শান্তি অভিযানে সেদিন হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল শান্তির আহ্বান।
মেমপিস টেনেসি রাজ্যে নিগ্রো পৌরকর্মীরা শ্বেতাঙ্গদের সমান মাইনে ও কাজের সুযোগ-সুবিধা বাড়াবার জন্য আন্দোলন করছিল। কিং সেখানে গেলেন। কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের একটি দাবিও মেনে নিলেন না। কিছু অল্পবয়সী ছেলে এর প্রতিবাদে ভাঙচুর শুরু হয়ে গেল। পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন মারা পড়ল।
৩রা এপ্রিল কিংকে হত্যার হুমকি দেওয়া হল। তাঁর সহকর্মীরা তাকে অন্যত্র চলে যেতে বললেন। কিন্তু অকুতোভয় কিং বললেন তার যাই ঘটুক না কেন তিনি এখান থেকে যাবেন না। সকলকে হিংসা ত্যাগ করবার আহ্বান জানালেন।
পরদিন তিনি যখন হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আততীয়র বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। সন্ধ্যে সাতটায় চিরশান্তির প্রতীক মার্টিন লুথার কিং তার আদর্শ খ্রীস্ট, গান্ধীর মতই হিংস্র মানুষের হিংস্রতার কাছে আত্মাহুতি দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তখন তিনি ঊনচল্লিশ বছরের এক যুবক।
৮৪. সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২)
বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে বাস করে সত্যজিৎ রায়ের ছবি না দেখে চন্দ্র-সূর্য না দেখার মতই অদ্ভুত ঘটনা।” রবীন্দ্রনাথের পর বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের অপর কেউই বিশ্বের দরবারে এতখানি সম্মান পাননি। ভারতীয় চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু যে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাই নয়, তাকে এক মহত্তর সৌন্দর্যে উত্তরণ ঘটিয়েছেন।
বিরল প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটির জন্ম ১৯২১ সালের ২রা মে। কৃতী বংশের যোগ্য উত্তরপুরুষ। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একমাত্র ঠাকুর পরিবারের সঙ্গেই এই পরিবারের তুলনা করা যায়। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম স্রষ্টা। সাহিত্য ছাড়াও বাংলা ছাপাখানার উন্নতির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিরাট। ১৯০০ সালে তিনি সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত করেন। এখান থেকে বহু বই প্রকাশিত হয়েছিল।
উপেন্দ্রিকিশোরের বড় ভাই সারদারঞ্জন ছিলেন পণ্ডিত মানুষ আর ক্রিকেটের ভক্ত। আরেক ভাই কুলদারঞ্জনও ছিলেন সাহিত্যিক। তাঁর কন্যা বিখ্যাত সাহিত্যিক লীলা মজুমদার। উপেন্দ্রকিশোরের পুত্র সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালে। মাত্র আট বছর বয়স থেকেই শুরু হয় তাঁর ছবি আঁকা, কবিতা লেখা। ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ পত্রিকা চালু করবার পর সুকুমার সেখানে নিয়মিত লিখতেন। ১৯১৪ সালে সুকুমারের বিয়ে হল ঢাকার বিখ্যাত সমাজসেবক কালীনারায়ণ গুপ্তের নাতনি সুপ্রভার সাথে। বিবাহের ৭ বছর পর জন্ম হয় সত্যজিতের। ১৯২৩ সাল, সত্যজিৎ তখন দু বছরের শিশু, কয়েকদিনের জ্বরে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে মারা গেলেন সুকুমার। এই স্বল্প জীবনকালেই তিনি রচনা করেছেন আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল, পাগলা দাশুর মত অসাধারণ শিশু সাহিত্য।
সুকুমারের এই অকাশ মৃত্যু সংসারের উপর বিরাট আঘাত নিয়ে এল। কয়েক বছরের মধ্যেই গড়পারের বাড়ি ছেড়ে হল। সত্যজিৎ মায়ের সঙ্গে এসে উঠলেন মামার বাড়িতে। পিতা না থাকলেও কোনদিন আর্থিক কষ্ট পাননি সত্যজিৎ। মামার বাড়িতে থাকার সময়েই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ জন্মায়। এই অনুরাগ তিনি উত্তরধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন পিতা-পিতামহের কাছ থেকে।
১৯৪০ সালে বি. এ. পাশ করলেন সত্যজিৎ। রবীন্দ্রনাথ খুবই স্নেহ করতেন সত্যজিৎকে। প্রধানত তাঁরই আগ্রহে ভর্তি হলেন শান্তিনিকেতনের শিল্প বিভাগে এখানে নন্দলাল বসুর কাছে ছবি আঁকার তালিম নিতেন। এক বছর পর তিনি ফিরে এলেন কলকাতায়। বাড়িতে বিধবা মা, অন্যের উপর নির্ভর করে কতদিন জীবনধারণ করবেন। ১৯৪৩ সালে ডি. জে. কীমার নামে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি করেছেন।
যখন তিনি কীমারে চাকরি করতেন সেই সময় বাংলা চলচ্চিত্রের মান ছিল নিতান্তই সাধারণ। প্রথম থেকেই সত্যজিতের সাথে পরিচয় হল বংশী চন্দ্রগুপ্ত নামে এক তরুণ শিল্পীর সাথে। বংশী ছিলেন কাশ্মীরের ছেলে। সিনেমার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। আমৃত্যু বংশী ছিলেন সত্যজিতের প্রতিটি ছবির শিল্প নিদের্শক। দুজনে মিলে স্থির করলেন রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসটিকে সিনেমা করেছিলেন।
বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। সিগনেট প্রেস তা বই হিসাবে প্রকাশ করে। এই বইয়ের জন্যে ছবি এঁকেছিলেন সত্যজিৎ। পথের পাঁচালী তাঁর মনকে এত গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, সম্ভবত সেই সময়েই পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করবার কথা ভাবেন।
১৯৪৮ সালে সত্যজিৎ তাঁর মায়ের বৈমাত্রেয় ভাই চারুচন্দ্রের ছোট মেয়ে বিজয়াকে বিয়ে করলেন। দুজনেই পরস্পরকে ভালবাসতেন। শুধুমাত্র পুত্রের সুখের কথা ভেবে সুপ্রভা দেবী এই বিবাহে মত দিলেন। চাকরিসূত্রে কয়েক মাসের জন্য ইংলন্ডে গেলেন সত্যজিৎ। এই সময় তিনি ইউরোপ-আমেরিকার শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের অসংখ্য ছবি দেখতেন। যা দেখতেন গভীরভাবে অনুভব করবার চেষ্টা করতেন। ভারতে ফিরে এসে স্থির করলেন পথের পাঁচালী ছবি করবেন।
