গ্যেটের পিতা চেয়েছিলেন পুত্র এ্যালকেমিস্ট হিসাবে নয়, আইনজ্ঞ হিসাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুক। পিতার ইচ্ছা অনুসারে ১৭৭০ সালে গ্যেটে ফ্রাঙ্কফুট ত্যাগ করে এলেন স্ট্যাটসবুর্গে। আইনের অসমাপ্ত পাঠ শেষ করবার জন্য ভর্তি হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গ্যেটে যেখানে থাকতেন তারই সংলগ্ন ঘরে ছিল কয়েকজন ডাক্তারির ছাত্র। অল্প দিনেই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন গ্যেটে। শুরু হল তাঁর শরীরতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা। এখানেই পরিচয় হল বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের রচনাবলীর সাথে। ভর্তি হলেন সঙ্গীত শিক্ষার স্কুলে। দেখতে দেখতে অল্পদিনের মধ্যে গ্যেটে হয়ে উঠলেন স্ট্যাটসবুর্গের শিক্ষিত সমাজের মধ্যমণি।
গ্যেটের জীবনে ঘটল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গেটের পাশের কক্ষে থাকতেন ওয়েল্যান্ড নামে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক ছাত্র। একদিন গ্যেটেকে নিয়ে গেলেন স্ট্যাটসবুর্গের অদূরে এক গ্রাম্য যাজকের বাড়িতে। সেখানে দেখা হল যাজকের ১৮ বছরের তরুণী কন্যা ফ্রেডরিখ ব্রিয়নের সাথে। তার হাঁটু পর্যন্ত স্কার্টে ঢাকা রয়েছে। মুখে এক গ্রাম্য সরলতা। চোখে উজ্জ্বল স্বচ্ছ দৃষ্টি। প্রথম দর্শনেই ভালবাসার গভীর বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেলেন দুজন। গ্রাম্য প্রকৃতির মাঝে ব্রিয়নের সহজ সরলতা, অনুপম সৌন্দর্য গ্যেটের জীবনের এক নতুন দিগন্তের দ্বারকে উন্মোচিত করল। এই প্রথম গ্যেটে অনুভব করলেন প্রকৃত প্রেমের স্বরূপ। বিবাহের কথা উঠল। কিন্তু গ্যেটে বুঝতে পারলেন সামাজিক কারণে তাদের মধ্যে বিবাহ হওয়া সম্ভব নয়। তখন আইন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ভাগ্যক্রমে গ্যেটে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। বাড়ি থেকে পিতার ডাক এল।
গ্যেটে বুঝতে পারছিলেন ফ্রেডরিখের সাথে তাঁর মিলন সম্ভব নয়। বিষণ্ণ হৃদয়ে গ্যেটে ফিরে গেলেন ফ্রাঙ্কফুটে। গ্যেটের জীবনে বহু নারীর আগমন ঘটেছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র ফ্রেডরিখ সারা জীবন অবিবাহিত থেকে যান। নিজের সম্বন্ধে ফ্রেডরিখ বলেছিলেন, যে মন আমি গ্যেটেকে উৎসর্গ করেছি তা আর কাউকে দিতে পারব না।
ফ্রাঙ্কফুটে ফিরে আসতেই গ্যেটের পিতা তাঁকে পাঠালেন সুপ্রীম কোর্টে। মনের ইচ্ছা পুত্র আইনের জগতে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করুক। সুপ্রীম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করলেন গ্যেটে। কিন্তু আদালতের কাজকর্মের অবস্থা অল্পদিনেই আইন ব্যবসায়ের উপর সব শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেললেন গ্যেটে। স্থির করলেন আর আইন নয়, সাহিত্যই হবে তার জীবনের একমাত্র পেশা।
গ্যেটের প্রিয় লেখক ছিলেন শেকস্পীয়র। তাঁর অনুকরণে তিনি লিখলেন একটি পঞ্চম অঙ্কের নাটক। সাহিত্য হিসাবে এর সামান্যই মূল্য আছে।
সুপ্রীম কোর্টে কাজ করবার সময় গ্যেটে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই পরিবারের কুড়ি বছরের তরুণী কন্যা লটিকে দেখেই তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। গ্যেটে। কিন্তু অল্পদিনেই গ্যেটে জানতে পারলেন লটি অন্য পুরুষের বাগদত্তা। শুধু তাঁর সাথে প্রেমের অভিনয় করেছে। আকস্মিক এই আঘাতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন গ্যেটে। মনে হল আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে আবার উঠে দাঁড়ালেন গ্যেটে।
লটির প্রতি ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি, তার প্রেমিকের প্রতি ঈর্ষা গ্যেটের মনোজগৎকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, চার সপ্তাহের মধ্যে রচনা করলেন তাঁর অবিস্মরণীয় উপন্যাস The sorows of Werther. তরুণ ভেক্টরের শোক। সমস্ত জার্মানি তথা ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই উপন্যাসের প্রতিক্রিয়া। চব্বিশ বছরের অখ্যাত যুবক গ্যেটে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন।
সেদিনকার কিছু সমালোচক এঁকে সেন্টিমেন্টাল রোমান্স বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, তরুণ সমাজের কাছে এই বই চিরদিনের।
এই বইয়ের নায়ক এক তরুণ, নাম ভের্টর। স্বপ্নের জগতে বাস করে ভের্টর। তার মন পাখা মেলে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সব স্বপ্ন তার ভেঙে গেল। একদিন পথে বেরিয়ে পড়ল। ঘুরতে ঘুরতে ভের্টর এসে পড়ল একটা ছোট গ্রাম ভালহাইমে। বসন্তকাল, সমস্ত প্রকৃতি নতুন সাজে সেজে উঠেছে। মুগ্ধ হয়ে গেল ভেক্টর। সেখানেই রয়ে গেল। মনে হল এখানেই জীবনের সব দুঃখকে ভুলতে পারবে।
ধীরে ধীরে তার মন শান্ত প্রকৃতিস্থ হয়ে আসছিল। এমন সময় দেখা হল শারললাটের সাথে। সে অ্যালবার্টের বাগদত্তা। তবুও তাকে দেখে মুগ্ধ হল ভের্টর। ভালবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়ল সে। পরিচিত হল অ্যালবার্টের সাথে। অ্যালবার্টের শান্ত ভদ্র আচরণে বিভ্রান্ত ভের্টর। কেমন করে শারলোটকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবে, আবার শারলোটকে না পেলেও যে তার জীবন অন্ধকার।
মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে ভের্টর। শেষে ঠিক করল সে চলে যাবে অন্য কোথাও। বন্ধু তার জন্যে একটা চাকরি ঠিক করল। কিন্তু চাকরি নিয়েও সুখী হতে পারল না। একদিন সব ছেড়ে আবার ফিরে এল ভালহাইমে। শারলোট তখন অ্যালবার্টের স্ত্রী। সমস্ত অন্তর ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে ভেক্টরের। হতাশার বেদনায় আত্মহত্যা করল ভেক্টর। লাইম গাছের নিচে তার দেহ সমাধি দেওয়া হল।
