক, কাব্য, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস, মজাদার কাহিনী, ভূত-দৈত্যদানার গল্প। তার এই বহুব্যাপ্ত প্রতিভার নির্যাস দিয়ে সমস্ত জীবন ধরে সৃষ্টি করেছেন ফাউস্ট, যার প্রথম খণ্ড লিখতে লেগেছিল ত্রিশ বছর, দ্বিতীয় খণ্ড শেষ করতে লেগেছিল পঁচিশ বছর।
