মথুরাবাবু আর রাসমণি দেখতে এলেন। রাণী শিয়রে বসলেন হাতে পাখা নিয়ে। মুখে চিন্তার রেখা। আহা, কি হবে বাছাধনের। ঘুমের ঘোরেই গদাধর বলেন, মা এলি! মাগো!
উথলে ওঠে রাসমণির মাতৃস্নেহ। অচেতন গদাধরের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলেন, এই যে বাবা আমি। গদাধর মুখ তুলে তাকান। দেখেন শিয়রে রানী রাসমণি! প্রকৃতিময়ী মাতৃমূর্তি!
একদিন পূজায় বসেছেন গদাধর। প্রতিমার পায়ে পুপুঞ্জলি দিতে গিয়ে ফুলবেলপাতা নিজের মাথায় দিয়ে বসলেন। হেসে উঠলেন হিহি করে। মূর্তির দিকে তাকিয়ে দেখলেন গদাধর। মূর্তি কোথায়? সশরীরে জগজ্জননী বসে আছেন। সামনে সাজানো ভোগ খাচ্ছেন বসে বসে।
একদিন দেরি হয়ে গেল পূজা করতে। ভোগের থালা থেকে এক মুঠো অন্ন তুলে ধরলেন গদাধর প্রতিমার সামনে। বললেন, নে নে, খা। খিদে পেয়েছে বুঝিখুব?
মন্দিরের একটু দূরেই যে পঞ্চবটী, সেখানে আমলকী গাছের তলায় আসন পাতলের গদাধর। নিরিবিলি, বসে মায়ের ধ্যান করবেন।
কিন্তু গরু ছাগলে বড় উৎপাত করে। গাছগাছালি খেয়ে ফেলে। তাই গদাধর বাগানের মালী হরিকে বললেন, জায়গাটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দে না একটু।
হরি বলল, অনেক বাঁশ দড়ি পেরেক লাগবে যে। পাব কোথায়? গদাধর বললেন, তা হলে থাক।
কিন্তু সেদিনই কিছুক্ষণ পরে বান এলো গঙ্গায়। মন্দিরের ঘাটে কোত্থেকে বানের জলে বাঁশ কাঠ দড়ি ভেসে এলো।
বেড়া দেওয়ার সমস্যা মিটে গেল। কিন্তু নালিশ এলো রানী ও মথুরামোহনের কাছে। ছোট পুরুতঠাকুর অনেক রকম পাগলামী করছে। পঞ্চবটীতেও জায়গা দখল করার মতলব আঁটছে।
রানীমা ও মধুরামোহন দু’জনেই এলেন তদন্ত করতে। গোমস্তারা বলল ছোট ভট্টাচার্যকে না তাড়ালে মন্দিরের সুনাম নষ্ট হয়ে যাবে। রানী সবার কথা শুনলেন, শুনলেন জলে ভেসে আসা কাঠ, বাঁশ দড়ির কথা। বললেন, বেশ আসি সব দেখছি।
সেদিন দক্ষিণেশ্বরেই রইলেন রানী। দুপুরের পূজার পর মন্দিরে এলেন। গদাধরকে বললেন, একটু মায়ের নাম শোনাও বাবা।
গদাধর গান ধরলেন। চোখ বুজে শুনতে লাগলেন রানী। হঠাৎ এক সময় রানীর গালে এক চর বসিয়ে দিলেন। ধমক দিয়ে বললেন, এখানেও বিত্ত বিষয় নিয়ে ভাবনা।
চারদিক থেকে হইহই করে উঠল রানীর দাসীরা, খাসাঞ্চী, গোমস্তারা। তুমি একি করলে পুরুত ঠাকুর? গদাধর বললেন, আমি কি করব? মা যা করান আমি তাই করি।
মথুরামোহন ছুটে এসে বললেন, না, আর সহ্য করা যায় না। রানীমা বললেন, আমারই দোষ, আমি মন্দিরে বসে হাইকোর্টের মামলার কথা ভাবছিলুম। ওর হাত দিয়ে মা শাসন করেছেন আমাকে।
সবাই অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল।
পরদিন চলে গেলেন রাণীমা ও মথুরামোহন। বলে গেলেন, যতদিন ছোট ভট্টাচার্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসেন ততদিন অন্য পুরোহিত পূজা করবেন। তার ওপর যেন কোন চাপ না দেওয়া হয়।
ছ’বছর পরে কামারপুকুরে ফিরে এলেন গদাধর। মা চন্দ্রমণির বয়স ষাটের ওপর। মাকে শিশুর মতো জড়িয়ে ধরল। কে বলবে গদাধর এখন চব্বিশ বছরের যুবক। তিনি যেন এখনো সেই চঞ্চল বালক।
সিয়রে হৃদয়ের বাড়িতে গেলেন গদাধর। সেদিন সেখানে গানের আসর বসেছিল। একটি স্ত্রীলোকের কোলে ছিল একটি ফুটফুটে মেয়ে। টুলটুল করে তাকিয়ে চারদিক দেখছিল। স্ত্রীলোকটি রহস্য করে জিজ্ঞেস করল মেয়েটিকে, বিয়ে করবি? মেয়েটি ঘাড় নাড়ল? কাকে বিয়ে করবি এত লোকের মধ্যে? মেয়েটি গদাধরকে দেখিয়ে বলল, ঐ যে!
মেয়েটি জয়রামবাটির রামচন্দ্র মুখুজ্যের মেয়ে সারদামণি। একদিন শুভলগে গদাধরের সঙ্গে ওরই বিয়ে হল। প্রায় দু’বছর কামারপুকুরে থাকার পর দক্ষিণেশ্বরে ফিরলেন। মা কালীর পূজার ভার আবার তারই ওপর পড়ল।
রানী রাসমণির অসুখ। হঠাৎ একদিন পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেলেন। শয্যাশায়ী হলে একেবারে।
মনে শান্তি নেই রাসমণির। দক্ষিণেশ্বরের পূজোর খরচ চালানোর জন্য দু’লাখ চব্বিশ হাজার টাকায় জমিদারি কিনেছেন। কিন্তু সেই সম্পত্তি এখনো দেবোত্তর করেননি। তাঁর চার মেয়ের মধ্যে দু’মেয়ে শুধু বেঁচে আছে। সেই দুই মেয়ে সই করে দিলেই সব গোল চুকে যায়। কিন্তু বড় মেয়ে পদ্মমণি কিছুতেই সই দিল না। রাণী ভাবনায় পড়লেন। হঠাৎ যেন দেখলেন, গদাধর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, নাই বা সই করল, মেয়ে কি মায়ের সঙ্গে মামলায় জিততে পারবে?
অভয় পেলেন রাসমনি। আঠারোশো একষট্টি সালের আঠারোই ফেব্রুয়ারি সেই সম্পত্তির দানপত্র রেজিষ্ট্রি হয়ে গেল।
পরের দিন রাসমণি বললেন, আমাকে কালীঘাটে নিয়ে চল। সেখানেই মায়ের কাছে শেষ নিঃশ্বাস ফেলব।
বিছানা সাজিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী রানীর দেহ আনা হল আদিগঙ্গার তীরে। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে রানীর পুণ্যাত্মা দেহ ছেড়ে চলে গেল। দক্ষিণেশ্বরে ঘরের বারান্দায় অস্থির ভাবে পায়চারি করেছিলেন গদাধর। হঠাৎ বলে উঠলেন, চলে গেল রে, চলে গেল রাসমণি। মায়ের অষ্টনায়িকার এক নায়িকা।
একদিন সকালবেলা বাগানে ফুল তুলছেন গদাধর। এমন সময় বকুলতলার ঘাটে একটি নৌকা এসে ভিড়ল। এক সুন্দরী স্ত্রীলোক নামলেন নৌকা থেকে। পরনে গেরুয়া শাড়ি, হাতে ত্রিশূল। বয়স হয়েছে ভৈরবীর। কিন্তু কী রূপের ছটা। গদাধরকে বললেন, এই যে বাবা, তুমি এখানে। জানি তুমি গঙ্গাতীরে আছ। তাই তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
