একদিন বিকেলবেলা সে রামায়ণ পাঠ করছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও শুনছে মনোযোগ। দিয়ে। কাছেই আমগাছের ওপর বসে ছিল একটা হনুমান। সে লাফ দিয়ে ঠিক গদধরের কাছে এসে পড়ল। তারপর পা জড়িয়ে ধরল গদাধরের। হইচই করে উঠল সবাই। কেউ বা ভয় পেয়ে উঠে চলে গেল। কিন্তু গদাধর একটুও নড়ল না। সে হনুমানের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। বুঝি শ্রীরামচন্দ্রের আশীর্বাদ পেয়েই খুশী হয়ে রামভক্ত হনুমান আবার লাভ দিয়ে গাছে উঠে গেল।
অদ্ভুত ছেলে গদাধর! সব সময়েই ভাবাবেশে মত্ত হয়ে থাকে। পথে পথে ঘুরে গান করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়। লোকজন ছুটে এসে মাথায় ও মুখে জল ছিটিয়ে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনে।
কামারপুকুর থেকে দু’মাইল দূরে আনুড় গ্রাম। সেখানে বিরাট এক গাছের তলায় আছে বিশালাক্ষীর থান। গাঁয়ের মেয়েরা দল বেঁধে চলেছে সেই বিশালাক্ষী দেবীর পূজা দিতে। হঠাৎ কোত্থেকে ছুটে এসে গদাধর সেখানে সেই দলে ঢুকে পড়ল। গাঁয়ের মেয়েরা ভাবল, যাক ভালই হয়েছে। গদাইয়েরও গান গেয়ে খুব আনন্দ। বাবার কাছ থেকে শেখা দেবতার ভজন কি সুন্দর গায়।
কিন্তু বিশালাক্ষী থানের কাছাকাছি যেতেই তার গান থেমে গেল। দু’চোখ বেয়ে পড়তে লাগল জলের ধারা। প্রসন্ন বলে মেয়েটি এগিয়ে এসে তাকে ধরতেই তার কোলে অবসন্ন হয়ে ঢলে পড়ল। গদাইয়ের জ্ঞান হতেই সে বলল, ওরে গদাইকে কিছু খেতে দে।
কিন্তু কি খেতে দেবে গদাইকে? কারুর সঙ্গে ভোগের সামগ্রী ছাড়া যে আর কিছু নেই। প্রসন্ন বলল, ভোগের জিনিসই আলাদা করে ওকে দে। ওকে খাওয়ালেই তোদের পুণ্যি হবে।
অনেকে পূজার জন্য আনা নৈবেদ্য থেকে কলা, দুধ ও বাতাসা গদাইয়ের মুখে তুলে দেয়।
বড় খামখেয়ালী ছেলে গদাধর। পড়াশুনা মোটেই করছে না। শুধু আড্ডা দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দল বেঁধে ছেলেদের সঙ্গে যাত্রা করে। কখনো সাজে কৃষ্ণ, কখনো শিব।
দেখতে দেখতে বড় হতে লাগল গদাধর। দাদা রামকুমার বলেন, গাঁয়ে ওর লেখাপড়া কিছু হবে না। আমি ওকে কলকাতায় নিয়ে যাব। লেখাপড়া শেখাব।
রামকুমার কলকাতায় ঝামাপুকুরে থাকেন। সেখানে একটা টোল খুলেছেন। সেখানেই ছোটভাইকে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু সে গা ছেড়ে যেতে চায় না।
১৮৩৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই কামারপুকর গ্রামে জনা হয়েছে গদাধরের। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছে এখানকার পথ-ঘাট, পুকুর, মা-বাবা ও গাঁয়ের লোকজনদের। এসব ছেড়ে যেতে কি ভাল লাগে।
পৈতে হয়েছে। দাই-মা ধনী কামারনীর আদর পেয়েছে। মা চন্দ্রমণির দিকে যেমন টান, ধনী কামারনীর দিকেও টান তার কম নয়। বাবাকেও ভালবাসে খুব। কিন্তু সাত বছর বয়সেই বাবাকে হারাতে হল হঠাৎ। ছিলিমপুরে থাকেন বাবার ভাগনে রামাদ। তার বাড়িতে দুর্গাপূজায় পুরোহিত হয়ে পূজা করতে গিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। সেখানেই ভাসানের দিন রাত্রিবেলায় মারা গেলেন। সেই খবর পেয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল গদাধর।
এবার গ্রাম ছাড়তেই হবে গদাধরকে। বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি হয়ে যাবার পরই রামকুমার তাকে কলকাতা যাবার জন্য তৈরী হতে বললেন। সে কথা শুনে গদাধরের মন খারাপ হয়ে গেল। ভাগনে হৃদয় তারই সমবয়সী। ক্ষুদিরামের শ্রাদ্ধের সময় এসেছে। তার সঙ্গে গাঁয়ের পথে পথে ঘুরে বেড়ায় গদাধর।
একদিন বেড়াতে বেড়াতে একটু দূরেই চলে গেল। গা ছাড়িয়ে মাঠ, জমি। বেশ লোকের ভিড়। কয়েকজন লোক জমি ভাগাভাগি করছে। মাপছে দড়ি ফেলে। তাতেও হল না। লেগে গেল তাদের মধ্যে ঝগড়া, তারপর হাতাহাতি। খুড়ো আর ভাইপোর মধ্যে বিবাদ। দুজনেই পণ্ডিত। অথচ কি মারামারি করল তারা। গদাধর ভাবল, ছিঃ, লেখাপড়া শিখেও মানুষ এমন হয়! এমন বিষয়-সম্পত্তিকে ধিক্।
গদাধরের মনটা খারাপ হয়ে গেল ভীষণ।
রামকুমার গদাধরকে নিয়ে কলকাতায় এলেন। মধ্য কলকাতায় ঝামাপুকুরে অনেক রকম পুঁথি আছে টোলে। সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখে গদাধর। রামকুমার বললেন, এসব পড়ে এখন লাভ নেই। ইস্কুলে তোকে ভর্তি করিয়ে দেব। সেখানেই পড়বি।
গদাধর ঠোঁট উলটিয়ে বলল, আমি পড়বই না স্কুলে।
রামকুমার জিজ্ঞেস করলেন, কেন?
গদাধর জবাব দিল, চালকলা বাঁধা বিদ্যা শিখতে চাই না।
–তবে কি চাস?
–আমি চাই এমন বিদ্যা শিখতে যাতে সত্যিকারের কোন লাভ হয়। মানুষের জীবন ধন্য হয়।
রামকুমার ভাবলেন, ছোট ভাইটার মাথা নিশ্চয় খারাপ হয়ে গিয়েছে। লেখাপড়া যখন করবে না তখন দেবসেবাই করুক। তাই বললেন, ব্রাহ্মণের সন্তান, পূজার মন্ত্র তন্ত্র ভাল করে শিখে নে। ব্যাকরণ, শাস্ত্র এসব পড়াশুনা কর।
গদাধর তাতে কোন আপত্তি করে না। পূজার মন্ত্রের বই নাড়াচাড়া করে। রামকুমার টোলে পড়ানো ছাড়া যজমানদের বাড়িতে পূজাও করেন। গদাধরও সঙ্গে যায়। যতক্ষণ দাদা পূজা করেন সব কিছু দেখে গদাধর পূজা মন্ত্র ও আয়ত্ত করে। ঘরে ফিরে এসে পূজার মন্ত্র ও নিয়মকানুন লেখা বই ও দেখে নেয়। কয়েকদিনের মধ্যে তার অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়।
ঝামাপুকুরের পিতাম্বর মিত্তির বাড়ির বিগ্রহের পুরোহিত ছিলেন রামকুমার। একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ায় যেতে পারলেন না। তিনি গদাধরকে বললেন, তুই একটু পুজোটা করে দিয়ে আসবি?।
গদাধর বেশ খুশিমনেই গেল। পূজা করল। তার পূজা দেখে বাড়ির গিন্নিরা ও মেয়েরা কী খুশী। কি সুন্দর মন্ত্রপাঠ করে গদাধর। পূজা করতে করতে সে কখনো যেন তন্ময় হয়ে যায়। মেয়েরা বেশি করে চাল কলা ও নৈবেদ্যর ডালি তাকে দিয়ে দেয়। গদাধর আপত্তি জানিয়ে বলে, এত দিচ্ছ কেন?
