সমস্ত উপন্যাসটি পত্রগুচ্ছের সংকলন। অনেকে বিদগ্ধ সমালোচকের অভিমত উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে যে রোমান্টিক মুভমেন্টের বিকাশ ঘটেছিল তার মূল অনুপ্রেরণা তরুণ ভেক্টরের শোক।
তরুণ ভেক্টরের শোক যখন প্রকাশিত হল, গ্যেটে তখন আইন ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই উপন্যাসের খ্যাতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থির করলেন সাহিত্যকেই জীবনের একমাত্র অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করবেন। সম্ভবত এই সময় থেকেই গ্যেটের মনের মধ্যে ফাউষ্টের ভাবনা জন্ম নেয়।
১৭৭৪ সালে তিনি লিখলেন তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় নাটক Clavigo। এই নাটকের বিষয়বস্তু তিনি পেয়েছিলেন কোরআন থেকে।
গ্যেটের খ্যাতি জনপ্রিয়তা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছিল। যদিও অভিজাত সম্প্রদায়কে তিনি তার বহু রচনায় বিদ্রূপ করেছেন তবুও তাদের প্রতি ছিল এক সহজাত আনুগত্যবোধ আর শ্রদ্ধা। তার এক বন্ধু রাজদরবারে চাকরি নেওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, “ক্ষমতাবান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মধ্যে আমি কোন দোষ দেখি না। যদি শ্রেষ্ঠ মানুষদের সাথে সম্পর্ককে যথার্থভাবে কাজে লাগান যায় তবে তা সব সময়েই কল্যাণকর।”
যখন যুবরাজ কার্ল লুডউইগ তাঁকে ওয়েমারে আমন্ত্রণ করলেন, গ্যেটে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে যুবরাজের আতিথ্য গ্রহণ করলেন। তখন তার বয়স ছাব্বিশ। অবশিষ্ট জীবন তিনি এখানেই অতিবাহিত করেন।
প্রাসাদের কাছেই একটি উদ্যান বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা হল। এখানে পরিচয় হল দুই কিশোর রাজকুমারের সঙ্গে। এই পরিচয় ভবিষ্যৎ জীবনে এক বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
কার্ল ছিলেন শিক্ষা জ্ঞান শিল্প সংস্কৃতির গভীর পৃষ্ঠপোষক। গ্যেটের জ্ঞান সৃজনীশক্তি ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হলেন কার্ল। তাকে অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নির্বাচিত করলেন। গ্যেটে উপলব্ধি করেছিলেন তার দায়িত্বের কথা। তাই সমস্ত কাজকে দুভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন। একদিকে রাজনীতি অন্যদিকে সাহিত্য সৃষ্টি। কনফুসিয়াসের মত তিনিও তরুণ যুবরাজকে নানান বিষয়ে শিক্ষা দিতেন, পরামর্শ দিতেন। এর জন্যে নিজেকে স্বাধীনতা বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হতেন না। সাহিত্যে যিনি ছিলেন চির বিদ্রোহী, ব্যক্তিজীবনে তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত, রাজশক্তির প্রতি চরম অনুগত।
একদিন তিনি ও সুরকার বিঠোফেন রাজপথ দিয়ে হাঁটছিলেন। সেই সময় যুবরাজ সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সকলে রাজপথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। বিঠোফেন কোন ভ্রূক্ষেপ না করে যুবরাজের সামনে দিয়েই পথ অতিক্রম করে গেলেন। কিন্তু গ্যেটে মাথার টুপি খুলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এই আনুগত্যের পেছনে আরো একটি কারণ ছিল। তিনি যেমন সাহিত্য সংস্কৃতিকে ভালবাসতেন তেমনি চাইতেন সুখ বিলাসিতা। যুবরাজের সভাসদ হলেও প্রকৃতপক্ষে তার উপর কোন দায়িত্ব ছিল না। তার অধিকাংশ সময় কাটত জ্ঞানের চর্চায়।
এখানেই পরিচয় হল এক অভিজাত পরিবারের সুন্দরী তরুণীর সাথে। Lili Schonemann. অল্পদিনের মধ্যেই গভীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠল দুজনের মধ্যে। বিবাহের প্রস্তাব দিলেন গ্যেটে। কিন্তু Lili-এর পরিবারের লোকজন গ্যেটের প্রতিষ্ঠার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে চাইলেন। ক্ষুব্ধ গ্যেটে নিজেই এই সম্পর্ক ছিন্ন। করলেন। কিন্তু এই প্রেম কালজয়ী হয়ে আছে ফাউস্টের বহু দৃশ্যে।
একদিকে যখন ফাউস্ট রচনার কাজ চলেছে, তারই পাশাপাশি আমেরিকান বিপ্লবের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রচনা করলেন তাঁর নাটক, এগৰ্মত। এই নাটকের বিষয়বস্তু হল স্পেনের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডবাসীদের বিদ্রোহ। এই নাটকের নায়ক কাউন্ট। এগৰ্মত ছিলেন দেশপ্রেমিক কিন্তু বাস্তব জ্ঞানহীন। নিজের সামর্থ্য শত্রুর শক্তিতে বিচার না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সংগ্রামে। এই হটকারিতার জন্যেই শেষ হল তার জীবন।
১৭৭৯ সাল নাগাদ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ডিউক কার্ল। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ডিউক এবং গ্যেটে গেলেন সুইজারল্যান্ডে। এখানকার শান্ত পরিবেশ, মনোরম প্রাকৃতিক নিসর্গ দৃশ্য। গ্যেটের মনে এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে আসে। ওয়েমারে প্রত্যাবর্তন করে গ্যেটে গভীর অধ্যয়ন শুরু করলেন। মূলত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ছাড়াও তিনি পড়তেন ইতিহাস, দর্শন, চিত্রকলা। গ্যেটের উদ্দেশ্য ছিল ওয়েমারের কৃষি, খনিজ উত্তোলন, সামরিক উন্নয়নের জন্য এই জ্ঞানকে কাজে লাগানো। তাছাড়া নিজেরই অন্তহীন জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়া ফাউস্টের মত গ্যেটেও ছিলেন চির জ্ঞান-অন্বেষী।
একদিকে চলছিল তাঁর জ্ঞান সাধনা অন্য দিকে সাহিত্য সাধনা। এগতের পর রচনা করলেন ভিন্নধর্মী উপন্যাস উইলেম মেস্তার। এই উন্যাসে গ্যেটের নিজের জীবনই অনেকাংশে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। গ্যেটে যাদের ভালবেসেছিলেন তাদের কাউকেই জীবন সঙ্গী হিসাবে পাননি। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রনা তাঁকে আহত করলেও চলার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। উপন্যাসের নায়ক মেস্তারের জীবনেও বারে বারে প্রেম এসেছিল কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও তার চলার ছন্দ বিনষ্ট হয়নি। কিন্তু ঘটনর আধিক্যে উপন্যাসের ছন্দ অনেকাংশে বিঘ্নিত হয়েছে।
