নাট্য প্রযোজক জ্যাক গ্রেন তখন একটি নতুন নাটকের খোঁজ করছিলেন। শ-এর নাটক মঞ্চস্থ করবেন।
১৮৯২ সালের ৯ই ডিসেম্বর প্রথম অভিনীত হল এই নাটক। এর বিষয়, ভাষা প্রচলিত রীতি থেকে একেবারে আলাদা। দর্শকরা প্রথমে একে ভালভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু শ নাটকের মধ্যেই তাঁর বক্তৃতায় বললেন, শুধুমাত্র সস্তা আমাদের জন্য নাটক নয়। এ নাটক চিন্তার, ভাবনার, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধির।
দর্শকেরা উপলব্ধি করতে পারে শ-র কথার সার্থকতা। সমস্ত লন্ডন শহরে শুরু হয়ে যায় এর আলোচনা। রাতারাতি নাট্যকার হিসাবে শ-এর নাম আধুনিক নাট্যকার হিসাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তবুও দর্শকরা একে গ্রহণ করতে পারল না। দু রাত্রির পর নাটক বন্ধ করে দেওয়া হল।
এই দুই রাতের অভিজ্ঞতা থেকেই শ উপলব্ধি করলেন নাটকই হবে তাঁর একমাত্র প্রকাশের মাধ্যম। এই নাটকের মধ্যে দিয়েই তিনি নিজেকে তুলে ধরবেন সমস্ত মানব সমাজের কাছে। তার নাটক হবে সমাজের সমস্ত অবক্ষয়, অন্যায়, আদর্শহীনতার বিরুদ্ধে এক মূর্ত প্রতিবাদ।
তিনি অন্তরে অনুভব করছিলেন এক নতুন যুগের আগমনবার্তা। সে যেন সন্তানসম্ভবা নারীর মত প্রকাশের অপেক্ষায় দিন গুণছে।
শ-এর মনোজগতে তখন কাজ করছিল একদিকে সংগীত যা তিনি পেয়েছেন উত্তরাধিকারসূত্রে। অন্যদিকে মার্কসের সমাজতন্ত্রের নতুন চিন্তা
১৮৯৩ সালে প্রকাশিত হল শ-এর দ্বিতীয় নাটক ‘দি ফিলান্ডারার’। নরওয়ের প্রসিদ্ধ নাট্যকার ইবসেনের বিখ্যাত নাটক দি ডলস হাউস-এর নায়িকা নোরা বিবাহিত জীবনের বন্দীদশার বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছিল। এখানে মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করতে পারে না। ইবসেনের এই নাটকের ভক্ত গুণগ্রাহীরা নারী স্বাধীনতার এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করল, তাকে মেনে নিতে পারলেন না শ। তিনি মানুষের অন্ধ উচ্ছ্বাসকে কোন দিনই প্রশ্রয় দেননি। এর বিরুদ্ধেই তিনি লিখলেন তার নাটক।
এ নাটক দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে পারবে না। বিবেচনা করেই কেউ মঞ্চস্থ করবার দায়িত্ব গ্রহণ করল না।
এবার লিখলেন তাঁর তৃতীয় নাটক মিসেস ওয়ারেনস প্রফেশন। মিসেস ওয়ারেনের পেশা হল বেশ্যাবৃত্তি। কেবল ব্যক্তিগত বেশ্যাবৃত্তি নয়, সামাজিক বেশ্যাবৃত্তি। তিনি এই নাটকের মধ্যে দিয়ে বলতে চাইলেন এই বেশ্যাবৃত্তির প্রকৃত কারণ মেয়েদের চরিত্রহীনতা পুরুষের অসংযমী জীবন নয়, এর কারণ মেয়েদের জীবিকা অর্জনের অক্ষমতা, সামাজিক অব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে সমাজের বিরুদ্ধেই তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। It is true that in Mrs. Warren’s Profession, society and not any individual, is the Villain of the Piece… I
এ নাটকও কেউ মঞ্চস্থ করতে সাহস পেল না। অধিকাংশের বক্তব্য এ নাটক নোংরা। তাছাড়া দর্শকরা এ নাটক চায় না। তারা মঞ্চে বেশ্যাদের প্রেম রোমান্টিক জীবনকে দেখতে চায়, বিদ্রূপ আর ব্যঙ্গে ক্ষতবিক্ষত হতে চায় না। তার উপর সেন্সরের ফাঁস পরিয়ে দেওয়া হল এই নাটকের গলায়। এ নাটক অশ্লাশ, সমাজকে কলুষিত করবে। তাই এ নাটক মঞ্চে দেখানো যাবে না।
শ-এর মনে যেটুকু ক্ষীণ আশা ছিল এই নাটক অভিনয়ের, তা একেবারেই তিরোহিত হল। এর চার বছর ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হল “প্লেজ, আনপ্লেজ্যান্ট” গ্রন্থ। এই গ্রন্থের তৃতীয় নাটক মিসেস ওয়ারেনস প্রফেশন। সাথে সাথে সমাজে ঝড় বয়ে গেল। অনেকে অভিমত প্রকাশ করল শ গণিকাদের সমর্থন করেছেন। এর ফলে সমস্ত সমাজ দূষিত হবে।
১৮৯৮ সালে প্রাকশিত হল শ-এর চতুর্থ নাটক আর্মস অ্যান্ড দি ম্যান–২১শে এপ্রিল এই নাটক প্রথম অভিনীত হল। প্রথম দিকে কিছু দর্শক এলেও ক্রমশই দর্শক কমতে আরম্ভ করল। প্রিন্স অব ওয়েলস এই নাটক দেখে বলেছিলেন নাট্যকার নিশ্চয়ই পাগল।
শ এই কথা শুনে বললেন, দুঃখের বিষয় ভগবান আমাকে এই রকম একটা পাগল হিসাবেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে এখন প্রিন্স অব ওয়েলসের চেয়ে এই রকম একটা পাগলেরই দরকার বেশি।
এই নাটকে শ দুটি সত্যকে স্পষ্ট ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এতে তিনি বলছেন যুদ্ধবিগ্রহকে মানুষ নৃশংস বলে মনে করে, সকলেই জানে যুদ্ধবিগ্রহকে মানুষ নৃশংস বলে মনে করে, সকলেই জানে যুদ্ধ মানব জীবনের এক অভিশাপ তবুও তাকে গল্প-গাথা, ইতিহাসে, ছবিতে মহত্তর করে সৃষ্টি করতে চায়। হত্যাকারীরা বীর বলে সকলের কাছে পৃজিত হয়। একেই তীব্র ভাষায় ব্যঙ্গ করেছেন শ। অন্যদিকে তেমনি বিদ্রূপ করেছেন যৌনাচারকে রোমান্সের মোড়কে আবৃত করে সুন্দর হিসাবে প্রকাশ করাকে।
সমসাময়িক মানুষ তার নাটকের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে না পারলেও প্রথম তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। তারা দেখতে পেল যুদ্ধের কি ভয়াবহ রূপ। এই নাটক তখন শুধু ইংলন্ডে নয়, আমেরিকাতেও মানুষ গভীর তৃপ্তিতে উপভোগ করেছে।
আর্মস অ্যান্ড দি ম্যান নাটকে যা কৌতুক হয়ে দেখা দিয়েছে তাই পরবর্তীকালে প্রশান্ত গম্ভীর মহিমান্বিত হয়ে ফুটে উঠেছে তার ম্যান এ্যান্ড সুপারম্যান নাটকে। সৃষ্টি আর ধ্বংসের তত্ত্ব নিয়েই নরকের শয়তানের সাথে ডন জুয়ানের বিবাদ। আর্মস অ্যান্ড দি ম্যান নাটকে প্রতিভার স্পর্শ থাকলেও তাতে পূর্ণতা নেই। সেই পূর্ণতা এসেছে ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান নাটকে।
