শুনে গদাধর অবাক। তুমি আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছ মা?
মা মহামায়াই পাঠিয়ে দিলেন।
পঞ্চবটীতে ভৈরবীর থাকবার ব্যবস্থা হল। তিনি সেখানে থাকেন। তার ঝোলায় আছে তন্ত্রশাস্ত্র, গীতা, ভাগবত। গদাধরকে পড়ে শোনান। নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান ভৈরবীর। কিন্তু নানা লোকের মনে নানা রকম সন্দেহ। সুন্দরীর ভৈরবী কি রম্ভা মেনকার মত গদাধরের মনের পরিবর্তন ঘটাতে এসেছেন?
কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল, ভৈরবী এসেছেন গদাধরের প্রকৃত রূপ উদঘাটনের জন্য। তিনি বললেন, গদাধর মানব দেহধারী শ্রীরামচন্দ্র। তান্ত্রিক মতে শক্তি-দীক্ষা তিনি দিলেন গদাধরকে।
একদিন মড়ার মাথার খুলিতে মাছ বেঁধে ভোগ সাজালেন। কালীকে নিবেদন করে গদাধরকে বললেন, প্রসাদ নাও। গদাধর নির্বিবাদে প্রসাদ গ্রহণ করলেন।
ভৈরবী বললেন, এবার বৈষ্ণবমতে সাধনা কর বাবা। চারটি বেদ, আঠারোটি পুরাণ, চৌষট্টি তন্ত্রে যে রাস মেলে না, তাই মেলে না, তাই মেলে বৈষ্ণব মতে সাধনায়।
গদাধর রাজী হলেন। কী অপূর্ব যোগাযোগ! সেই সময়ে এলেন বেদান্তপন্থী অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসী পরমহংদেবের দল। তাঁদের সঙ্গে করেন শাস্ত্র আলোচনা। অতি সহজভাবে গভীর তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করলেন। সাধুরা খুশী হলে আশীর্বাদ করে গদাধরকে বললেন, তুমি ধর্মের সারমর্ম বুঝেছ। তুমি পরমহংস।
কিছুদিন পর এলেন সন্ন্যাসী তোতাপুরী। পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় তার মঠ। চল্লিশ বছর সাধনা করেছেন। বেরিয়েছেন তীর্থ দর্শনে। তাঁকে দেখে গদাধর ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। যেন কতকালের পরিচিত। গদাধর বললেন, আমাকে দীক্ষা দিন।
তোতাপুরী বললেন, দিতে রাজী আছি, কিন্তু তোমাকে গৈরিক বস্ত্র পরতে হবে। গদাধর বললেন, গৈরিক পরতে পারব না। ছোটবেলাতেই মায়ের কাছে কথা দিয়েছি। সন্ন্যাসী না সেজেও আমি সন্ন্যাস নেব।
তোতাপুরী ভাবলেন, মনে যার রং ধরেছে, তার দেবহারণের রং বিচার করে লাভ নেই। তাই তিনি গদাধরকে দীক্ষা দিলেন। বললেন, আজ তোমার নতুন জন্মলাভ হল। তোমার নাম এখন হবে রামকৃষ্ণ আর পদবী হবে পরমহংস। পরমহংস কাকে বলে জান তো? দুধে জলে এক সঙ্গে থাকলেও যিনি হাসের মত জলটি ছেড়ে দুধটি নিতে পারেন, তিনিই পরমহংস।
তোতাপুরী বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। কদিন পরেই এলেন গোবিন্দ রায়। জাতে ক্ষত্রিয়। কিন্তু মুসলমান হয়েছেন। আরবী ফারসীতে পণ্ডিত। রামকৃষ্ণ তাকে বললেন, আমি মুসলমান ধর্মমতে সাধন ভজন করব। কত মানুষ কত পথে সাধনা করে বাঞ্ছিত ধামে গিয়ে পৌঁছায়। আমি এই পথটাকে বাদ দেব কেন?
গোবিন্দ রায় দীক্ষা দিলেন রামকৃষ্ণকে। কাছা খুলে ফেললেন। কাপড় পরলেন লুঙ্গির মত করে। পাঁচ বেলা নামাজ পড়তে লাগলেন। একদিন মুসলমানদের রান্নার মত রান্না করিয়ে খেলেন।
একদিন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় রামকৃষ্ণ দেখলেন গৌরবর্ণ সুপুরুষ যীশুখ্রীস্ট এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছেন। যীশুর ভজনা করতে করতে তিনি সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।
মা চন্দ্রমণিও ছেলে গদাধরকে দেখবার জন্য দক্ষিণেশ্বরে এলন। তিনি নহবতের ঘরে থাকেন। ছেলের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়। কিছুদিন পর স্ত্রী সারদামণিরও এসে হাজির হলেন। রামকৃষ্ণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি গো, তুমি কি আমাকে সংসার পথে টেনে নিতে এসেছ?
সারদা জবাব দিলেন, না। তোমার ইষ্টপথে সাহায্য করার জন্যই আমি এসেছি।
ঠাকুর রামকৃষ্ণের শিক্ষায় শ্রীমতী সারদা সুনিপুণা হতে লাগলেন। প্রকাশ পেতে লাগলেন জগতের মঙ্গলসাধিকা শক্তিরূপে।
চন্দ্রমণির বয়স অনেক হয়েছিল। শেষ বয়সে ছেলেকে দেখবার আকাঙ্খা হয়েছিল ভিষণ 1 সে আশা তাঁর পুরণ হল। একদিন দক্ষিণেশ্বরেই রোগশয্যায় পুত্রকে শিয়রে রেখে মা চোখ বুজলেন।
রামকৃষ্ণ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দক্ষিণেশ্বরও হয়ে উঠেছে তীর্থভূমি। সেখানে মাঝে মাঝেই এসে উপস্থিত হন কত সাধুপুরুষ, কত গুণী জ্ঞানী। বিখ্যাত মানুষ। তিনিও মাঝে মাঝে বিখ্যাত মানুষদের বাড়ি যান। একদিন গেলেন মহষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি। খ্রীষ্টধর্মের বন্যায় যখন দেশটা ডুবে যাবার উপক্রম হয়েছিল। তখন ব্রাহ্মণধর্মের জীবন তরণী ভাসিয়ে বহু মানুষকে উদ্ধার করেছেন। দেবেন্দ্রনাথকে রামকৃষ্ণ বললেন, তুমি তো পাকা খেলোয়াড় হে। একসঙ্গে দু’খানা তলোয়ার ঘোরাও, একটি কর্মের আর একটি জ্ঞানের।
ব্রাহ্মণধর্মের অন্যতম প্রবর্তক কেশবচন্দ্র সেনের বাড়িও গেলেন একদিন। সেখানে গিয়ে গান করতে করতে রামকৃষ্ণ সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন। আর একদিন গেলেন বিদ্যাসাগরের বাড়িতে। বললেন, এতদিন খাল বিল দেখেছি, এবার সাগর দেখলুম। বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, তবে নোনা জল খানিকটা নিয়ে যান। রামকৃষ্ণ বললেন, না গো! নোনা জল কেন? তুমি যে বিদ্যার সাগর, ক্ষীরসমুদ্র।
নরেন্দ্রনাথ নিজেই এসেছিলেন রামকৃষ্ণের কাছে। বিখ্যাত দত্ত বাড়ির ছেলে, শিক্ষিত তরুণ। রামকৃষ্ণের প্রভাবে তিনি হয়ে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ শুধু সাধকই নন, তিনি যে প্রেমাবতার। প্রেম বিলাতে বিলাতে তিনি মানুষের মনের কলুষকে দূর করতে লাগলেন, মানুষের মনের পাপ হরণ করতে গিয়ে নিজেই হলেন নীলকণ্ঠ।
গলায় তাঁর ক্ষতরোগ হল। ক্যান্সার। চিকিৎসার জন্য তাকে চিকিৎসকের নির্দেশে শিষ্যদের এবং সাধারণ মানুষের তাঁর কাছে যেতে মানা। কিন্তু প্রেমের ঠাকুর রামকৃষ্ণ সেই নিষেধ উপেক্ষা করে কল্পতরু উৎসবের অনুষ্ঠান করলেন। সর্বধর্মের সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশে হৃদয়ের প্রেম নিঃশেষে বিতরণ করতে লাগলেন।
