উত্তর ভারত ভ্রমণ পর্ব শেষ করে শ্রীচৈতন্য ফিরে আসেন নীলাচলে। তাঁকে ফিরে পেয়ে ভক্ত শিষ্যদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।
শ্রীচৈতন্য নিজে কোন ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেননি। নিজে কোন ধর্মগ্রন্থও রচনা করেননি। সচরাচর উপদেশও দিতেন না তবুও হাজার হাজার মানুষ এক অদৃশ্য আকর্ষণে বার বার তাঁর কাছে ছুটে এসেছে। কারণ তার মত এমন করে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে কেউ প্রেমের মন্ত্র প্রচার করেনি। তিনি সে যুগের অধিকাংশ সাধু-সন্তের মত মানবতা-বিমুখী সন্ন্যাসী ছিলেন না। তার মধ্যে ছিল মানবীয় চেতনা, তাই তিনিই প্রথম দক্ষিণ ভারতের ঘৃণা দেবদাসী প্রথা বিলোপ করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। নারীদের প্রতি তার ছিল অপরিমেয় শ্রদ্ধা। তিনি পারস্পরিক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত ভারতবর্ষের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন শান্তি আর ঐক্য। প্রধানত তারই চেষ্টায় হোসেন শাহ ও রাজা প্রতাপরুদ্র পারস্পরিক যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হয়েছিলেন।
তিনি মানুষকে মর্যাদা দিয়েছেন মানুষ হিসেবে। তার মধ্যেই বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছিল একসাহসী ব্যক্তিত্বপূর্ণ পুরুষকে যিনি অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সৃষ্টি করেছিলেন গণ প্রতিরোধ। কিন্তু তিনি যে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবে সেই মহৎ সম্ভাবনা পূর্ণ হয়নি।
১৫২২ খৃস্টাব্দে, শ্রীচৈতন্যের তখন ৩৬ বছর বয়স প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকেই তার মধ্যে শুরু হয় দিব্যোন্মাদ অবস্থা। বাহ্য জগতের সাথে সম্পর্ক ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসে। অধিকাংশ সময়ই কৃষ্ণনামে বিভোর হয়ে থাকতেন।
১৫৩৩ খৃস্টাব্দের ২৯ শে জুন,আশাঢ় মাস। শ্রীচৈতন্য তখন অধিকাংশ সময়ই ভাবে বিহ্বল হয়ে থাকতেন। এক এক সময় বাহ্য জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মত পথে বার হয়ে পড়তেন। শিষ্যরা প্রতিনিয়ত তাকে পাহারা দিত।
প্রতিদিন প্রভু একবার করে জগন্নাথের মন্দিরে যেতেন। সেদিনও মন্দিরে গিয়েছেন। তিনি সাধারণত নাটমন্দিরের গরুর স্তম্ভের নীচে গিয়ে দাঁড়াতেন, সেখান থেকে দর্শন করতেন প্রভু জগন্নাথকে। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেন। সাথে সাথে মন্দিরের দরজা বন্ধ হইল। সেই সময় মন্দিরের মধ্যে কি ঘটেছিল তা জানা যায় না। কিন্তু যখন মন্দিরের দরজা খোলা হল তখন ভেতরে প্রভু নেই। চারদিকে প্রচার করা হয় তিনি জগন্নাতের সাথে লীন হয়ে গেছে। ভক্তজনের কাছে একথা বিশ্বাসযোগ্য হলেও প্রকৃত সত্য কি তাই?
বহু ঐতিহাসিকের অনুমান নীলাচলে শ্রীচৈতন্যের প্রভাব জনপ্রিয়তা দেখে জগন্নাথ মন্দিরের পূজারীরা চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন। বহু মানুষ জগন্নাথদেবকে না দেখে শুধুমাত্র শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করতেন। এতে ক্ষুব্ধ পূজারীরা তাকে মন্দিরের মধ্যে হত্যা করে কোন গোপন পথে দেহ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায়।
তাই বোধ হয় সাহিত্যিক কালকূট লেখেন–কোথায় গেলেন শ্রীচৈতন্য? কাদের হাতে তোমার রক্ত লেগে রইল? আমরা কি সেই সব রক্তক্ত হাতে পূজার ডালি সাজিয়ে দিই?
২৪. স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২)
ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিবেকানন্দ এক যুগপুরুষ! ভারত আত্মার মূর্ত রূপ। তারই মধ্যে একই সাথে মিশেছে ঈশ্বর প্রেম, মানব প্রেম আর স্বদেশ প্রেম। তাঁর জীবন ছিল মুক্তির সাধনা–সে মুক্তি জাতির সর্বাঙ্গীন মুক্তির। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রেই মানুষ যেন নিজেকে সকল বন্ধনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে। সন্ন্যাসী হয়েও ঈশ্বর নয়, মানুষই ছিল তাঁর আরাধ্য দেবতা। তাই মানুষের কল্যাণ, তাদের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলই ছিল তাঁর সাধনা। তিনি বলতেন, “যে সন্ন্যাসীর মনে অপরের কল্যাণ করার ইচ্ছা নেই সে সন্ন্যাসীই নয়। বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় সন্ন্যাসীর জন্ম। পরের জন্য প্রাণ দিতে, জীবের গগনভেদী ক্রন্দন নিবারণ করতে, সকলের ঐহিক ও পরমার্থিক মঙ্গল করতে এবং জ্ঞানালোক দিয়ে সকলের মধ্যে ব্রহ্মসিংহকে জাগরিত করতে সন্ন্যাসীর জন্ম হয়েছে।”
স্বামী বিবেকানন্দের জীবন সর্ব মানবের কাছেই এক আদর্শ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনিই প্রথম উচ্চারণ করলেন, ঈশ্বর নয় মানুষ। মানুষের মধ্যেই ঘটবে ঈশ্বরের পূর্ণ বিকাশ। তিনি যুগ যুগান্তরের প্রথা ধর্ম সংস্কার ভেঙে ফেলে বলে উঠলেন আমরা অমৃতের সন্তান।
শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরলেন সেই অমৃতময় বাণী। পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, I have a message to the west. তাঁর সেই Message-প্রাসঙ্গিকতা আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে বর্তমান বিশ্ব।
বিবেকানন্দের আবির্ভাবকাল এমন একটা সময়ে যখন বাংলার বুকে শিক্ষা সাহিত্য ধর্ম সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই শুরু হয়েছে নবজাগরণের যুগ। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ধনী শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বিবেকানন্দের পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন উত্তর কলকাতার নামকরা আইনজীবী। তাঁর মধ্যে গোঁড়া হিন্দুয়ানী ছির না। বহু মুসলমান পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উদার বন্ধুবৎসল দয়ালু প্রকৃতির লোক ছিলেন তিনি।
