শ্রীবাসের গৃহপ্রাঙ্গণে চলে নিত্যদিন নামগান আর কীর্তন। সেখানেই শুধুমাত্র গৃহপ্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, তাকে ছড়িয়ে দিতে হবে সর্ব মানুষের দ্বারে দ্বারে। তিনি নামগান করার ভার দিলেন তার দুই প্রধান ভক্ত নিত্যানন্দ আর যবন হরিদাসকে। একজন হিন্দু অন্যজন মুসলমান। সেই যুগে এ এক দুঃসাহসিক কাজ। সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে একজন মুসলমানকে দিয়ে বৈষ্ণবধর্মের প্রচার-মধ্যযুগে এ ছিল কল্পনীয়।
নগরের পথে পথে ঘুরে ঘুরে তারা কীর্তন করতনে। অনেকে ভাবরসে আপ্লুত হয়ে তাদের সঙ্গী হত। অনেকে বিদ্রূপ করত, উপহাস করত। বিশেষত ব্রাহ্মণ সমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে। নীচ ধর্মের মানুষেরা যদি এভাবে অপর সকলের সাথে সমমর্যাদা পায় তবে যে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি রসাতলে যাবে। জগাই আর মধ্যেই নামে দুই পাপাচারী ব্রাহ্মণ, যারা সকল পাপকর্মে সিদ্ধ, তারেদ প্ররোচিত করে। একদিন নগরের পথে নামগান করছেন নিমাই আর নিত্যানন্দ। মদ্যপ অবস্থায় দুই ভাই নামকীর্তন বন্ধ করার জন্য চিৎকার করে ওঠে। আত্মহারা নিমাইয়ের কোন কথাই কানে যায় না। রাগেতে মাধাই কলসীর ভাঙা টুকরো তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারে। নিত্যানন্দের মাথায় এসে আঘাত লাগে। অঝোরে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ে। সেই দৃশ্য দেখে ক্রদ্ধ হয়ে ওঠেন নিমাই। তার সেই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে বহু কষ্টে শান্ত করান নিত্যানন্দ। দুই ভাই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতাপে লজ্জায় শিষ্যত্ব গ্রহন করেন নিমাইয়ের। জয় হয় প্রেমধর্মের।
এই ঘটনা নবদ্বীপের মানুষের মনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। চারদিকে বেড়ে চলে সমবেত কীর্তন আর নামগান। তখন বাংলার সুলতান ছিলেন হোসেন শাহ। বৈষ্ণবদের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ভাল চোখে দেখলেন না। তাছাড়া কিছু গোড়া মুসলমানও এর বিরুদ্ধে নালিশ জানাল। চাঁদ কাজী প্রকাশ্য পথে সমবেত কীর্তন বন্ধ করার হুকুম দিলেন।
ভক্তমণ্ডলী ভীত হয়ে পড়ল। কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গ আদেশ দিলেন সন্ধ্যাবেলায় নগরের পথে কীর্তন হবে। শুদু বৈষ্ণবরা নয়, সাধারণ মানুষও দলে দলে যোগ দিল সেইনগর কীর্তনে। প্রকৃত পক্ষে সেদিন নিমাই যে জনজাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, ইতিহাসে তা বিরল। তাঁর এই শক্তির উৎস ছিল জনগণের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ। তিনি ধর্ম বর্ণ বৈষম্য মুছে ফেলে সকল মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন। তাই মানুষ তার ডাকে অমন করে সাড়া দিয়েছিল।
নিমাইয়ের ডাকে বার হতেই সস্নেহে নিমাই তার সাথে কথা বললেন। নিমাইয়ের মধুর সম্বোধন, তার আন্তরিকতা, অকৃত্রিম ভালবাসায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন কাজী। হরিনাম সংকীর্তনের উপর থেকে সব বাধানিষেধ তুলে নিলেন। প্রকৃতপক্ষে নিমাই তার প্রেমের শক্তিতে মুসলমান শাসকের কাছ থেকে অবাধ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন।
গয়াধাম থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নিমাইয়ের জনপ্রিয়তা শুধু বৃদ্ধি পায়নি, তার অনুগামী বৈষ্ণবদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন শুধু নবদ্বীপ নয়, তাঁর কর্মক্ষেত্রকে ছড়িয়ে দিতে হবে আরো বৃহৎ জগতের মাঝখানে।
তার এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন নিত্যানন্দ ও আরো কয়েকজন অন্তরঙ্গ পার্ষদের কাছে। জননী শচীদেবীর কাছেও প্রকাশ করলেন নিজের মনের ইচ্ছা। কিন্তু কোন্ মা তাঁর পুত্রকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেয়?
১৫১০ খ্রীস্টাব্দে ২৬ মাঘ গভীর রাত্রে গৃহত্যাগ করলেন নিমাই। সকলে গভীর ঘুমে অচেতন। নিমাই গঙ্গা পার হয়ে অপর পারে কাটোয়ায় গেলেন। সেখানে ছিলেন কেশব ভারতী। তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে সন্ন্যাস নিলেন। তার নতুন নাম হল শ্রীচৈতন্য।
শ্রীচৈতন্যের লক্ষ্য নীলাচল। তার অনুগামী ভক্তরা দলে দলে এসে হাজির হয় কাটোয়ায়। প্রভুর বিরহ তারা কেমন করে সহ্য করবে! সকলের অনুরোধে শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈতের গৃহে কয়েকদিনের জন্য রয়ে গেলেন। শচীদেবী এসে পুত্রের সাথে দেখা করলেন। সকলের কাছে বিদায় নিয়ে শ্রীচৈতন্য এবার যাত্রা করলেন উড়িষ্যায় পথে। নীলাচলে প্রভু জগন্নাথের দর্শন পাবার জন্যে তার সমস্ত মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।
উড়িষ্যা যাত্রা পথে তার সঙ্গী অল্প কয়েকজন ভক্তশিষ্য আর অনুগামী। জগন্নাথের মন্দিরে প্রবেশ করতেই ভাবে বিহল চৈতন্যদেব জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। প্রহরীরা বাধা দিতে ছুটে এল। সেই সময়ে সেখানে এসেছিলেন উকলরাজ প্রতাপরুদ্রের গুরু মহাপণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম। তিনি শ্রীচৈতন্যের অপরূপ দেহলাবণ্য প্রেমবিহল ভাব দেখে তাকে নিজের গৃহে নিয়ে গেলেন।
বাসুদেব সার্বভৌম শুধু যে উৎকলের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈদান্তিক। তার এই আত্মসমর্পণ শুধু যে উড়িষ্যায় আলোড়ন তুলল তাই নয়, সমস্ত দেশের পণ্ডিতরা বিস্মিত হল। মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ কোথা থেকে পেল এমন ঐশীশক্তি যার বলে বাসুদেব সার্বভৌমের মত মানুষ নিজের সব সত্তা বিসর্জন দিয়ে শ্রীচৈতন্যের পাদপদ্মে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। অল্প দিনের মধ্যেই নীলাচলের মানুষ প্রভুর প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেল।
