কিছুদিন পর শ্রীচৈতন্য স্থির করলেন দক্ষিণ ভারতে যাবেন। সেখানকার সব তীর্থ : দর্শন করবেন। কোন সঙ্গী নেই সাথী নেই, একাই রওনা হলেন।
বিদ্যানগরের শাসক ছিলেন রামানন্দ রায়। উত্তল রাজ্যের প্রতিনিধি পরম ধার্মিক বৈষ্ণব। শ্রীচৈতন্যকে দেখামাত্রই ভাবে আবিষ্ট হয়ে গেলেন রামানন্দ রায়। মনে হল শ্রীচৈতন্যই তার ধ্যানের দেবতা। রামানন্দ রায়ের অনুরোধে সেখানে কয়েক দিনের জন্য রয়ে গেলেন শ্রীচৈতন্য।
দশ দিন পর আবার শ্রীচৈতন্য যাত্রী করলেন দক্ষিণের পথে। একের পর এক তীর্থ দর্শন করতে থাকেন। গেলেন শ্রীরঙ্গক্ষেত্রে, রামেশ্বর, ত্রিবাঙ্কর, আরো বহু স্থান। যেখানেই যান সেখানেই কৃষ্ণনামের জোয়ার বয়ে যায়। শ্রীচৈতন্যের এই দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ ঐতিহাসিক দিক থেকেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে প্রেমধর্মের প্রচার করেছিলেন তা দীর্ঘদিন স্থায়ী ছিল।
প্রায় দু বছর দাক্ষিণাত্য ভ্রমণ করে আবার নীলাচলে ফিরে এলেন শ্রীচৈতন্য। তার বিরহে ভক্ত শিষ্যরা সকলেই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। শ্রীচৈতন্যকে ফিরে পেয়ে সমস্ত নীলাচল যেন উৎসব নগরী হয়ে উঠে।
যে সব ভক্ত শিষ্যরা যারা নবদ্বীপ ছেড়ে প্রভুর সাথে নীলাচলে এসেছিল, দীর্ঘ দিন পরবাসে থেকে সকলেরই মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। শ্রীচৈতন্য ও উপলব্ধি করেছিলেন। তাছাড়া তার অবর্তমানে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারের জন্য উপযুক্ত মানুষের প্রয়োজন। সে কাজের ভার তুলে দিলেন নিত্যানন্দের উপর। শুধু তাই নয়, তিনি বললেন সংসারী হয়ে তুমি গৃহী মানুষের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার কর।
নিত্যানন্দ ছিলেন ব্রাহ্মচারী ও অবধূত। শ্রীচৈতন্যের চেয়ে প্রায় আট বছরের বড়। তবুও শ্রীচৈতন্য গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে অনুভব করেছিলেন সংসারের প্রতি নিত্যানন্দের আকর্ষণ রয়েছে। তাই তাকে সংসার জীবন গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছিলেন। বাংলায় ফিরে এসে নিত্যানন্দ জাহ্নরী দেবী নামে এক মহিলাকে বিবাহ করেন। জাহ্নরী দেবী ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ ধার্মিক। তিনি খেতুড়ি মহোৎসবের সময়ে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন এবং বহু ভক্ত তার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
গৌড় ত্যাগ করবার পর চার বছর অতিক্রান্ত হয় প্রতি বছর নবদ্বীপ শান্তিপুর থেকে ভক্তরা আসত তাকে দর্শন করবার জন্য।
১৫১৪ সালে বিজয়া দশমীর দিন নীলাচল ত্যাগ করে যাত্রা করলেন নবদ্বীপের পথে। প্রথমে এলেন কটকে। স্থানীয় মুসলমান শাসকরাও তার প্রেমগানে এতখানি মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নদী পার করে গৌড়ে পৌঁছবার সকল ব্যবস্থা করে দিলেন।
শ্রীচৈতন্য এলেন কুমারহট্ট গ্রামে শ্রীবাসের গৃহে। তারপর শান্তিপুর হয়ে এলেন নবদ্বীপে। তার শৈশব কৈশোর যৌবনের কিছু অংশের লীলাভূমি এই নবদ্বীপে। নবদ্বীপ্রবাসীরাও শ্রীচৈতন্যের নামগানে বিভোর।
শচীমাতা এলেন পুত্র দর্শনে। কিন্তু বিষ্ণুপ্রিয়া কুলবধূ, তাছাড়া সন্ন্যাস গ্রহণের পর তো সন্ন্যাসীর স্ত্রীমুখ দর্শন নিষিদ্ধ। তবুও তার সমস্ত অন্তর স্বামী দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সব দ্বিধা-সংকোট দূর করে বিষ্ণুপ্রিয়া এলেন। শ্রীচৈতন্যের কাছে এসে প্রণাম করতেই প্রভু বললেন, তুমি কৃষ্ণুপ্রিয়া হও।
কিন্তু বিষ্ণুপ্রিয়ার জগৎ যে চৈতন্যময়। চৈতন্য ছাড়া যে তার আরাধ্য কেউ নেই। শ্রীচৈতন্য নিজের পাদুকা দিয়ে বললেন, এই পাদুকা গ্রহণ কর। এর মধ্যেই তুমি আমাকে খুঁজে পাবে।
কয়েক দিন নবদ্বীপে থেকে নগরবাসীর সাথে কীর্তন কৃষ্ণনামে মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন শ্রীচৈতন্য। বৰ্ণহিন্দুর অত্যাচার যখন হাজার হাজার মানুষ মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করছিল, শ্রীচৈতন্যই তাদের মধ্যে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সেদিন যদি শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব না হত, বাংলার হিন্দু সমাজ সংস্কৃতি ধর্ম ভাষা সাহিত্য যা কিছু গৌরব সব কিছু চিরদিনের মত বিনষ্ট হয়ে যেত।
কয়েক দিন নবদ্বীপে থাকার পর তিনি যাত্রা করলেন, কৃষ্ণের লীলাভূমি বৃন্দাবনের পথে।
বৃন্দাবন থেকে শ্রীচৈতন্য যাত্রা করলেন প্রয়াগের পথে। সাথে দুজন ভক্ত। হঠাৎ পথপ্রান্তে এক রাখালের বাঁশির সুর শুনে জ্ঞান হারালেন শ্রীচৈতন্য। স্থির নিস্পন্দ দেহ। মনে হয় যেন প্রাণের সাড়া নেই। একদল পাঠান সেনা সেই পথ দিয়ে কোথাও চলেছিল। পাঠান সেনাপতি ছিলেন ধার্মিক লোক। অচেতন শ্রীচৈতন্যকে দেখে মনে হল নিশ্চয়ই তার দুই সঙ্গী তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। সেনাপতি দুই ভক্তকে বন্দী করবার হুকুম দিলেন। তারা যতই বলে প্রভু বেঁচে আছেন, কেউ তাদের কথায় কান দেয় না। তাদের হাত-পা বাধা হতেই জ্ঞান ফিরে পেলেন শ্রীচৈতন্য। তার কথায় দুই ভক্তকে মুক্ত করে দেওয়া হল। শুধু তাই নয়, পাঠান সেনাপতি চৈতন্যের প্রেমভাব তার দিব্যকান্তি দেখে এতখানি আবিষ্ট হলেন, তিনি শ্রীচৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। তার নতুন নাম হল রামদাস।
বাংলার নবার হুসেন শাহর দুই প্রধান কর্মচারী ছিলেন সাকর মল্লিক আর দবীর খাস-দুজনেই ছিলেন পণ্ডিত, বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী। শ্রীচৈতন্যের আকর্ষণে প্রথমে সাকর মল্লিক সব কিছু ত্যাগ করে এসে পৌঁছলেন প্রয়াগে। কৃষ্ণনামে তিনিও বিভোর। শ্রীচৈতন্য তাকে দীক্ষা দিয়ে নতুন নাম দিলেন শ্রীরূপ। রূপ বৈষ্ণব ধর্মের একজন প্রধান স্তম্ভ হয়ে ওঠেন। শ্রীচৈতন্য তার উপর ভার দেন বৃন্দাবনে ধর্মপ্রচার করতে।
