১৮৯৭ সালে ১লা মে বলরাম বসুর বাড়িতে স্বামীজীর আহ্বানে শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত ও সন্ন্যাসীরা সকলে মিলিত হলেন। স্বামীজী বললেন, “নানান দেশ ঘুরে আমার ধারণা হয়েছে সঙ্ঘ ব্যতীত কোন বড় কাজ হতে পারে না।”
প্রতিষ্ঠিত হল রামকৃষ্ণ মিশন। বলা হল “মানবের হিতার্থে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যে সকল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন ও যে কার্যে তাহার জীবন প্রতিপাদিত হইয়াছে, তাহার প্রচারে এবং মনুষ্যের দৈহিক, মানসিক ও পারমার্থিক উন্নতিকল্পে যাহাতে সেই সকল তত্ত্ব প্রযুক্ত হইতে পারে তদ্বিষয়ে সাহায্য করা এই মিশনের উদ্দেশ্য।”
গঙ্গার তীরে বেলুড়ে জমি কেনা হল। এখানেই ১৮৯৮ সালের ৯ই ডিসেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ স্থাপিত হল। বিবেকানন্দ সমস্ত আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে রামকৃষ্ণ মিশনকে সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। স্বামীজীর ভক্ত মিসেস ওলি বুল ও মিস হেনরিয়েটা মূলারের প্রদত্ত অর্থেই বেলুড় মঠের জমি কেনা হয় ও ভবন নির্মাণ করা হয়।
এই সময় স্বামীজীকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হত। ক্রমশই তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছিল। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসকের নির্দেশে দার্জিলিং গেলেন।
১৮৯৮ সালে কলকাতায় প্লেগ দেখা দিল। স্বামীজী ছুটে এলেন কলকাতায়। শিষ্যদের নিয়ে শুরু করলেন অসুস্থ মানুষদের সেবা। রামকৃষ্ণের শিবজ্ঞানে জীব সেবার আদর্শ মূর্ত হয়ে উঠল স্বামীজীর মধ্যে। ১৮৯৯ সালের ২০শে জুন স্বামীজী দ্বিতীয়বারের জন্য ইউরোপ আমেরিকা ভ্রমণে বার হলেন। এই বার তার সাথে ছিলেন স্বামী তুরিয়ানন্দ ও তাঁর মানসকন্যা নিবেদিতা। সর্বত্রই তিনি পৃজিত হয়েছেন ভারতবর্ষের এক মহান মানব হিসাবে। তিনি পাশ্চাত্যের মানুষের কাছে উপনিষদের বাণীকেই নতুন করে প্রচার করেছিলেন। তিনি বললেন, মানুষের অন্তরে যে দেবত্ব আছে তাকে জাগিয়ে তোলাই মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইংল্যাণ্ড আমেরিকা ছাড়াও প্যারিস ভিয়েনা এথেন্স মিশর ভ্রমণ শেষ করে ৯ই ডিসেম্বর ১৯০০ সালে বেলুড় মঠে ফিরে এলেন।
১৯০১ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি বেলুড় মঠের ট্রাস্ট ভীড় রেজিস্ট্রী হয়। ১০ই ফেব্রুয়ারি মঠের ট্রাস্টীদের সর্বসম্মতিক্রমে স্বামী ব্রহ্মানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ এবং স্বামী সারদানন্দ সাধারণ সম্পাদক হন।
স্বামীজী মঠের সমস্ত কাজকর্ম থেকে প্রকৃতপক্ষে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যান। কেউ কোন পরামর্শ চাইলে তিনি তাদের বুদ্ধিমত কাজ করার পরামর্শ দিতেন।
অত্যধিক পরিশ্রমে স্বামীজীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। বেশির ভাগ সময় ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন। ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাসে জাপানী পণ্ডিত ডাঃ ওকাবুর সাথে বুদ্ধগয়ায় গেলেন। সেখানে থেকে কাশী। কিছুদিন পর আবার বেলুড়ে ফিরে এলেন। শরীর একেবারেই ভেঙে পড়েছিল।
১৯০২ সালের ৩রা জুলাই স্বামীজী তার ভক্ত-শিষ্যদের খাওয়ার পর নিজে হাত ধুইয়ে দিলেন। একজন জিজ্ঞাসা করল আমরা কি আপনার সেবা গ্রহণ করতে পারি? স্বামীজী বললেন, যীশুও তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন।
পরদিন ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই স্বামীজী সকাল থেকেই উৎফুল্ল ছিলেন। সকলের সঙ্গে একসাথে খেয়ে সন্ধ্যায় পর নিজের ঘরে ধ্যানে বসলেন। রাত ৯টা ৫০ মিনিটে সেই ধ্যানের মধ্যেই মহাসমাধিতে ডুবে গেলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৯ বছর ৬ মাস।
২৫. যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে জার্মানিতে প্রকাশিত হল একখানি উপন্যাস, নাম “The sorrows of Werther” (তরুণ ভেক্টরের শোক)। উপন্যাস প্রকাশিত হবার সাথে সাথে সমস্ত জার্মানিতে আলোড়ন পড়ে গেল। ক্রমশই তার ঢেউ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ল সমস্ত ইউরোপে, এমনকি সুদূর চীনেও।
কাহিনীর নায়ক ভের্টর এক ছন্নছাড়া যুবক। তার কবি মন স্বপ্নের জগতে বাস করে। মাঝে মাঝেই আঘাত পায়, বেদনায় ভেঙে পড়ে। আবার সব ভুলে নতুন করে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সে স্বপ্নও ভেঙে যায়। নতুন জীবনের আশায় শহরের কাছে এক গ্রামে এল। গ্রামের মুক্ত প্রকৃতি গছা ফুল পাখি মানুষ মুগ্ধ করে ভেক্টরকে, প্রিয়তম বন্ধু হেলমকে চিঠি লেখে ভেক্টর। এই চিঠির মালা সাজিয়েই সৃষ্টি হয়েছে উপন্যাস। জীবনে আঘাত ব্যর্থতা হতাশায় শেষ পর্যন্ত সব আশা হারিয়ে আত্মহত্যা করে ভের্টর।
ভেক্টরের আশা নিরাশা তার কল্পনা রোমান্স সমস্ত মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করল। যুবক-যুবতীদের কাছে ভের্টর হয়ে উঠল আদর্শ। উপন্যাসের পাতা ছাড়িয়ে ভেক্টর হয়ে উঠল এক জীবন্ত মানব। তার অনুকরণে ছেলেরা পরতে আরম্ভ করল নীল কোট, হলদে ওয়েস্ট কোট। মেয়েরা নায়িকার মত সাদা পোশাক আর পিঙ্ক বো-তে নিজেদের সাজাতে থাকে। সকলেই যেন ভেক্টরের জীবনের সাথে জীবন মেলাতে দলে দলে যুবক-যুবতীরা আত্মহত্যা করতে আরম্ভ করল।
শুধু একটি মানুষ নির্বিকার। ভেক্টরের জীবনের সেই বিষাদ, বিষণ্ণতা, অন্ধকার তার জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি কারণ তিনি যে চির আলোর পথিক, ভেক্টরের স্রষ্টা, জার্মান সাহিত্যের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ পুরুষ যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে।
গ্যেটের জন্ম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে। তারিখটি ছিল ১৭৪৯ সালের ২৮ শে আগস্ট। গ্যেটের প্রপিতামহ ছিলেন কামার, পিতামহ দর্জি। পিতামহ চেয়েছিলেন সম্ভ্রান্ত নাগরিক হিসাবে ছেলেকে গড়ে তুলতে। গ্যেটের পিতা যোহান ক্যাসপার পড়াশুনা শেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। যোহান ছিলেন যেমন শৃঙ্খলাপরায়ণ তেমনি সুপণ্ডিত। অন্যদিকে গ্যেটের মা ছিলেন সহজ সরল উদার হৃদয়ের মানুষ। গ্যেটের জীবনে পিতা এবং মাতা দুজনেরই ছিল ব্যাপক প্রভাব। গ্যেটে লিখেছেন, আমার জীবন সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল পিতার কাছ থেকে, মায়ের কাছে পেয়েছিলাম সৃষ্টির প্রেরণা।
