পর পর চারটি নাটক লেভার পর শ অনুভব করলেন নিজের মধ্যে এক নতুন শক্তি জেগে উঠেছে। সমালোচকদের উপহাস, তাঁর নাটকের প্রতি দর্শকদের অনাগ্রহ আর তার মনকে সামান্যতম বিচলিত করতে পারল না। শুরু করলেন নতুন নাটক ক্যান্ডিডার। এই নাটক পড়তে পড়তে তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা উইন্ডহাম বলেছিলেন, এখন এ নাটক কেউ বুঝতে পারবে না, আগামী পঁচিশ বছর পর তারা উপলব্ধি করবে এই নাটকের গভীর মর্মবাণী।
১৯০০ সালে লন্ডনের স্ট্রান্ড থিয়েটারে প্রথম অভিনীত হল ক্যান্ডিডার। দর্শকদের অকুণ্ঠ অভিনন্দন পেল এই নাটক। নিজেকে সম্বন্ধে শ বললেন, সব মহৎ নাট্যকারের নাটকে ভাল-মন্দ চরিত্রের ভিড়। কিন্তু শুধুমাত্র তাদের উপস্থাপিত করাই আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য মানুষ কেন ভাল হয়, কেন মন্দ হয় তার কারণ খুঁজে বার করা।
এর আগে শ একটি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন, ‘ম্যান অব ডেস্টিনি’–ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়নের শেষ পর্বই এই নাটকের বিষয়বস্তু।
একদিকে যখন সাংবাদিক হিসাবে কাজ করছেন, অন্যদিকে তখন তিনি রচনা করে চলেছেন একের পর এক নাটক। ম্যান অব ডেস্টিনির পর লিখলেন ইউ নেভার ক্যান টেল (You never can tell) এবং দি ডেভিলস ডিসাইপল (The Devil’s disciple)। দ্বিতীয় নাটকখানি একখানি ঐতিহাসিক নাটক, এতে আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধের ছবি এঁকেছেন শ। যদিও এই স্বাধীনতা যুদ্ধ অন্য যে কোন দেশেরই হতে পারে। এ নাটকের জিজ্ঞাসা হল একজন মানুষ কেন অপর মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে।
এই নাটক প্রথমে অভিনীত হল ইংলন্ডে তারপর আমেরিকায়। প্রচুর অর্থ পেলেন শ। তাঁর যশ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। শ স্থির করলেন আর সাংবাদিকতা নয়, এইবার পুরোপুরি নাটক রচনাতেই মন দেবেন।
খ্যাতি অর্থ যশ যখন শ-এর করায়ত্ত হল তখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন শ। ইংলন্ডে দীর্ঘ কুড়ি বছর কেটেছে অমানুষিক সংগ্রাম আর কঠোর শ্রমে। তখন শরীরের দিকে যত্ন করার মত সামর্থ্য, সময় ছিল না তার। পরিণতিতে বিছানা নিতে হল শকে। ডাক্তাররা পর্যন্ত তাঁর জীবনের আশা ত্যাগ করল। এই সময় শ-এর জীবনে এল চার্লোট পেইন টাউনসেন্ড। ইতিপূর্বেই দুজনের পরিচয় হয়েছিল। বন্ধুত্ব জন্মেছিল। শ যখন অসুস্থ তখন চার্লোট রোমে ছিলেন। শ-এর ঘরে এসে দেখলেন চারদিকে বিশৃঙ্খলা। বৃদ্ধা মা ছাড়া দেখবার কেউ নেই। শ-এর পায়ে এক বিষাক্ত ঘা। চার্লোট রয়ে গেলেন। শ-এর কাছে। দিন-রাত সেবা-যত্নে সুস্থ করে তুললেন শকে। ১৮৯৮ সালের ১লা জুলাই শ একটু সুস্থ হয়ে উঠতেই দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। শ-এর পরবর্তী জীবনে চার্লোট হয়ে উঠেছিলেন তাঁর প্রকৃত সঙ্গিনী, সখী, গৃহিণী, বান্ধবী।
শ-এর প্রথম জীবনে যেমন মায়ের ভূমিকা, পরিণত জীবনে তেমনি চার্লোটের ভূমিকা। ১৯৪৩ সারে তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর শ লিখেছিলেন, গাছে ফুল ফোটে সে গৌরব গাছের, কিন্তু যে সযত্নে গাছকে বাঁচিয়ে রাখে তার কি প্রাপ্য! ফুলের জীবনে মালীর যে ভূমিকা, আমার জীবনে চার্লোটের সেই ভূমিকা।
একটু সুস্থ হতেই স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য বাইরে গেলেন শ। যখন ইংলন্ডে ফিরে এলেন তখন তাঁর সীজার এ্যান্ড ক্লিওপেট্রা নাটক শেষ হয়েছে। এর পর লিখলেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান। এই নাটক অভিনীত হওয়ার সাথে সাথে সকলে স্বীকার করে নিল শ শুধু ইংলন্ডের নন, বিংশ শতকের পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, চিন্তানয়ক। তাঁর রচনার মধ্যে দিয়ে সত্যের শাণিত রূপ ঝলসে উঠেছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মনীষীরা এই নাটক পড়ে অভিনন্দন জানালেন শকে। রাশিয়া থেকে তলস্তয় লিখলেন, “আপনার বিষ্ময়কর নাটকখানি পড়েছি। একবার নয়, তিনবার পড়লাম। এমন বুদ্ধিদীপ্ত লেখা বহুদিন পড়িনি।”
তবে ম্যান এ্যান্ড সুপারম্যান নাটক ইংলন্ডের চেয়ে আমেরিকার দর্শকদেরই বেশি আকৃষ্ট করেছিল।
এর পর শ লিখলেন মেজর বারবার। ইউরোপের স্যালভেশন আর্মিকে ব্যঙ্গ করে এই নাটক লিখেছিলেন।
শ প্রায় সমস্ত জীবন মাথার যন্ত্রণায় ভুগেছেন। এর জন্যে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে গেছেন। কিন্তু কেউ তার মাথার যন্ত্রণা সারাতে পারেনি। এই অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করেই চিকিৎসকদের নিয়ে ব্যঙ্গ করলেন তাঁর “দি ডক্টর্স ডিলেমা” নাটকে।
এই নাটকটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারদের পক্ষ থেকে শ-এর বিরুদ্ধে সকলে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলেন। তারা সরাসরি শ-এর কাছে প্রতিবাদ পত্র পাঠালেন। এর জবাবে শ কৌতুক করে বললেন, “আমাদের সমাজে যত পরগাছা আছে, ডাক্তাররা তার অন্যতম। আমার সামান্য মাথার যন্ত্রণার জন্যে কয়েকজন ডাক্তার মিলে যদি কয়েক হাজার পাউন্ড লুট করে নিতে পারে তাহলে গোটা পৃথিবীতে তাদের লুটের পরিমাণটা কত।”
বলা বাহুল্য এর পরে ডাক্তাররা আর একটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনি।
ছোটদের জন্য শ লিখলেন এ্যান্ডোক্লিস এ্যান্ডক্লিস এ্যান্ড দি লায়ন। এর পর ‘পিগমিলিয়ন’। পিগমিলিয়ন শ-এর প্রথম নাটক যা চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়ে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি অর্জন করল।
৮০ বছর বয়েসে শ-এর মা লুসিন্দা মারা গেলেন। জীবনের শেষ পর্বে এসে পরিপূর্ণ সুখ আর শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।
