ছেলেবেলা থেকেই গ্যেটে ছিলেন এক ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। পিতা যোহান ক্যাসপার চেয়েছিলেন ছেলে তার মতই একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হবে। চার বছর বয়েসে গ্যেটেকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল। কিন্তু স্কুলের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে অল্পদিনেই গ্যেটের প্রাণ হাঁপিয়ে উঠল। মাস্টারদের শাসন, অন্য ছেলেদের দুষ্টামি, কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার বেড়াজালে কিছুতেই নিজেকে মানিতে নিতে পারলেন না। অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাধ্য হয়ে পিতা তাঁকে বাড়িতে এনে গৃহশিক্ষক রেখে পড়াবার ব্যবস্থা করলেন। একদিকে চলতে লাগল ল্যাটিন, গ্রীক, ইটালিয়ান, ইংরাজি ভাষা শিক্ষা, অন্যদিকে ছবি আঁকা, গান শেখা। এরই মধ্যে শৈশব কালেরই গ্যেটের মনে গড়ে উঠেছিল এক ভিন্ন জগৎ। যা প্রচলিত জীবন পথ থেকে স্বতন্ত্র, মাত্র ছ বছর বয়েসে ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন গ্যেটে। দুচোখ ভরে দেখতেন প্রকৃতির অপরূপ শোভা। মানুষজন বাড়িঘর জীবনের নানা রূপ। যা কিছু একবার দেখতেন জীবনের স্মৃতিপটে তা অক্ষয় হয়ে থাকত। কৈশোরের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তার নানান রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।
কৈশোরেই শুরু হয়েছিল তাঁর সাহিত্য জীবনের হাতেখড়ি। তিনি নিজের সম্বন্ধে লিখেছেন, “যখন আমার দশ বছর বয়েস তখন আমি কবিতা লিখতে শুরু করি যদিও জানতাম না সেই লেখা ভাল কিম্বা মন্দ। কিন্তু উপলব্ধি করতে পারতাম অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করবার ক্ষমতা আমার মধ্যে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জন্ম থেকেই তিনি কবি। কবিতা ছিল তার সত্তায় আর সেই সত্তার সাথে মিশে ছিল তাঁর প্রেম। যে প্রেমের শুরু মাত্র পনেরো বছর বয়েসে। শেষ প্রেম চুয়াত্তর বছর বয়েসে।
একদিন গ্যেটে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে সরাইখানায় গিয়েছেন, সেখানে দেখলেন সরাইখানার মালিকের কিশোরী কন্য মাগুরিতকে। তাঁর চেয়ে কয়েক বছরের বড়। কিন্তু প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হলেন গ্যেটে। অল্প দিনেই দুজনে পরস্পরের প্রতি গভীর প্রেমে আকৃষ্ট হলেন। গ্যেটে লিখেছেন তার প্রতি আমার দুর্নিবার আকর্ষণ আমার মনের মধ্যে সৃষ্টি করল এক নতুন সৌন্দর্যের জগৎ আর আমাকে উত্তোরিত করল পবিত্রতম মহত্ত্বে।
গ্যেটের কৈশোর জীবনের প্রথম প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাগুরিত ফ্রাঙ্কফুট ছেড়ে পিতার সঙ্গে গ্রামে চলে গেলেন।
বিচ্ছেদ বেদনায় সাময়িক ভেঙে পড়লেও ধীরে ধীরে আবার নিজেকে আনন্দ জগতে ভাসিয়ে দিলেন গ্যেটে। সমস্ত দিন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আমোদ আহ্লাদেই কেটে যায়। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন পিতা। স্থির করলেন আইন পড়বার জন্য গ্যেটেকে লিপজিগে পাঠাবেন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পিতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য গ্যেটে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। আইনের প্রতি সামান্যতম আকর্ষণ ছিল না তার। ক্লাস কামাই করে অধিকাংশ সময় তিনি ঘুরে বেড়াতেন পথে প্রান্তরে, বাজারে মানুষের ভিড়ে। “আমি মনে করি এই পৃথিবী আর ঈশ্বর সম্বন্ধে আমার জ্ঞান কলেজের শিক্ষকদের চেয়ে বেশি। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার-দেওয়ালের ক্লাসঘরের মধ্যে থেকে আমি যা জানতে পারব, বাইরের উন্মুক্ত পৃথিবীর মানুষদের কাছ থেকে তার থেকে অনেক বেশি জানতে পারবে।”
তাঁর এই জীবনবোধের অনুপ্রেরণায় মাত্র সতেরো বছর বয়সে রচনা করলেন নাটক Lover’s Quarrels এবং The fellow Sinners। শেষ নাটকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে বিবাহিত জীবনের ব্যভিচার। এক বৃদ্ধ যিনি যৌবনের পাপের জন্য নিয়ত অনুশোচনায় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, এক নৈতিক প্রশ্ন তাঁর জীবনে বড় হয়ে উঠেছে। তরুণ গ্যেটের মনে হয়েছে। আমরা সকলেই অপরাধী। অপরাধবোধের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ অন্যকে ক্ষমা করা, অতীতকে বিস্মৃত হওয়া।
গ্যেটে কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পা দিয়েছেন। তাঁর স্বপ্নলু চোখ সুদর্শন চেহারা, প্রাণের উচ্ছলতা সকলকে আকৃষ্ট করে। এক অজানা আকর্ষণে যে তার সংস্পর্শে আসে, সেই মুগ্ধ হয়ে যায়।
উচ্ছ্বাসের রঙিন ফেনায় লিপজিগের দিনগুলো কাটতে থাকে। এই সময় গ্যেটের পরিচয় হল বাড়িওলার মেয়ে এনেৎ-এর সাথে কয়েকদিনের মধ্যেই তার প্রেমে পড়ে গেলেন গ্যেটে। কিন্তু অল্প দিনেই প্রেমের জোয়ারে ভাটা পড়ল গ্যেটের। এনেৎ-এর আচরণে তাঁর প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়লেন। নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়লেন গ্যেটে। উপরন্তু বেহিসেবী উদ্দাম জীবনযাত্রার কারণে তার স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছিল। গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বন্ধুরা তাঁর জীবনের আশা ত্যাগ করল। কিন্তু অদম্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর গ্যেটে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। আর লিপজিগ ভাল লাগছিল না। ফিরে এলেন ফ্রাঙ্কফুটে। যোহান ক্যাসপার চেয়েছিলেন ছেলে আইনজ্ঞ হয়ে ফিরে আসবে। গ্যেটে পিতার কাছে ফিরে এলেন তবে আইনজ্ঞ হয়ে নয়, কবি হয়ে।
ছেলের পরিবর্তন পিতা-মাতার চোখ এড়াল না। তবুও তারা আশা হারালেন না। এই সময় গ্যেটে মায়ের এক বন্ধু তাকে এ্যালকেমির (মধ্যযুগের রসায়ন শাস্ত্র) ভর্তি করে। দিলেন। শুরু হয় গ্যেটের এ্যালকেমি শিক্ষা। এই এ্যালকেমি বিদ্যাকেই তিনি রূপ দিয়েছেন তাঁর ফাউস্টে।
