নরেন্দ্রনাথ যখন রামকৃষ্ণের কাছে যাতায়াত করতেন তখনো তিনি নিয়মিত ব্রাহ্মসমাজে যেতেন। কেশবচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের কাছে ধর্ম উপদেশ শুনতেন। কিন্তু তার অন্তরের পিপাসাকে তৃপ্ত করত না। তাছাড়া নরেন্দ্রনাথের অনন্ত যে তেজদীপ্ত পৌরষ ছিল, ব্রাহ্ম ধর্মের আত্মনিন্দা, নিজেকে কীটাণুতুল্য হেয় জ্ঞান করার প্রবৃত্তির সাথে তা মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এমনকি একদিন ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁকে যখন স্পর্শ করলেন, তিনি মুহূর্তে নিজের চেতনা হারালেন। মনে হল তার সমস্ত সত্তা এক অনন্তের মধ্যে বিলিন হয়ে গেল। তিনি যেন হারিয়ে যাচ্ছেন এক অসীম মহাশূন্যে। আতঙ্কে আর বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন, “তুমি আমার এ কি করলে, আমার যে যে বাবা-মা আছেন।”
রামকৃষ্ণ পুনরায় তাঁকে স্পর্শ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন। এই ঘটনাটিকে বিবেকানন্দের মনে হয়েছিল এক ধরনের সম্মোহন। ঠাকুরের প্রতি নরেন্দ্রনাথের ভালবাসা শ্রদ্ধা থাকলেও এই ঘটনার পর থেকে সব সময় সতর্ক থাকতেন যাতে ঠাকুর তাঁকে সম্মোহিত না করতে পারেন।
রামকৃষ্ণের কাছে তিনি যখন যাতায়াত করতেন সেই সময় বি-এ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ধনীর সন্তান হয়েও কঠোর সংযমী জীবন যাপন করতেন। প্রতিদিন ধ্যান জপ করতেন, ধর্মগ্রন্থ পড়তেন। যথাসময়ে পরীক্ষা শেষ হল। সাংসারিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন করতেন। হঠাৎ তিনি মারা গেলেন। সংসারে আয়ের মত ব্যয়ও ছিল বিরাট কোন সঞ্চয় করে যেতে পারেননি। ফলে সংসারে নেমে এল বিরাট বিপর্যয়। সদ্যবিধবা জননী, ছোট ছোট ভাইবোনের দুঃখভরা মুখের দিকে তাকিয়ে বেদনায় নরেন্দ্রনাথের অন্তর ভরে উঠত। একদিন যারা বিশ্বনাথ দত্তের অনুগ্রহে পুষ্ট হয়েছিল আজ তারাই সকলে মুখ ফিরিয়ে নিল। মানুষের কৃতঘ্নতার এই কদর্য রূপ দেখে সংসারের অভাব দূর করার জন্য চাকরির সন্ধান শুরু হল। সারাদিন পথে পথে ঘুরে রাত্রিবেলায় বাড়ি ফিরতেন। তার অন্তরের বেদনা সেদিন একমাত্র উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন রামকৃষ্ণ। তাঁর আশীর্বাদ আর নরেন্দ্রনাথের আন্তিরিক প্রচেষ্টায় সংসারের অভাব সাময়িক দূর হল। সাথে কিছু কিছু অনুবাদের কাজ করে অর্থ উপার্জন করতেন। কিছুদিন পর তিনি বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন স্কুলে চাকরি পেলেন।
কিন্তু যার অন্তরে আধ্যাত্মিকতার দীপ প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছে, সংসার, চাকরি, অর্থ তাঁর বাঁধবে কেমন করে? ক্রমশই নিজের মধ্যে অনুভব করছিলেন ঠাকুরের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ।
১৮৮৫ সালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ গলার ক্যানসারে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হল কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। রাখাল, বাবুরাম, শরৎ, শশী, লাটু আরো সব ভক্তরা দিবরাত্র তার আরাধ্য কর্মকে সম্পূর্ণ করবার জন্যই নরেন্দ্রনাথের আবির্ভাব। নরেন্দ্রনাথও অনুভব করছিলেন তীব্র ব্যাকুলতা, চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি কাশীপুর উদ্যানবাটীতে এসে অন্য ভক্তদের সাথে ঠাকুরের শ্রীচরণে আশ্রয় নিলেন। অন্য ভক্তরা প্রথম দিকে মাঝে মাঝে গৃহে যেতেন, ধীরে ধীরে তাও বন্ধ হয়ে গেল। উদ্যানবাটী হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ ভক্ত-শিষ্যদের আশ্রম। গুরুসেবার সাথে ভক্তরা সাধন ভজন ধ্যান, শাস্ত্রপাঠ আলোচনা করতেন।
প্রকৃতপক্ষে উত্তরকালে যে রামকৃষ্ণ সজ্ঞা গড়ে উঠেছিল এখানেই তাঁর সূচনা হয়।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছিলেন গৃহী। কিন্তু তিনি জানতেন গৃহীদের পক্ষে তার উপদেশ বাণীকে জগতের মানুষের কাছে প্রচার করা সম্ভব নয়। যারা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, সংসারের সকল বন্ধনকে ছিন্ন করতে পেরেছে একমাত্র তারাই পারবে সব দুস্তর বাধাকে অতিক্রম করে আরাধ্য কর্মকে সম্পাদন করতে। তিনি তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আঠারো জনকে সন্ন্যাস প্রদান করলেন। নিজের হাতে তাদের গৈরিক বস্ত্র তুলে দিয়ে বললেন, “তোরা সম্পূর্ণ নিরভিমান হয়ে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে রাজপথে ভিক্ষা করতে পারবি কি?”
গুরুর আদেশে নরেন্দ্রনাথ ও অন্য সব শিষ্যরা পথে বেরিয়ে পড়লেন। সংসার জীবনের শেষ বন্ধনটুকুও ছিন্ন হয়ে গেল। সন্ন্যাস গ্রহণের পর বিবেকানন্দের সমস্ত অন্তর মানুষের দুঃখ-বেদনা দূর করার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। ১৮৮৬ সালের এপ্রির মাসে স্বামী বিবেকানন্দকে সাথে নিয়ে গয়া অভিমুখে যাত্রা করলেন। সেখান থেকে গেলেন বুদ্ধগয়ায়। এখানে এসেই তার মধ্যে জেগে উঠল বুদ্ধের মহামুক্তির তীব্র আকাক্ষা। বুদ্ধের মত মুষকে সকল যন্ত্রণা দুঃখ থেকে মুক্তির পথ দেখার জন্যেই তাঁর আবির্ভাব। এখানে বোধিসত্ত্বের মন্দিরে ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন স্বামীজী। তিন দিন পর তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হল। তারপর আবার ফিরে এরেন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে।
তখন ঠাকুর গুরুতর অসুস্থ। একদিন তিনি বিবেকানন্দকে জিজ্ঞাসা করলেন, “নরেন, তুই কি চাস?” নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, “শুকদেবের মত সর্বদা নির্বিকল্প সমাধিযোগে সচ্চিদানন্দ সাগরে ডুবিয়া থাকিতে চাই।”
ঠাকুর নরেন্দ্রনাথের এই কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “ঐ কথা বলতে তোর লজ্জা করে? কোথায় তুই বটগাছের মত বেড়ে উঠে শত শত লোককে শান্তির ছায়া দিবি তা না তুই নিজের মুক্তির জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিস, এত ক্ষুদ্র আদর্শ তোর!”
