১৯৫৫ সালে মন্টগোমারিতে শুরু হল ঐতিহাসিক বাস ধর্মঘট। সমস্ত নিগ্রোদের তরফে দাবি তোলা হল (১) বাসে নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যে বৈষম্য আছে যে প্রত্যাহার করতে হবে, (২) বাসে যে আগে উঠবে সে আগে বসবে, (৩) নিগ্রোদের সাথে ন্দ্র ব্যবহার করতে হবে, (৪) নিগ্রো এলাকা দিয়ে যে সব বাস চলাচল করে সেই সব বাসের ক্ষেত্রে নিগ্রো ড্রাইভার নিযুক্ত করতে হবে।
নিগ্রোদের সমর্থনে এগিয়ে এলেন নিগ্রো খ্রীস্টান ধর্মযাজকরা। প্রতিষ্ঠা হল মন্টগোমারি ইমপ্রুভমেন্ট এ্যাসোসিয়েশন। মার্টিন লুথার কিংও এর সভাপতি নির্বাচিত হলেন। তিনি এক প্রকাশ্য সমাবেশে সমস্ত নিগ্রোদের উদ্দেশ্যে বললেন যতদিন না মন্টগোমারি বাস কোম্পানির পক্ষ থেকে আমাদের দাবি না মেনে নেওয়া হচ্ছে ততদিন একটি নিগ্রোও বাসে উঠবে না।
প্রায় এক বছর নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিগ্রোরা সমস্ত সরকারী বাস বয়কট করে। কর্তৃপক্ষ বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে শেষ পর্যন্ত নিগ্রোদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হলেন। সুপ্রীম কোর্ট বাসের এই বর্ণবিদ্বেষী ব্যবস্থাকে সংবিধান বিরোধী বলে ঘোষণা করল। অবশেষে M 1 A-এ সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হল। বাসে নিগ্রোদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল।
এই জয়ের পেছনে কিং-এর অবদান ছিল বিরাট। তিনি নিগ্রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গরা সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাকে নানাভাবে ভয় দেখানো হতে থাকে। এমনকি একদিন তার বাড়িতে বোমা ফেলা হল। কিন্তু কোন কিছুর কাছেই মাথা নত করলেন না কিং। পুলিশ নানাভাবে তাকে বিব্রত করতে থাকে। এমনকি তিনি নিগ্রোদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন বলে তাঁকে গ্রেফতার করা হল। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাকে আদালত থেকে ছেড়ে দেওয়া হল।
কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নিগ্রোদের কাছে হয়ে উঠলেন প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন শান্তি আর অহিংসায়। তিনি অন্তরে অনুভব করতেন ন্যায় ও সত্যের সপক্ষে যে সংগ্রাম আরম্ভ করেছেন তা ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই করছেন। শ্বেতাঙ্গরা। তাঁকে বিদ্রূপ করে বলত নিগ্রো ধর্মগুরু।
মন্টগোমারির বাস আন্দোলনে এই গৌরব-উজ্জ্বল ভূমিকায় কি-এর নাম ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত আমেরিকায়। তাঁর এই অহিংস আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে এগিয়ে এল বহু নিগ্রো নেতা। সমস্ত আমেরিকা জুড়েই বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতবািদ জেগে উঠতে থাকে।
১৯৫৭ সালে আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশের নিগ্রো নেতৃবৃন্দ এবং তাছাড়া বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকারের নিগ্রো মন্ত্রীরা মিলিত হলেই আটলান্টা শহরে। নিগ্রোদের সামাজিক ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরো জোরদার করবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হল Southern Christian Leadership Conferance. 77769 TETT S.C.L.C. 1 Tifua লুথার এর সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হলেন, তখন তার বয়স মাত্র ২৮।
কৃষ্ণাঙ্গদের দাবির সপক্ষে ধীরে ধীরে আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠল। ঘানার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উৎসবে যোগদানের জন্য আমন্ত্রিত হলেন মার্টিন লুথার ও আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। এখানে দুই নেতার মধ্যে সাক্ষাৎ হল। নিক্সন নিগ্রোদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এক বছর পর রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে মিলিত হলেন কিং ও অন্যসব নিগ্রো নেতারা। বেশ কয়েকবার আলোচনা বৈঠক বসবার পরেও কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভবপর হল না। সরকারের অধিকাংশ প্রস্তাবই তাদের সপক্ষে মনোমত হল না। কি-এর ভাষায় This is no real or meaningful settement..
দেশের মধ্যে শ্বেতাঙ্গদের আচরণে ক্রমশই বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল। শুধুমাত্র সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, আইনগত ক্ষেত্রেও নানাভাবে নিগ্রোদের বঞ্চনা করা হত। বহু রাজ্যে নিগ্রোদের কোন ভোটাধিকার ছিল না। সরকারী উচ্চপদে বসবার অধিকার ছিল না নিগ্রোদের। কিং আমেরিকার প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে প্রচার করতে লাগলেন, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংসা আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য সমস্ত নিগ্রোদের কাছে আহ্বান জানাতে থাকেন। ধীরে ধীরে প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই আন্দোলন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। কিং হয়ে উঠলেন সমস্ত আমেরিকার নিগ্রো মানুষের অবিসংবাদিত নেতা।
১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জহরলালের আমন্ত্রণে ভারতবর্ষে এলেন কিং ও তার স্ত্রী। ভারতবর্ষ কিং-এর কাছে ছিল এক মহান দেশ। তিনি মহাত্মা গান্ধীর জন্মস্থানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন। কিং ভারত ভ্রমণ শেষ করে যখন আমেরিকায় ফিরে এলেন, আমেরিকা জুড়ে আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। নিগ্রোর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করলেও শ্বেতাঙ্গরা হিংস্র হয়ে ওঠে। নিগ্রোদের মধ্যে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। তারাও পালটা আক্রমণ শুরু করে। সর্বত্রই ভাঙচুর লুঠতরাজ গুলি লাঠি চলতে থাকে। কৃষ্ণাঙ্গদের উপর সমস্ত অভিযোগ এসে পড়ে।
কিছু কিছু কৃষ্ণাঙ্গ নেতা এই অহিংস আন্দোলনের পথ পরিত্যাগের জন্যে কিং-এর কাছে অনুরোধ জানায়। কিং জানতেন তাতে উদ্দেশ্য সাধিত হবে না, শুধু রক্তপাতাই হবে। তিনি এই প্রস্তাব মেনে নিতে পারলেন না। অল্প কিছুদিনের জন্যে ব্যাপটিস্ট মিশনের হয়ে ধর্মযাজকের কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠলেন। তার কাছে ধর্ম ছিল মানবমুক্তির একটি পথ।
