বিশ্বনাথ দত্তের কন্যাসন্দান থাকলেও কোন পুত্র ছিল না। স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী শিবের কাছে নিত্য প্রার্থনা করতেন। অবশেষে ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারী জন্ম হল তাঁর প্রথম পুত্রের। ডাক নাম বিলো, ভাল নাম শ্রীনরেন্দ্রনাথ দত্ত। যদিও তিনি বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত স্বামী বিবেকানন্দ নামে।
ছেলেবেলায় নরেন্দ্রনাথ ছিলেন যেমন চঞ্চল তেমনি সাহসী। সকল বিষয়ে ছিল তাঁর অদম্য কৌতূহল। বাড়িতে গুরুমহাশয়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হলেন মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে। তিনি সর্ব বিষয়ে ছিলেন ক্লাসের সেরা ছাত্র। কৈশোরেই তার মধ্যে দয়া-মায়া, মমতা, পরোপকার, সাহসিকতা, ন্যায়বিচার প্রভৃতি নানা গুণের প্রকাশ ঘটেছিল।
নরেন্দ্রনাথ ছিলেন সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। ছেলেবেলা থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন, কুস্তি বক্সিং দুটিতেই ছিল তাঁর সমান দখল নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। কর্মক্ষেত্রে সবল নিরোগ দেহের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই তিনি চির রুগ্ন বাঙালীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, গীতা পাঠ করার চেয়ে ফুটবল খেলা বেশি উপকারী।
১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নরেন্দ্রনাথ জেনারেল এসেম্বলী ইনস্টিটিউশনে এফ, এ পড়ার জন্য ভর্তি হলেন, এখানকার অধ্যক্ষ ছিলেন উইলিম হেস্টি। তিনি ছিলেন কবি দার্শনিক উদার হৃদয়ের মানুষ। তাঁর সান্নিধ্যে এসে দেশ বিদেশের দর্শনশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। নরেন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন ডঃ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। পরবর্তীকালে যিনি এই দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দর্শনশাস্ত্রে এতখানি বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, অধ্যক্ষ উইলিয়ম হেস্টি তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, “দর্শনশাস্ত্রে নরেন্দ্রনাথের অসাধারণ দখল, আমার মনে হয় জার্মানী ও ইংলণ্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই তার মত মেধাবী ছাত্র নেই।”
পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের অনুশীলনে নরেন্দ্রনাথের চিন্তার জগতে এক ঝড় সৃষ্টি করল। একদিকে প্রচলিত বিশ্বাস ধ্যান ধারণা সংস্কার, অন্যদিকে নবচেতনা–এই দুয়ের দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত নরেন্দ্রনাথ প্রকৃত সত্যকে জানার আশায় ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিলেন।
ব্রাহ্মধর্মের মতবাদ, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, নারীদের প্রতি মর্যাদা তাকে আকৃষ্ট করলেও ব্রাহ্মদের অতিরিক্ত ভাবাবেগ, কেশবচন্দ্রকে প্রেরিত পুরুষ হিসেবে পূজা করা তাঁর ভাল লাগেনি। কিন্তু এই সময় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপদেশে তিনি নিয়মিত ধ্যান করতে আরম্ভ করলেন। আচার-ব্যবহারে, আহারে,
পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি প্রায় ব্রহ্মচারীদের মতই জীবন যাপন করতেন।
যতই দিন যায় সত্যকে জানার জন্যে ব্যাকুলতা ততই বাড়তে থাকে। পরিচিত অপরিচিত জ্ঞানী মূর্খ সাধুসন্ত যাদেরই সাথে সাক্ষাৎ হয়, তিনি জিজ্ঞাসা করেন ঈশ্বর আছেন, কি নেই? যদি ঈশ্বর থাকেন তবে তার স্বরূপ কি?-কারোর কাছেই এই প্রশ্নের উত্তর পান না। ক্রমশই মনের জিজ্ঞাসা বেড়ে চলে। বার বার মনে এমন কি কেউ নেই যিনি এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারেন!
১৮৮০ সালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সিমলাপল্লীতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানেই প্রথম রামকৃষ্ণের সাথে পরিচয় হল নরেন্দ্রনাথের। নরেন্দ্রনাথের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ঠাকুর তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
প্রথম পরিচয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের মনে কোন রেখাপাত করতে পারেননি। পরীক্ষার ব্যস্ততার জন্য অল্পদিনেই নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের কথা ভুলে যান। এফ এ পরীক্ষার পর বিশ্বনাথ দত্ত পুত্রের বিবাহের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু বিবাহ করে সংসার জীবনে আবদ্ধ হবার কোন ইচ্ছাই ছিল না নরেন্দ্রনাথের। তিনি সরাসরি বিবাহের বিরুদ্ধে নিজের অভিমত প্রকাশ করলেন।
রামকৃষ্ণদেবের গৃহী ভক্তগণের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত। তিনি নরেন্দ্রনাথের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। একদিন নরেন্দ্রনাথ তাঁর সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে নিজের মনের সব কথা বলতেই রামচন্দ্র বললেন, যদি প্রকৃত সত্যকে জানতে চাও তবে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে যাও, তিনি তোমাকে প্রকৃত পথের সন্ধান দিতে পারবেন।
রামচন্দ্রের উপদেশে নরেন্দ্রনাথ একদিন কয়েকজন বন্ধুর সাথে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে গেলেন। তাঁকে দেখামাত্রই আনন্দে বিভোর হয়ে উঠলেন রামকৃষ্ণ। সম্ভবত তিনি নরেন্দ্রনাথের মধ্যেকার সুপ্ত প্রতিভার, তার আধ্যাত্মিক শক্তিকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই প্রথম পরিচয়ে রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, “তুই এতদিন কেমন করে আমায় ভুলে ছিলি। আমি যে কতদিন ধরে তোর পথপানে চেয়ে আছি। বিষয়ী লোকের সঙ্গে কথা কয়ে আমার মুখ পুড়ে গেছে। আজ থেকে তোর মত যথার্থ ত্যাগীর সঙ্গে কথা করে শান্তি পাব।”
নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের সরলতায় মুগ্ধ হলেও তাঁকে আদর্শ পুরুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি। তাছাড়া তাঁর যুক্তিবাদী মন বিনা পরীক্ষায় কোন কিছু মেনে নিতে চায়নি। ঠাকুরের প্রতি আকর্ষণে বারবার দক্ষিণেশ্বরে ছুটে গেলেও তাকে দীর্ঘদিন গুরু বলে গ্রহণ করেননি। আসলে তিনি কোন ভাবাবেগের দ্বারা পরিচালিত হননি। যখন তিনি পরিপূর্ণভাবে রামকৃষ্ণের মধ্যেকার আধ্যাত্ম চেতনাকে উপলব্ধি করেছেন তখনই তিনি তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করেছেন।
