হৃদয় বলল, গদাই মামা।
–আমাকে দিতে পার এ মূর্তি?
–হ্যাঁ। নিয়ে যান। ছোটমামা এরকম মূর্তি অনেক গড়তে পারে।
মথুরামোহন সেই মূর্তি নিয়ে গেলেন জানবাজারের বাড়িতে। রাসমণিকে দেখিয়ে বললেন, দেখুন মা, পুরুত ঠাকুরের ছোটভাই গড়েছে।
রাসমণি বললেন, বাঃ বেশ তো। ওঁকে আমাদের মন্দিরের বিগ্রহের সাজনদার করলে বেশ হয়।
মথুরামোহন বললেন, আচ্ছা, আমি বলে দেখি পুরুত ঠাকুরকে।
পরদিন মথুরামোহন দক্ষিণেশ্বরে এসে রামকুমারকে ব্যাপারটা জানালেন। রামকুমার বললেন, গদাই যা খামখেয়ালী ছেলে। আমার কথা কি শুনবে? আপনি বললে যদি রাজী হয়।
মথুরামোহন তখন ডেকে পাঠালেন গদাধরকে। গদাধর ভয়ে ভয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন মথুরাবাবুর সামনে। মথুরাবাবু বললেন, তুমি ঘুরে ঘুরে বেড়াও কেন? তোমার মনের মতো একটা কাজ দিলে করবে?
–কি কাজ?
–মা ভবতারিণীকে তুমি নিজের মতো করে সাজাবে।
ভয়ে কুঁকড়ে উঠলেন গদাধর। বললেন, একা সাহস হয় না সেজবাবু। ঘরে সব দামী দামী জিনিস। সঙ্গে হৃদয় থাকে তো পারি।
–বেশ তো। সে তোমার সাগরেদ থাকবে। কাজ করবে দু’জনে মিলে। মনের মতো কাজ পেয়ে খুশীই হলেন গদাধর।
জন্মাষ্টমীর পরদিন নন্দোৎসব। রাধা-গোবিন্দের মন্দিরে বিশেষ পূজা ও ভোগ অনুষ্ঠান। সেই বিগ্রহের পূজারী ক্ষেত্ৰনাথ। দুপুরে পূজোর পর পাশের ঘরে শয়ন দিতে নিয়ে যাচ্ছেন রাধা-গোবিন্দকে। হঠাৎ পা পিছনে ক্ষত্ৰনাথ পড়ে গেলেন। হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল গোবিন্দের একটি পা।
মন্দিরে হইচই পড়ে গেল। হায়, একি অঘটন।
রানী রাসমণিকে খবর পাঠানো হল। তিনি মথুরামোহনকে বললেন, পণ্ডিতদের কাছ থেকে বিধি নাও, কি ভাবে ঐ বিগ্রহের পূজা করা হবে?
মথুরামোহন অনেক পণ্ডিতের সঙ্গেই পরামর্শ করলেন। তারা বললেন, ঐ বিগ্রহকে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হবে। তার জায়গায় বসাতে হবে নূতন মূর্তি।
কিন্তু রাণীর মন তাতে সায় দিল না। সে গোবিন্দকে এতদিন গৃহদেবতা রূপে পূজা করা হয়েছে, তাকে বিসর্জন দিতে হবে?
গদাধরের কানে সে কথা যেতেই তিনি বললেন, সে কি কথা। কোন জামাইয়ের যদি ঠ্যাং ভেঙ্গে যায়, তাতে কি ফেলে দিতে হবে, না চিকিৎসা করাতে হবে। গোবিন্দ গৃহদেবতা, নিতান্ত আপন। সেই আপনজনকে ফেলে দেব কেন? আমিই ঠাকুরের পা জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছি।
একথা শুনে রাসমণির মনের চিন্তা দূর হয়ে গেল। তিনি বললেন, ছোট ভট্টাচার্য যা বলেছেন তাই ঠিক।
গদাধর মাটি দিয়ে সুন্দরভাবে জুড়ে দিলেন গোবিন্দের পা। বোঝাই গেল না যে পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। সেই মূর্তিই সিংহাসনে বসানো হল।
ক্ষেত্ৰনাথ পুরোহিতের কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। গদাধরকে নিযুক্ত করা হল রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত। গদাধর কোন আপত্তি করলেন না। মতিগতি দিন দনি একটু ভাল হচ্ছে তার। নিজেই একদিন বললেন, আমাকে দীক্ষা দাও।
কেনারাম ভট্টাচার্য নামে এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকে এনে গদাধরকে দীক্ষা দেওয়া হল। তারপর থেকে পূজার দিকে খুব মন দিলেন গদাধর। রামকুমার ভাবলেন, গদাইয়ের হাতে ভবতারিণীর পূজার ভার দিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশ থেকে ঘুরে আসি। তাই গদাধরকে শক্তি পূজার ভার দিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশ থেকে ঘুরে আসি। তাই গদাধরকে শক্তি পূজার পদ্ধতি শেখাতে লাগলেন।
গদাধর এখন আগের চেয়ে অনেক সংযত ও ধীরস্থির। কিছুদিন পর ভবতারিণীর পূজার ভার গদাইয়ের আর রাধাগোবিন্দের পূজার ভার হৃদয়ের হাতে দিয়ে রামকুমার দেশের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। কিন্তু বিধির কি আশ্চর্য লীলা! রামকুমার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছতে পারলেন না। পথেই অসুস্থ হয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। সেখানেই মারা গেলেন।
সে খবর শুনে কি কান্নাই না কেঁদেছিলেন গদাধর।
তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে।
দেশ থেকে ঘুরে এসে ভবতারিণীর পূজায় মন দিয়েছেন গদাধর। কিন্তু পূজার ধরন ধারণ যেন পালটে গেছে অনেক। হৃদয় অবাক হয়ে গেল তার ছোটমামার হাবভাব দেখে। একদিন দেখল গদাধর মায়ের মূর্তির হাত টিপে দেখলেন তারপর ছুটে চলে গেলেন বাইরে। ভূত প্রেত সাপ নেউলের ভয় নেই। পঞ্চবটী বনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। পরনের কাপড় খুলে গেল, গলার পৈতে লুটোপুটি খেতে লাগল মাটিতে।
আর একদিন দেখল হৃদয়, গদাধর মা কালীর মূর্তির সামনে বসে কাঁদছেন। বলছেন, মা গো রামপ্রসাদকে তুই দেখা দিয়েছিস, আমাকে দেখা দিবি না কেন?
হৃদয় একদিন জিজ্ঞেস করল, মামা, এসব টং করো কেন?
গদাধর জবাব দিলেন, ওসব ঢং নয় রে। মাকে পেতে হলে পাশমুক্ত হতে হবে। অষ্ট পাশ। ক্ষুধা, লজ্জা, কুল, শীল, ভয়, মান, জাত, দম্ভ এসব ছাড়তে হয়।
পঞ্চবটিতে সারারাত পঞ্চমুণ্ডিত আসনে বসে ধ্যান করেন গদাধর। রাত্রি শেষে বেরিয়ে আসেন। পা টলছে মাতালেন মত। মন্দির খুলতে না খুলতেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, দেখা দিবি না? বেশ, চাই না দেখতে। রাক্ষসী তুই তাই তো রক্ত মেখে মুণ্ডুমালা গলায় রাকিস। আরো খাবি রক্ত?
মন্দিরের দেওয়ালে ঝুলছে বলির খাড়া। সেই খাড়াটি নিয়ে নিজের গলা কাটবার জন্য তুলে ধরলেন। মন্দিরের আঙিনায় তখন ভিড় জমে গেছে। কিন্তু কেউ হঠাৎ প্রতিমার পায়ের কাছে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন গদাধর। ধরাধরি করে অচেতন গদাধরকে নিয়ে যাওয়া হল তার ঘরে। পরের দিনও নয়। সময় সময় একটু জ্ঞান হয় আর কি যেন বিড় বিড় করে বলেন। আবার জ্ঞান হারিয়ে যায়।
