মেয়েরা ভক্তিতে গদগদ হয়ে প্রমাণ করে তাদের নবীন পূজারীকে। এরপর থেকে মিত্রবাড়ির নিয়মিত পূজারী হয়ে গেল গদাধর।
গদাধরের কিন্তু ওসবের দিকে কোন লাভ নেই। মাঝে মাঝে যজমানের বাড়ি থেকে পাওয়া সব কিছু পথের এক ভিখারীকে দিয়ে দেয়। এজন্য দাদার ভৎর্সনাও শুনতে হয় গদাধরকে। গদাধর বলে আমাদের তো অনেক আছে, ওদের যে কিছুই নেই। মনে মনে রামকুমার ভাবেন, গরীবের ঘরে জন্ম হলেও রাজার মন নিয়ে গদাধর জন্মেছে।
বড় হয়ে উঠছেন গদাধর। দেখতে তাঁকে ভক্তিমান ব্রাহ্মণ বলেই মনে হয়। কিন্তু কেমন যেন উদাস উদাস ভাব।
রামকুমার খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। গদাধরের ভবিষ্যৎ কি হবে?
এমন সময় এক সুযোগ এসে গেল তাদের সামনে।
কলকাতার জানবাজারের রানী রাসমণি মন্দির স্থাপন করলেন দক্ষিণেশ্বরে। সে অতি বিচিত্র কাহিনী। কাশীতে অন্নকূট উৎসব করার জন্য বিরাট বিরাট নৌকায় বহু খাদ্যসামগ্রী ও লোকজন নিয়ে জনপথে চলেছিলেন রানী রাসমণি। রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন। জগজ্জননী মূর্তিমতী হয়ে তাঁকে বললেন, ওরে তোর কাশী যাওয়ার দরকার নেই। গঙ্গার তীরে এখানেই মন্দির তৈরী করে আমাকে প্রতিষ্ঠা কর। আমাকে অন্নভোগ দে।
রাসমণির আর কাশী যাওয়া হল না। গঙ্গার তীরে দক্ষিণেশ্বরে মন্দির নির্মাণ করলেন। খরচ হল নয় লাখ টাকা। নবরত্ন বিশিষ্ট কালী মন্দির, উত্তর ভাগে রাধাগোবিন্দ মন্দির, পশ্চিমে গঙ্গার তীর জুড়ে দ্বাদশ শিবের মন্দির। মূর্তিও তৈরী হল। মূর্তি ছিল বাক্সের মধ্যে। দেখা গেল মূর্তি ঘামছে। রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন রাণীমা। ভবতারিণী কালী বলছেন, আমাকে আর কতদিন এভাবে কষ্ট দিবি? এবার আমায় মুক্তি দে।’
১২৬১ সালে বারোই জ্যৈষ্ঠ স্নানযাত্রার দিনে মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠা হল। কিন্তু মায়ের অন্নভোগ দেওয়ার কি হবে? মার যে অন্নভোগ দেবার অধিকার তোমার নেই। কারণ তুমি যে জেলের মেয়ে।
দেবীকে ভোগ দেবো, তাতেও জাতবিচার? রানীর হৃদয় ব্যথায় ভরে উঠল। রানীর জামাতা মথুরামমোহন সব কিছু দেখাশুনা করতেন। তিনি নানা দেশের পণ্ডিতদের কাছে। বিধান নিতে ছুটলেন। কিন্তু সব পণ্ডিতেরই এক কথা। অচ্ছুৎ রামকুমারের কাছে। রামকুমার বিধান দিলেন মন্দিরের যাবতীয় সম্পত্তি যদি রানী কোন ব্রাহ্মণকে দান করেন তবেই অন্নভোগ দেওয়া চলতে পারে।
রানী অকূলে যেন কূল পেলেন। তিনি ঠিক করলেন গুরুর নামে মন্দির দান করবেন। কিন্তু গুরুর বংশের কেউ পুরোহিত হয় এ তার কাম্য নয়। কারণ তাঁরা সকলেই অশাস্ত্রজ্ঞ এবং আচারসর্বস্ব। অন্য সৎ ব্রাহ্মণও পাওয়া গেল না। অন্য কেউ মন্দিরের পূজা করতে রাজী হলেন না।
মন্দির প্রতিষ্ঠা-উৎসবের দিন রামকুমার এলেন গদাধরকে সঙ্গে নিয়ে। বিরাট আয়োজন কালীবাড়িতে। যাত্রাগান, কালীকীর্তন, ভাগবত পাঠ। মহা ধূমধাম কাণ্ড। সকাল থেকে চলছে খাওয়া-দাওয়া আহূত কে অনাহূত, কার কি জাত তার খোঁজ-খবরও করে না কেউ।
গদাধর কিন্তু কিছুই খেলেন না। বাজার থেকে মুড়ি কিনে খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিলেন। রাত্রিবেলা রামকুমার গদাধরকে জিজ্ঞেস করলেন, এখনকার ভোগের প্রসাদ তুই নিলিনে কেন? ব্রাহ্মণের হাতে রাধা মাকে নিবেদন করা ভোগ আমি নিলাম, তুই নিলি না কেন?
গদাধর জবাব দিলেন, এমনি নেইনি।
রামকুমার অবাক হলেন। অথচ এই গদাধরই ছোটবেলায় ধনী কামারনীর কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়েছেন। শিয়র গ্রামের রাখালদের সঙ্গে বসে খেয়েছিল। খেয়েছিল ছুতোর বাড়ির বউয়ের হাতে খিচুড়ি রান্না। চিনিবাস শাখারীর হাতে মিষ্টি। আনুড়ে বিশালাক্ষী মায়ের থানে নানা জাতের মেয়েদের দেওয়া পূজার প্রসাদ খেয়েছিল। তখন তো জাতবিচার করেনি। আশ্চর্য!
কারণ জিজ্ঞেস করলে গদাধর জবাব দিলেন, ওরা দিয়েছিল অতি যত্নের বিদুরের খুদ। কিন্তু এ যে হেলায় ফেলায় দেওয়া দুর্যোধনের রাজভোগ।
জবাব শুনে অবাক হয়ে গেলেন রামকুমার। বাঃ, রামায়ণ মহাভারত পড়ে আর টোলের নানা বই ঘাটাঘাটি করে অনেক কিছু তো এ বয়সে গদাধর শিখে ফেলেছে।
রামকুমার বললেন, তা হলে কি করতে বলিস আমাকে? ঝামাপুকুরে ফিরে যাব? রাণীমা যে আমাকে এখানে পুরোহিত করতে চান। সে কাজ তা হলে নেব না?
গদাধর বললেন, কথা যখন দিয়েছ তখন ছাড়বে কেন? আর তোমার টোলও তো প্রায় উঠেই গেছে। তুমি এখানেই থাক।
–তুইকি করবি?
–আমিও থাকবো তোমার কাছে। এখানে খাবো না।
-–এখানকার কিছু না খেতে চাস আমি পয়সা দেবো, বাজার থেকে চাল ডাল কিনে রান্না করে খাস।
গদাধর তাতেই রাজী হলেন।
দিন কাটতে লাগল ভালভাবেই। একদিন ভাগনে হৃদয় সেখানে এসে হাজির হল। গদাধরের প্রায় সমবয়সী। হৃষ্টপুষ্ট চেহারা। বলল, বর্ধমানে গিয়েছিলেন চাকরির খোঁজে। হল না। শুনলাম, তোমরা দু’মামাই আছো দক্ষিণেশ্বরে! তাই চলে এলাম।
রামকুমার বললেন, বেশ, থাক্ এখানে। একটা কিছু হবেই। তুই থাকলে গদাধরেরও সুবিধা হবে।
মথুরবাবু মাঝে মাঝে এসে মন্দিরের কাজ দেখাশুনা করেন। গদাধর কিন্তু ঢুকিয়ে দেবেন মথুরবাবু। পরের দাসত্ব করতে তার ভাল লাগে না।
গদাধর মাটি দিয়ে শিব গড়ে পূজো করেন। নিজেই পূজা করে বাতাসা ভোগ দিয়ে হৃদয়কে প্রসাদ দেন। গদাইয়ের হাতে গড়া শিবমূর্তি একদিন মথুরবাবু দেখতে পেলেন। কি অপূর্ব মূর্তি। গদাধর তখন কাছে ছিলেন না। জিজ্ঞেস করলেন হৃদয়কে, এ মূর্তি কে গড়েছে?
