পরের সোমবার থেকে ঘটল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। মন্টগোমারির কোন নিগ্রো আর বাসে চড়লেন না। দিনের পর দিন মাসের পর মাস পায়ে হেঁটে, ঘোড়ার গাড়ি চেপে সাইকেলে করে পরিচিত কারোর গাড়িতে ভাগাভাগি করে যাতায়াত করতে থাকে। রোজার কণ্ঠে সেদিন প্রথম যে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছিল, সেই প্রতিবাদের ভাষাকে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দিলেন একটি মানুষ। অল্পদিনের মধ্যেই সমগ্র আমেরিকার লক্ষ লক্ষ নিগ্রো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হল সেই মানুষটির নাম মার্টিন লুথার কিং। যিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে আমেরিকার বঞ্চিত মানুষদের জন্য এনেছিলেন মুক্তির আলো। তারই মূল্য দিতে শেষ পর্যন্ত গান্ধীর মতই নিজেকে আত্মহুতি দিতে হল।
১৯২৯ সালের ১৫ই জানুয়ারি আমেরিকার দক্ষিণের মন্টগোমারি রাজ্যের আটলান্টা শহরে এক নিগ্রো যাজক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-পিতামহ দুজনেই ছিলেন ধর্মযাজক। পিতামহ রেভারেন্ড ড্যানিয়েল বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন। কিং এর পিতাও ছিলেন সংবেদনশীল প্রতিবাদী মানুষ। পিতা-পিতামহের আদর্শেই শিশুকাল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কিং।
জন্মের পর বাবার নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল মাইকেল কিং। ছ বছর বয়েসে পিতা মাইকেল ঠিক করলেন নাম পরিবর্তন করবেন। পুত্রের নতুন নাম রাখা হল মার্টিন লুথার কিং। একদিন খ্রিস্টান ধর্মের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সেই ধর্মযাজককে নিজের পুত্রের মধ্যে বোধহয় নতুন করে আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন পিতা। ছেলেবেলা থেকেই কিং ছিলেন শান্ত, ধীর, অনভূতিপ্রবণ। স্বাভাবিক চেতনা জন্ম নিতেই তিনি অনুভব করলেন চারপাশের জগতে রয়েছে বৈষম্য আর ঘৃণা। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা তাদের ঘৃণা করে। ট্রামে-বাসে, স্কুলে, কলেজেপথে, ঘাটে, চাকরিতে সর্বত্র রয়েছে সারিতে বসবে শ্বেতাঙ্গ ছাত্ররা, পেছনের বেঞ্চে বসবে নিগ্রোরা। এই সব ঘটনা গভীরভাবে বিচলিত করত কিংকে। একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ওরা আমাদের ঘৃণা করে কেন? মা বেদনাহত কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, আমাদের চামড়ার রং যে কালো। তাই ওরা আমাদের ঘৃণা করে নিগার বলে। পরিণত বয়েসে কিং ছেলেবেলার স্মৃতি স্মরণ করে লিখেছেন, “যখনই আমি মাকে জিজ্ঞাসা করতাম একই সমাজে কেন আমাদের আলাদা হয়ে থাকতে হবে, মা উত্তর দিতেন, একদিন এই বৈষম্য শেষ হবেই। আমিও বিশ্বাস করতাম এই অন্যায়ের প্রতিকার হবেই। কিন্তু কেমন করে হবে তাই শুধু ভাবতাম।”
ছাত্র হিসাবে কিং ছিলেন খুবই মেধাবী। আটলান্টা পাবলিক স্কুল থেকে পাশ করে মোরাহাউজ কলেজে ভর্তি হলেন। ছাত্র অবস্থায় কিং-এর ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হলে তিনি নিগ্রোদের সেবা করতে পারবেন। পিতা-পিতামহ ধর্মযাজক হলেও ধর্মের প্রতি তার তেমন কোন আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু কলেজে পড়বার সময় দার্শনিক থেরোর লেখা “Civil Disobedience” বইটি তার মনের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং তারপরেই তিনি মনস্থির করলেন ধর্মযাজকের জীবন গ্রহণ করবেন। ধর্মযাজক হিসাবেই নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবেন।
কলেজ থেকে পাশ করবার পর ১৯৪৮ সালে ১৯ বছর বয়সে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারিতে ভর্তি হলেন। এ এক ভিন্ন পরিবেশ। এখানে শ্বেতাঙ্গ ও নিগ্রো ছাত্ররা একই সাথে পড়াশুনা করত, কোন বর্ণবৈষম্য ছিল না। পড়াশুনায় বরাবরই মনোযোগী ছাত্র ছিলেন কিং। এখানে ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তকের সাথে দেশ-বিদেশের দার্শনিকদের রচনাবলী পড়তে আরম্ভ করলেন। পড়লেন বিভিন্ন দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। তবে যাঁর জীবন রচনা তাঁর মনকে অধিকার করে নিল তিনি ভারতের মহাত্মা গান্ধী। তিনি বলতেন, নাজারেথের যীশু আর ভারতের গান্ধী আমার জীবনসর্বস্ব। যীশু পথ দেখিয়েছেন, গান্ধী প্রমাণ করেছেন সেই পথ পাঠ আমি পেয়েছিলাম বাইবেল ও খ্রস্টের জীবন আর উপদেশের মধ্যে। আর এই প্রতিরোধের পদ্ধতিটি পেয়েছিলেন গান্ধীর কাছ থেকে।
ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারি থেকে স্নাতক হওয়ার পথ তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। ডিগ্রি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় তার জীবনে আরো একটি প্রাপ্তি ঘটেছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের ছাত্রী ছিলেন কোরো স্কট নামে একটি তরুণী। কিং– এর সাথে প্রথম পরিচয়ে মুগ্ধ হন স্কট। অল্পদিনের মধ্যেই দুজনে পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হবার আগেই ১৯৫৩ সালে দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ডেক্সার গ্র্যাভিনিউয়ের ব্যাপটিস্ট চার্চের যাজক হিসাবে যোগদান করলেন।
ছাত্র অবস্থা থেকেই নিগ্রো আন্দোলনের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। ধর্মর্যাজুক হিসাবে যোগদান করবার পর থেকে তিনি সরাসরি এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেন। সেই সময় নিগ্রোদের প্রধান সংগঠন ছিল National Association for the Advancement of Coloured People (N A A C P)। এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিং-এর দাদু। সেই সূত্রে এবং নিজের ব্যক্তিত্বে অল্পদিনের মধ্যেই এই এ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন কিং।
