যথাসময়ে স্বামীজী হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে ধর্মসভার অন্তর্ভুক্ত হলেন। এই ব্যাপারে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার কথা স্বামীজী নিজেই লিখে গিয়েছেন।
সকলেই বক্তৃতা প্রস্তুত করিয়া আনিয়াছিলেন। আমি নির্বোধ, আমি কিছুই প্রস্তুত করি নাই। দেবী সরস্বতীতে প্রণাম করিয়া অগ্রসর হইলাম। ব্যারোজ মহোদয় আমার পরিচয় দিলেন। আমার গৈরিক বসনে শ্রোতাবর্গের চিত্ত কিছু আকৃষ্ট হয়েছিল।
আমি আমেরিকাবাসীদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে আরো দু-এক কথা বলে একটি ক্ষুদ্র বক্তৃতা করলাম। যখন আমি আমেরিকাবাসী ভগ্নী ও ভ্রাতৃগণ বলিয়া সভাকে সম্বোধন করিলাম তখন দুই মিনিট ধরিয়া এমন করতালি ধ্বনি হইতে লাগিল যে কান যেন কালা করিয়া দেয়। তারপর আমি বলতে আরম্ভ করিলাম। যখন আমার বলা শেষ হইল আমি তখন হৃদয়ের আবেগেই একেবারে যেন অবশ হইয়া পড়িলাম। পর দিন সব খবরের কাগজ বলিতে লাগিল আমার বক্তৃতাই সেইদিন সকলের প্রাণে লাগিয়াছে। সুতরাং তখন সমগ্র আমেরিকা আমাকে জানিতে পারিল।”
এ্যানি বেসান্ত লিখেছেন, “মহিমাময় মূর্তি, গৈরিক বসন, ভারতীয় সূর্যের মত ভাস্বর, উন্নত শির, মর্মভেদী দৃষ্টিপূর্ণ চক্ষু, চঞ্চল ওষ্ঠাধর, মনোহর অঙ্গভঙ্গী…স্বামী বিবেকানন্দ আমার দৃষ্টিপথে এইরূপে প্রতিভাত হয়েছিলেন। প্রথম দৃষ্টিতে তিনি যোদ্ধা সন্ন্যাসী ছিলেন।”
স্বামী বিবেকানন্দ সেদিন পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দুপ্তকণ্ঠে প্রাচ্যের সুমহান আদর্শকে তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের সামনে। তাঁর মধ্যে এক দৈবশক্তি জেগে উঠেছিল। সেদিন তার মধ্যে পাশ্চাত্যের মানুষ দেখেছিল ভারতের মহিমান্বিত রূপ।
শিকাগো ধর্মসভা শেষ হবার পর স্বামীজী দু মাস হিন্দু ধর্ম প্রসঙ্গে বক্তৃতা দিয়ে নিজেকে নিবৃত্ত রাখেননি। পাশ্চাত্য সভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ গুণ তাকে উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাদের বিজ্ঞানে অগ্রগতি। তাই তিনি লিখেছিলেন প্রাচ্যকে নিতে হবে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক জ্ঞান। এই দু-এর সম্মেলনেই গড়ে উঠবে প্রকৃত সভ্যতা।
প্রায় দু বছর তিনি আমেরিকাতে ছিলেন। সেখানকার বড় বড় শহরে ঘুরে ঘুরে তিনি বক্তৃতা দিতেন। তাঁর এই বক্তৃতায় আমেরিকার শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। বহু মানুষ তার ভক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু ভারতীয় ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ তাঁর খ্যাতি প্রভাবে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। তারা স্বামীজীকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। আমেরিকায় থাকার সময় মিস হেনরিয়েটা মুলার নামে এক ইংরেজ মহিলার আমন্ত্রণে ১৮৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ইংলন্ডে এসে পৌঁছলেন। কয়েক মাস পরেই আবার আমেরিকায় যেতে হয়। চার মাস পর পুনরায় তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। প্রায় সাত মাস ইংলণ্ডে ছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেন। এখানেই পরিচয় হয় মার্গারেটের সাথে। যিনি পরবর্তীকালে হন স্বামীজীর প্রিয় শিষ্যা ভগ্নী নিবেদিতা।
ইংলণ্ডে স্বামীজীর প্রভাব সম্পর্কে বিপিনচন্দ্র পাল একটি চিঠিতে লিখেছেন, ইংলণ্ডের অনেক জায়গায় আমি এমন বহু লোকের সান্নিধ্যে এসেছি যারা স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি পোষণ করেন। সত্য বটে আমি তাঁর সম্প্রদায়ভুক্ত নই তথাপি আমাকে স্বীকার করতেই হবে বিবেকানন্দের প্রভাবগুণেই ইংলণ্ডে এখানকার অধিকাংশ লোক আজকাল বিশ্বাস করে যে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক তত্ত্ব নিহিত আছে।
১৮৯৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তিনি ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। দীর্ঘ চার বছরের বিদেশ ভ্রমণ শেষ হল। “এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ”। ১৮৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারি তিনি কলম্বেয় এসে পৌঁছান।
স্বামীজী শুধুমাত্র প্রাচ্যের বাণীকে ইউরোপ আমেরিকায় তুলে ধরে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেননি তার এই ঐতিহাসিক সাফল্যে ভারতবর্ষের মানুষ ফিরে পেয়েছিল তাদের আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতা, অশিক্ষা আর দারিদ্রের মধ্যে ভারতবর্ষের মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে। সেই দিন তারই অনুপ্রেরণায় ভারতবর্ষের মানুষ নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করল।
২০শে জানুয়ারি কলকাতায় এসে পৌঁছলেন স্বামীজী। সেই দিন সমস্ত কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠেছিল। কলকাতা তথা ভারতবর্ষের মানুষ সেই দিন তাদের অন্তরের সব শ্রদ্ধা ভালবাসা উজাড় করেছিল স্বামীজীর পদপ্রান্তে।
দেশে ফিরে এসেও বিশ্রাম নেবার কোন অবকাশ পেলেন না স্বামীজী। তিনি নিজেও জানতেন দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলবার জন্য যে গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন, সেখানে বিশ্রাম নেবার মত কোন অবকাশ নেই। তিনি দেশের যুবসমাজকে আহ্বান করে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের নিকট এই গরীব অজ্ঞ অত্যাচারপীড়িতদের জন্য সহানুভূতি, এই প্রাণপণ চেষ্টা দায়স্বরূপ অর্পণ করিতেছি। তোমরা সারা জীবন এই ত্রিশ কোটি ভারতবাসীর উদ্ধারের ব্রত গ্রহণ কর–আমি সূচনা করিয়াছি, তোমরা সম্পূর্ণ কর।”
জাতীয় কল্যাণের এই আদর্শকে সামনে রেখে তিনি দেশের তরুণ সম্পদায়ের সামনে কর্মযোগের বাণীকে প্রচার করতে চেয়েছেন। এবং এই কাজের জন্য প্রয়োজন একটি কেন্দ্রীয় মঠের। যেখান থেকে শুধু তিনি নন, তাঁর শিষ্যরাও সন্ন্যাসযোগ ও কর্মযোগের সুমহান বাণীকে তুলে ধরতে পারবে দেশ-বিদেশে মানুষের কাছে।
