স্বামীজী যখন যেখানে গিয়েছেন, যাঁরাই তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁর ব্যক্তিত্ব পাণ্ডিত্য সদা প্রসন্নময় মুখমন্ডলের দিকে চেয়ে সকলেই মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি যখন দক্ষিণ ভারতে ছিলেন সেই সময় অধ্যাপক পণ্ডিত শঙ্কর পাণ্ডরঙ্গজী তাঁকে বলেন, স্বামীজী এদেশে ধর্মপ্রচার করে আপনি বিশেষ সুবিধা করতে পারবেন বলে মনে হয় না। আপনার উদার ভাবসমূহ আমাদের দেশের লোক সহজে বুঝবে না। আপনি এদের মধ্যে শক্তি ক্ষয় না করে পাশ্চাত্যদেশে যান, সেখানকার লোক মহত্ত্বের ও প্রতিভার সম্মান করতে জানে। আপনি নিশ্চয়ই পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার উপর সনাতন ধর্মের অপূর্ব জ্ঞানালোক নিক্ষেপ করে এক অভিনব যুগান্তর আনতে পারবেন।
সম্ভবত এই উপদেশই তাঁর মনে প্রথম বিদেশযাত্রার ইচ্ছাকে জাগিয়ে তুলেছিল। ১৮৮৮ সালে এক তরুণ মন নিয়ে বরানগর মঠ থেকে ভারত পরিভ্রমণে বার হয়েছিলেন বিবেকানন্দ। ১৮৯২ সালের শেষ প্রান্তে সমস্ত ভারতবর্ষে ভ্রমণ করে এসে পৌঁছালেন দক্ষিণে কন্যাকুমারিকায়। তখন তিনি জ্ঞান আর ব্যাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোতে এক পরিণত প্রজ্ঞাবান। ভারতের শ্বেত পাথরের উপর বসে তার স্বীকার না করে তবে তিনি কেমন করে যাবেন!
শেষ পর্যন্ত শিষ্যদের একান্ত অনুরোধে তিনি বললেন, তোমরা সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে অর্থ ভিক্ষা কর। রাজা নবাবের অর্থে নয়, সাধারণ মানুষের দানের অর্থেই ধর্মসভায় যোগ দিতে চাই। একদিন স্বামীজী স্বপ্নে দেখিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ যেন তাকে সমুদ্র পার হয়ে বিদেশযাত্রার ইঙ্গিত দিলেন।
মায়ের পত্র পেয়ে সব বাধা দূর হয়ে গেল। স্থানীয় উৎসাহী শিষ্যরা যখন তার যাত্রার আয়োজন শুরু করেছে এমন সময় খেতরির মহারাজার দূত এসে তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেল খেতরিতে। স্বামীজীর আশীর্বাদ মহারাজের পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। তার অন্নপ্রাশন।
মহারাজই তার আমেরিকা যাত্রার আয়োজন করলেন। বোম্বাইতে এসে মহারাজার মুন্সী জগমোহন স্বামীজীর জন্য বহুমূল্য রেশমের আলখাল্লা ও পাগড়ী তৈরি করালেন। তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিলেন। একটি জাহাজে প্রথম শ্রেণীর কেবিন রিজার্ভ করা হল।
১৮৯৩ সালের ৩১ মে স্বামীজী শিকাগো অভিমুখে যাত্রা করলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই জাহাজের অধিকাংশ যাত্রীর সাথে তার পরিচয় গড়ে উঠল। জাহাজ সিংহল মালয় সিঙ্গাপুর হয়ে হংকং-এ কয়েকদিনের জন্য অবস্থান করল। এই সুযোগে স্বামীজী দঃ চীনের রাজধানী ক্যান্টন ঘুরে এলেন। তাঁর গভীর দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করলেন চীনের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। ভারতবর্ষ ও চীন এই দুই প্রাচীন সভ্যতার তুলনা করে বললেন, “চীন ও ভারতবাসী যে সভ্যতা সোপানে এক পা অগ্রসর হতে পারছে না দারিদ্রই তার প্রধান কারণ।”
যখন আমেরিকায় এসে পৌঁছলেন তখন তিনি সন্ন্যাসী মাত্র। তাঁর কাছে ছিল না কোন নিমন্ত্রণ পত্র, ছিল না প্রয়োজনীয় অর্থ। ভারতবর্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে মনোনীত করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, জ্ঞানশরণ চক্রবর্তী এছাড়া বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, বৈষবধর্ম, পার্শী ধর্মের প্রতিনিধি কিন্তু হিন্দু ধর্মের কেউ ছিল না।
অপরিচিত অজানা দেশ। প্রতি পদে বাধা আর বিদ্রূপ। সবকিছু উপেক্ষা করে রইলেন স্বামীজী। তখনো ধর্ম সম্মেলনের বেশ কিছুদিন বাকি ছিল। কিভাবে ধর্ম সম্মেলনে যোগ দেবেন তারই চিন্তায় বিভোর হয়ে ছিলেন স্বামীজী। এই সময় তার সাথে পরিচয় হল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক মিঃ জে এইচ রাইটের সাথে। তিনি স্বামীজীর ব্যক্তিত্বে, তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হলেন। স্বামীজীর ব্যক্তিত্বে, তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হলেন। স্বামীজীর আমেরিকায় আসবার উদ্দেশ্য, তাঁর অসুবিধার কথা শুনে ধর্মমহাসভার সাথে যুক্ত মিঃ বনিকে একটি চিঠি লিখে দিলেন। তাতে মিঃ রাইট লিখেছিলেন এই অজ্ঞাতনামা হিন্দু সন্ন্যাসী আমাদের সব পণ্ডিতদের চেয়েও বেশি পণ্ডিত।
রাইট চিঠির সাথে শিকাগো যাওয়ার টিকিট কিনে দিলেন স্বামীজী যখন শিকাগো শহরে এসে পৌঁছলেন তখন দিন শেষ হয়ে এসেছিল। ধর্মমহাসভার অফিসের ঠিকানা। জানেন না। স্বামীজী দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁরা স্বামীজীর অদ্ভুত পোশাক দেখে উপহাস করল। রাত্রি কাটাবার জন্য কোথাও কোন আশ্রয় পেলেন না। শেষে নিরুপায় হয়ে রেলের মালগুদামের সামনে পড়ে থাকা একটি বড় প্যাকিং বাক্সের মধ্যে জড়সড় হয়ে বসে রইলেন। বাইরে প্রবল শীত। সমস্ত রাত্রি সেইভাবে কেটে গেল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়, অনাহারে স্বামীজীর তখন অর্ধমৃত অবস্থা। সকাল হতেই প্রচণ্ড ক্ষুধায় দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু কারো কাছ থেকে একমুষ্টি ভিক্ষা পেলেন না। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে একটি বাড়ির সামনে এসে পড়লেন।
সেই বাড়িতে থাকতেন মিসেস জর্জ ডব্লিউ হেইল নামে একজন বয়স্কা মহিলা। স্বামীজীকে দেখামাত্রই তাঁর অন্তরে এমন এক ভাবের সঞ্চার হল, তিনি স্বামীজীকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে যথেষ্ট আদর যত্ন করলেন। ধর্মসভায় যোগদানের ব্যাপারে এই ভদ্রমহিলা স্বামীজীকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন।
