নিজের ভ্রান্তি অনুভব করে লজ্জিত হলেন নরেন্দ্রনাথ। প্রকৃতপক্ষে এই শিক্ষাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন “বহুজনহিতায় বহুজন সুখায় কর্ম করিব।”।
১৮৮৬ সালের ১৫ই আগস্ট রামকৃষ্ণ দেহত্যাগ করলেন। নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের সঙ্গ পেয়েছিলেন পাঁচ বছর। শেষ কয়েক মাস ছাড়া কোনদিনই তাদের মধ্যে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু তারই মধ্যে রামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক সম্পদ, তাঁর উদয় ধর্মমত, সর্বজীবের প্রতি দয়া, সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শকে আত্মস্থ করেছিলেন, তার মধ্যে ভারতবর্ষের সব মহাপুরুষদের সদগুণের পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। যিনি একাধারে শঙ্করের অদ্ভুত মস্তিষ্ক এবং চৈতন্যের অদ্ভুত বিশাল অনন্ত হৃদয়ের অধিকারী, যাঁহার হৃদয় ভারতান্তর্গত বা ভারতবহির্ত দরিদ্র দুর্বল পতিত সকলের জন্য কাঁদিবে…যিনি সকল বিরোধী সম্প্রদায়ের সমন্বয় সাধন করিবেন…এই রূপ ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং আমি অনেক বর্ষ ধরিয়া তাহার চরণতলে বসিয়া শিক্ষালাভের সৌভাগ্যলাভ করিয়াছি।” রামকৃষ্ণদেব গৈরিক বস্ত্র দিলেও তাঁর শিষ্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন তাঁর মৃত্যুর পর। ঠাকুরের পবিত্র ভস্মকে সাক্ষী রেখে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীরা শাস্ত্রানুমোদিতভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন।
ঠাকুরের মৃত্যুর পর কাশীপুর উদ্যানবাটী ছেড়ে দিতে হল। বিবেকানন্দ দেখলেন এই অবস্থায় যদি তরুণ সন্ন্যাসীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তবে শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শকে প্রচারের পথে নানান ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। তাছাড়া এই সব সন্ন্যাসীরা দিকহারা পথিকের মত অকূল পাথারে ভেসে যাবে।
রামকৃষ্ণের জনৈক ভক্ত বরানগরে একটি বাড়ি ঠিক করে দিল। সেখানে উঠলেন সকলে। সেখানকার অবস্থা বর্ণনা করে একজন লিখেছেন, “নিচের তলা ব্যবহার করা যায় না। উপরের তলায় তিনটে ঘর…একবেলা ভাত কোনদিন জুটত কোনদিন জুটত না। থালাবাসন তো কিছুই নেই। বাড়ির সংলগ্ন বাগানে লাউগাছ কলাগাছ ঢের ছিল! দুটো লাউপাতা কি একখানি কলাপাতা কাটবার উপায় ছিল না। শেষে মানকচুর পাতায় ভাত ঢেলে খেতে হত। তেলাকুচোর পাত সিদ্ধ আর ভাত। কিছু খেলেই গলা কুটকুট করতো। এত যে কষ্ট, ঐক্ষেপ ছিল না।”
এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে সকলকে আনন্দ উৎসাহে প্রাণশক্তিতে ভরিয়ে রেখেছিলেন বিবেকানন্দ। গুরুর অবর্তমানে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সংঘের প্রধান। সেই দিনকার মঠের সন্ন্যাসেীদের মধ্যে যে সাধনা ত্যাগ কষ্ট সহিষ্ণুতার প্রবল শক্তি জেগে উঠেছিল তারই প্রভাবে একদিন তারা সকলেই হয়ে উঠেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ শিষ্য।
কিছুদিন বরানগর মঠে থাকার পর শুরু হল তাঁর পরিব্রাজক জীবন। তিনি তার সতীর্থদের ডাক দিয়ে বললেন এবারে আমাদের প্রচারে নামতে হবে। ভারতবর্ষকে দেখতে হবে। বুঝতে হবে এই লক্ষ কোটি নর-নারীর দৈনন্দিন জীবনের স্তরে স্তরে কত বেদনা কত কুসংস্কারের জঞ্জাল পুঞ্জীকৃত হয়ে আছে। এদের কল্যাণব্রতের সাধনা শুধু স্বার্থত্যাগের কথা নয়, সর্বত্যাগের কথা।
১৮৮৮ সাল। শুরু হল বিবেকানন্দের ভারত পরিক্রম। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ভারতবর্ষের এক প্রান্তে থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ালেন। দেখলেন ভারতবর্ষের প্রকৃত রূপ। ধর্মের নামে ভণ্ডামি আর অধর্ম। দেশ জুড়ে শুধু দারিদ্র অশিক্ষা আর অন্ধ সংস্কার। বৃহত্তম মানব সমাজই পশুর স্তরে বাস করছে। এই সব দৃশ্য তাঁকে যে বিচলিত করত তাই নয়, কেমন করে এর থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় সেই বিষয়ও গভীরভাবে চিন্তা করতেন।
এই পরিব্রাজক জীবনের মধ্যে দিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলেছিলেন বিবেকানন্দ। তিনি যে শুধু সনাতন হিন্দু ধর্মের বাণীকে প্রচার করতেন, লোককে উদ্বুদ্ধ হবার শিক্ষা দিতেন তাই নয়, নিজেও বহু কিছু শিক্ষা লাভ করতেন। একবার তিনি খেতড়ির রাজদরবারে অতিথি ছিলেন। সন্ধ্যেবেলায় রাজা সঙ্গীতের আয়োজন করেছেন। এক বাঈজী গান আরম্ভ করতেই তিনি উঠে পড়তেন। বললেন সন্ন্যাসীর পক্ষে এই রকম আসরে উপস্থিত থাকা অনুচিত। বাঈজী দুঃখিতভাবে গান আরম্ভ করল, “প্রভু তুমি আমার নাম দোষ নিও না। তোমার নাম সমদর্শী, আমাকে উদ্ধার কর।” স্বামীজী গান শুনে বুঝতে পারলেন ঈশ্বর সর্ব মানবইর মধ্যেই বিরাজমান। সাথে সাথে নিজের ভ্রান্তি বুঝতে পারলেন। অনুশোচনায় নিজেকে ধিক্কার দিলেন। সন্ন্যাসী হয়েও নারী-পুরুষের ভেদ রয়েছে। তিনি পুনরায় নিজের আসনে এসে বসলেন। সঙ্গীত অনুষ্ঠানের শেষে বাঈজীর কাছে যে শিক্ষা পেয়েছেন। তার জন্যে তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলেন।
সমাজের হীনতম ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা সমবেদনা পরবর্তী জীবনে আরো প্রবল হয়ে উঠেছিল। তারই প্রমাণ পাই স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লেখা একটি চিঠিতে। “বেশ্যারা যদি দক্ষিণেশ্বরের মহাতীর্থে যাইতে না পায় তো কোথায় যাইবে? পাপীদের জন্য প্রভুর যত প্রকাশ পুণ্যবানদের জন্য তত নহে।…ভেদাভেদ সংসারের মধ্যে থাকুক…তীর্থে যদি ঐরূপ ভেদ হয় তাহলে তীর্থ আর নরকে ভেদ কি? যাহারা ঠাকুর ঘরে গিয়েও ঐ বেশ্যা, ঐ নীচ জাতি, ঐ গরীব, ঐ ছোটলোক ভাবে তাহাদের সংখ্যা যতই কম হয় ততই মঙ্গল। যাহারা ভক্তের জাতি বা যোনি বা ব্যবসায় দেখে তাহারা আমাদের ঠাকুরকে কি বুঝিবে? প্রভুর কাছে প্রার্থনা যে শত শত বেশ্যা আসুক তার পায়ে মাথা নোয়াতে এবং একজনও ভদ্রলোক না আসে নাই আসুক।”
