স্কুলে পড়াশুনা হল না শ-র। বাড়িতেই পড়াশুনা করতে আরম্ভ করলেন। সারা দিন শুধু পড়া আর পড়া। এই একাগ্রতা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সাথে মিশেছিল অনুরাগ আর মেধা। কিশোর বয়েসেই তিনি সাহিত্য,ইতিহাস, দর্শনের বহু করেছিল শেকস্পীয়রের নাটক। তখনই তিনি মনে মনে কল্পনা করতেন একদিন তিনিও শেকসপীয়রের মত মস্ত বড় নাট্যকার হবেন।
কিন্তু আচমকা সংসারে নেমে এল বিপর্যয়। তাঁর বাবা বড়লোক ছিলেন না। ব্যবসা করে যা আয় করতেন তাতে মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে সংসার চলে যেত। কিন্তু হঠাৎ কারবারে মন্দা দেখা দিল। আয় বন্ধ হয়ে গেল। নিদারুণ অর্থকষ্ট প্রকট হয়ে উঠল। বাধ্য হয়ে শ-কে চাকরি নিতে হল।
শ-এর বয়স তখন পনেরো। এক জমির দলালীর অফিসে মাসে ১৮ শিলিং মাইনেতে চাকরি পেলেন। কিশোর বয়েসে চাকরিতে ঢুকতে হল বলে কোন দুঃখ ছিল না। বাবার কাছে শিখেছিলেন সব কিছুকে সমানভাবে মানিয়ে নিতে।
অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলত তাঁর লেখালেখি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তার কোন লেখাই ছাপা হত না। মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে সম্পাদকের কাছে চিঠি পাঠাতেন। তাতে বেশিরভাগই থাকত অন্যের লেখার সমালোচনা। অবশেষে একদিন তার একটি চিঠি ছাপা হল। চিঠির বিষয় ছিল নিরীশ্বরবাদ। সেটাই তাঁর জীবনের প্রথম মুদ্রিত লেখা। তখন শ-এর বয়েস পনেরো।
শ ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ পরিশ্রমী। অল্পদিনের মধ্যেই অফিসের কাজে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে ক্যাশিয়ারের পদ পেয়ে গেলেন। পাঁচ বছর অফিসে কাজ করলেন। কিন্তু ক্রমশই তার মনে হচ্ছিল এই অফিসের চার-দেয়ালের মধ্যে তিনি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছে তার বড় হবার স্বপ্ন। জীবনে যদি কিছু করতে হয় তাঁকে যেতে হবে লন্ডন শহরে। যেখানে জীবন কাটিয়েছেন তাঁর প্রিয় নাট্যকার শেকসপীয়ার।
চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। বাবা আঘাত পেলেন। সংসারে যে নতুন করে অভাব দেখা দেবে, তার চেয়েও কথা লন্ডনে গিয়ে শ নিজের খরচ চালাবে কেমন করে! ছেলেকে সাহায্য করবেন, তার তো সেই ক্ষমতাও নেই।
অত কিছু ভাববার মত মনের অবস্থা নেই শ-এর। একদিন সামান্য কিছু জিনিস আর সম্বল করে বেরিয়ে পড়লেন লন্ডনের পথে।
১৮৭৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি এসে পৌঁছলেন লন্ডন শহরে। তখন তার মা লন্ডনে তার এক দিদির কাছে ছিলেন। মায়ের কাছে এসে উঠলেন শ। ছেলের ইচ্ছার কথা শুনে তাঁকে নিরুৎসাহিত করলেন না।
কয়েক মাস লেখালেখি করে কেটে গেল। কিন্তু লিখলেই তো পয়সা আসে না। বাধ্য হয়ে একটা চাকরি নিলেন। তখন সবে মাত্র টেলিফোন চালু হয়েছে। শ-এর কাজ হল টেলিফোনের প্রচার করা! অল্পদিনের মধ্যেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। শ-এর চাকরি জীবনও শেষ হয়ে গেল।
ঠিক করলেন আর চাকরি নয়, এবার পুরোপুরি সাহিত্যকেই জীবনে বেছে নেবেন। কাঁধে তুলে নিলেন। শুরু হল ছোট-বড় পত্রিকায় লেখা পাঠানো। দু-চারটি লেখা ছাপাও হল। সামান্য কিছু দক্ষিণাও পেলেন। সব অর্থ শ তুলে দিতেন মায়ের হাতে।
১৮৭৯-১৮৮৫ এই ছয় বছরে তিনি পর পর পাঁচটি উপন্যাস লিখলেন, ইমম্যাচুরিটি, দি এরাশনালনট, লাভ এমং দি আর্টিস্টস, ক্যাসেল বায়রনস প্রফেশন, এ্যান আনসোসাল সোস্যালিস্ট; কিন্তু একটিও উপন্যাস প্রকাশ করবার মত প্রকাশক পাওয়া গেল না। এই সময় একটি পত্রিকার তরফে বলা হল তারা ক্যাসেল বায়রন প্রফেশন উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবে। রাজী হলেন শ। এতে কিছু অর্থও পেলেন। কিন্তু আরো অর্থ চাই। মায়ের উপর নির্ভরশীল জীবন আর ভাল লাগে না।
এই সময়কার কথা বলতে গিয়ে শ পরবর্তী জীবনে বলেছেন, “প্রকৃত শিল্পীরা বড় স্বার্থপর। তারা তাদের বৌদির দু বেলা মুঠো খাবার দেয় না। ছেলেমেয়েদের পোশাক দেয় না, বুড়ি মাকে ঝিয়ের মত খাঁটিয়ে মারে। তবু তারা নিজের শিল্প ছাড়া কোন কাজ করে না।”
এই সময় বাবা মারা গেলেন। বাবাকে খুব ভালবাসতেন শ। এই মৃত্যু তাঁর জীবনে বিরাট একটা আঘাত। কিন্তু থেমে থাকবার মানুষ তো নন শ। তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গিয়ে নিয়মিত পড়াশুনা করতেন। একদিন তাঁর হাতে এল কার্ল মার্কসের ক্যাপিটাল। এই বই পড়ার মত সাথে সাথে তাঁর মনের মধ্যে এক নতুন জগতের দ্বার উন্মোচিত হল। তার মনে হল এই সমাজতন্ত্রই হল নতুন যুগের দিশারী।
একদিকে যখন চলছে পড়াশুনা, অন্যদিকে বিভিন্ন সভাসমিতে গিয়ে নিয়মিত বক্তৃতা দেন। বক্তা হিসাবে তার নাম একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আয় বাড়ে না। কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই একটা পত্রিকায় বিভিন্ন প্রকাশিত বইয়ের সমালোচনা লিখতে হবে। এরই সাথে চিত্র সমালোচনা, সংগীত সমালোচনার কাজও করতেন। অল্পদিনের মধ্যেই তার মাসিক আয় হল দশ পাউন্ড।
এই সমস্ত সমালোচনার মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন শ-র মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি, গভীরতা ছিল প্রচলিত রীতি থেকে একেবারে আলাদা। এমন বুদ্ধিদীপ্ত রচনা দেখে ইংলন্ডের বিদগ্ধ সমাজ মুগ্ধ হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, তিনি সমালোচনার ধারাকে নতুন দিকে পরিবর্তন করলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হলেন ইংলন্ডের একজন শ্রেষ্ঠ সমালোচক হিসাবে।
এই সময় বন্ধু উইলিয়াম আর্চার একদিন তাকে বললেন, ভাল নাটকের বড় অভাব। এখন যারা নাটক লিখছে তাদের অধিকাংশের নাটকই সেই সব নাটকগুলোকেই মঞ্চস্থ করতে হচ্ছে। বন্ধুর কথায় নাটক লেখা শুরু করলেন। নাটকের নাম রাখা হল রাইন গোল্ড। কিছুটা লেখার পর উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন। আর লেখা হল না। তারপর কয়েক বছর কেটে গিয়েছে। একদিন খুঁজে পেলেন অসামপ্ত নাটক। পড়ে ভালই লাগল। কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হল তাঁর নাটক। নাটকের নতুন নাম দেওয়া হল, দি উইডোয়ার্স হাউসেস।
