আমেরিকার ক্যারোলিনা, টেনিসি, ভার্জিনিয়া, আরো কয়েকটি প্রদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের ক্যানটিনে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রদের শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ালেন কিং। তাঁরই নির্দেশে অহিংস সত্যাগ্রহের পথ বেছে নিল ছাত্ররা। বহু শ্বেতাঙ্গ ছাত্রও এই দাবিকে সমর্থন জানাল। কয়েক মাস আন্দোলন চলবার পর প্রতিটি প্রদেশেই এই ঘৃণ্য প্রথাকে বিলুপ্ত করা হল। কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররা শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদের সঙ্গে একই সাথে খাবার অধিকার পেল।
আটলান্টা প্রদেশের একটি বিখ্যাত দোকানে তখনো বর্ণবিদ্বেষী প্রথা চালু ছিল। সেখানকার ক্যানটিনে কৃষ্ণাঙ্গদের কোন খাবার অধিকার ছিল না। কিং পঁচাত্তরজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করলেন। তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে খাবার চাইলেন। কিন্তু তাদের সে অনুরোধ রক্ষা করা হল না। শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় কিং ও আরো কিছু ছাত্রকে বন্দী করা হল। সেই সময় কেনেডি নির্বাচনী প্রচারের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর অনুরোধে কিংকে ছেড়ে দেওয়া হল।
ইতিমধ্যে সমস্ত দেশ জুড়ে কৃষ্ণাঙ্গদের সামগ্রিক অধিকার লাভের আন্দোলন গড়ে তোলবার প্রয়োজনীয়তা দেখা গিয়েছিল। সমস্ত দল মিলিতভাবে গড়ে তুলল A Freedom Rird Co-ordinating Commitee। কিং হলেন তার চেয়ারম্যান।
বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ কিংকে তাদের পাশে এসে দাঁড়াবার জন্যে আহ্বান করতে থাকেন। নির্ভীক কিং সর্বত্রই ছুটে গিয়েছেন। এক এক সময় তাঁর জীবন বিপন্ন হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর শ্বেতাঙ্গরা হিংস্রভাবে আক্রমণ করে। সামান্যের জন্য রক্ষা পেয়েছেন কিং। তবুও একটি বারের জন্যেও তিনি হিংসার একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
১৯৬৩ সালে তিনি SCLC-র বার্ষিক অধিবেশনে দেশের সর্বত্র পিকেটিং এবং সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করবার ডাক দিলেন। তিনি সহযোগী সাধারণ মানুষের কাছে ঘুরে ঘুরে অর্থ সাহায্যের জন্য আবেদন করলেন। যাতে আন্দোলনে আহত, নিহত বন্দী মানুষদের পরিবারকে সাহায্য করা হয়।
কিংকে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেপিয়ে তোলবার অভিযোগে বন্দী করা হল। কিং এর ভাই একটি চার্চে প্রার্থনা শেষ করা হল এর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠল কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠলো।
২ মে প্রায় ৬০০০ স্কুল ছাত্র স্কুলে বৈষম্যের প্রতিবাদে প্রতিবাদ মিছিল বার করল। প্রায় ১০০০ ছাত্রকে বন্দী করা হল। পরদিন আরো বহু স্কুলের ছেলেমেয়েরা জমায়েত হল একটি চার্চে। স্থানীয় পুলিশ হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল ছোট ছোট ছেলেমেয়ের উপর। শত শত ছাত্র আহত হল।
আন্দোলন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছল স্থানীয় গভর্নর কিং-এর সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হল। কিং-এর ডাকে সাময়িকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হল। স্কুলে বর্ণবৈষম্য ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হল। এর প্রতিবাদে শ্বেতাঙ্গরা ফেডারেল স্কুলে বোমা ফেলল। বহু নিগ্রো শিশু আহত হল, চারজন মারা গেল। ভয়াবহ দাঙ্গা দেখা দিল। কিন্তু শান্তি আর সত্যের পথে অবিচলিত কিং ছুটে গিয়েছেন দাঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে। তিনি এইবার স্থির করলেন দেশ জুড়ে শুরু করবেন ফ্রিডম মার্চ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওয়াশিংটনে পদযাত্রা শুরু হল। ১৯৬৩ সালের ২৭শে আগস্ট ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালে সমবেত হল প্রায় আড়াই লক্ষের বেশি নিগ্রো। তাদের সামনে ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন কিং, আমি স্বপ্ন দেখছি…।
সেই বছর টাইমস পত্রিকার তরফে কিংকে বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে পুরস্কার দেওয়া হল। কিং শুধু আমেরিকার নন, বিশ্বের মানবতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসাবে স্বীকৃত হয়েছেন। বার্লিনের মেয়র উইলি ব্রান্টির আমন্ত্রণে জামার্নীতে গেলেন। সেখানে তাঁকে অভূতপূর্ব সম্মান দেওয়া হল। তাকে সম্মানিক ডক্টরেট উপাধি দেওয়া হল।
১৯৬৪ সালে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তাকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল। গান্ধীর মতই তিনি জীবন কর্ম সর্বক্ষেত্রেই ছিলেন শান্তির পূজারী। যখন তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর। পুরস্কারের সমস্ত অর্থই তিনি নিগ্রোদের মুক্তি আন্দোলনে দান করলেন।
নিগ্রোদের মানবাধিকারের এই আন্দোলন বিশ্বের সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। প্রেসিডেন্ট জনসন নিগ্রোদের বহু দাবি স্বীকার করে দিলেন। এর মধ্যে ছিল নিগ্রোদের ভোটাধিকার।
১৯৬৫ সালে আমেরিকা ভিয়েৎনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। শান্তির পূজারী কিং ছিলেন যুদ্ধের বিপক্ষে। ভিয়েনামের মত একটি ছোট দেশের উপর আমেরিকার এই আক্রমণকে মেনে নিতে পারলেন না কিং। দেশ জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিগ্রোদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর শ্বেতাঙ্গরা হিংস্রভাবে আক্রমণ করছিল। নিগ্রোরাও এর বিরুদ্ধে পালটা আক্রমণ শুরু করল। সর্বত্রই অহিংস সত্যাগ্রহ হিংসাত্মক আন্দোলনে পরিণত হল। এতে ব্যথিত হতেন কিং। তিনি বার বার সকলকে শান্ত সংযত থাকবার জন্য আহ্বান জানাতেন।
আমেরিকা ক্রমশই ভিয়েৎনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বের বহু বুদ্ধিজীবী মানুষের সাথে কিংও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে তিনি ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিরোধী পদযাত্রা করবার আহ্বান জানালেন আমেরিকার সমস্ত শান্তিকামী মানুষকে। এরই সাথে তিনি ঘোষণা করলেন ২৭শে এপ্রিল দেশ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করবার জন্য আর্থিক নিরাপত্তার দাবিতে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত দরিদ্র মানুষদের সাথে নিয়ে তিনি ওয়াশিংটন অভিযান করবেন।
