কোম্পানির মালিক এডিসনকে চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে বললেন, আশা করি আমরা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন এডিসন।
এই অর্থ এডিসনের জীবনে এক পরিবর্তন নিয়ে এল। এতদিন তিনি অন্যের অধীনস্ত হয়ে কাজ করতেন। সেখানে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবার জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করবার সুযোগ ছিল না।
এডিসন স্থির করলেন তিনি একটি কারখানা স্থাপন করবেন। কয়েক মাসের চেষ্টায় নিউজার্সিতে তৈরি হয় কারখানা। মনোমত কিছু পরিশ্রমী বুদ্ধিমান কর্মচারী পেতে বিলম্ব হল না। এডিসন হলেন তাদের মধ্যমণি। দিবারাত্র সেখানে কাজ চলত। রাত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিতেন এডিসন, বাকি সমস্ত সময় কর্মচারীদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে চলতেন। অনেকে জিজ্ঞাসা করত এই কারখানায় কি উৎপাদন হয়? এডিসন জবাব দিতেন অন্যের কারখানায় যা উৎপাদন হয় এখানেই তাই তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে তার কারখানাটি ছিল একটি গবেষণাগার। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় একশোটির বেশি নতুন জিনিস উদ্ভাবন করে তার পেটেন্ট নিলেন। এই সমস্ত পেটেন্ট বিক্রি করে হাতে অর্থও আসতে আরম্ভ করল।
ইতিমধ্যে বিবাহ করেছেন এডিসন। তাঁর স্ত্রীর নাম মেরি স্টীলওয়েল। মেরি এডিসনের কারখানায় তাঁর সহকর্মী হিসাবে কাজ করতেন। মেরি ছিলেন যেমন দক্ষ তেমনি বুদ্ধিমতী। একদিন ঘরের মধ্যে কাজ করছিলেন এডিসন আর মেরি, সামনে বিশাল কাঠের টেবিলে, দুজনে টেবিলের দুপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ এডিসন মেরির দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটি মুদ্রা বার করলেন তারপর টেলিগ্রাফ পাঠাবার জন্য যে সাংকেতিক ধ্বনি ব্যবহার করা হয় (Morse Code), টেবিলে মুদ্রা দিয়ে আঘাত করে সেই সাংকেতিক ধ্বনিতে বললেন,
–মেরি।
মেরিও সাংকেতিক লিপি জানতেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছেন?
এডিসন টেবিলের উপর মুদ্রার ধ্বনি তুলে বললেন,
–তুমি কি আমাকে বিবাহ করতে চাও?
মেরির মুখ লজ্জায় আভায় রাঙা হয়ে উঠল, কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সাংকেতিক বার্তায় বললেন,
-~-আপনাকে পেলে আমি সুখী হব।
অল্প কয়েকদিন পরেই দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। মেরি শুধু এডিসনের স্ত্রী ছিলেন না; ছিলেন তার যোগ্য সহধর্মিনী। এডিসনের সাফল্যের পেছনে তার ভূমিকাও কম নয়। ১৮৮৪ সালে মেরির মৃত্যু হয়। তখন তিনি জিন সন্তানের জননী। মেরির মৃত্যুর দুবছর পর এডিসন মিনা মিলারকে বিবাহ করেন, কিন্তু জীবনের এই পর্বে তাঁর সৃজনীশক্তি আশ্চর্যজনকভাবে হ্রাস পেয়েছিল।
নিজের কারখানায় কাজ করতে করতে, পুনরায় আকৃষ্ট হলেন টেলিগ্রাফির দিকে। অল্পদিনেই তৈরি হল ডুপ্লেক্স টেলিগ্রাফ পদ্ধতি। এর সাহায্যে দুটি বার্তা একই সাথে একই তারের মধ্যে দিয়ে দুই দিকে পাঠানো সম্ভব। এর পরে একই সময়ে একই তারের মধ্যে দিয়ে একাধিক বার্তা প্রেরণ করতে সক্ষম হলেন।
এই পদ্ধতির সাহায্যে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার শুধু যে অসাধারণ উন্নতি করতে সক্ষম হলেন তাই নয়, খরচও কয়েকগুণ হ্রাস পেল।
১৮৭৬ সালে এডিসন তাঁর নতুন কারখানা স্থাপন করলেন মেনলো পার্কে। এখানে একদিকে তার গবেষণাগার অন্যদিকে কারখানা। এই মেনলো পার্কেই এডিসনের প্রথম উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার, টেলিফোন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। টেলিফোন আবিষ্কার করেছিলেন গ্রাহাম বেল কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এডিসনকে অনুরোধ করা হল টেলিফোন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করবার জন্য।
এডিসন কয়েক মাসের চেষ্টার তৈরি করলেন কার্বন ট্রানসমিটার। এতে গ্রাহকদের প্রতিটি কথা স্পষ্ট আর পরিষ্কারভাবে শোনা গেল। এডিসনের খ্যাতি সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। টেলিফোন যন্ত্র নিয়ে যখন এডিসন কাজ করতেন তখন প্রায়ই তার মনে হত যদি এমন কোন যন্ত্র উদ্ভাবন করা যায় যার দ্বারা মানুষের কথাকে যন্ত্রের মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব তাহলে এক যুগান্তর সৃষ্টি হবে। টেলিফোনের কাজ শেষে করে তিনি এই বিষয় নিয়ে শুরু করলেন।
১৮৭৭ সালে বছর শেষ হয়ে এসেছে। একদিন এডিসন তার এক কর্মচারীকে একটি স্কেচ দেখে মডেল তৈরি করতে বললেন, কর্মচারীটি বহুক্ষণ চেষ্টা করেও মডেলটি তৈরি করতে পারল না। এডিসন কারখানার ফোরম্যানের উপর দায়িত্ব দিলেন। ফোরম্যান কিছুক্ষণ স্কেচটি নাড়াচাড়া করে বলল, এ মডেল তৈরি করা অসম্ভব। এইবার নিজেই কাজে হাত দিলেন এডিসন। তিনি মেশিনটি তৈরি করে তার গায়ে ফয়েলের একটি মোড়ক জড়িয়ে দিলেন, তারপর হ্যাঁন্ডেলটা ধরে নাড়াতে নাড়াতে একটা নলের সামনে মুখ রেখে একটা ছড়া বললেন, “মেরির একটা ভেড়া আছে…”
তারপর আবার যন্ত্রটার হাতল ঘোরাতেই এডিসনের কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল যন্ত্রের মধ্যে। যদিও অস্পষ্ট কিন্তু মনে মনে উল্লসিত হয়ে উঠলেন এডিসন। কয়েকদিন চেষ্টায় যন্ত্রটির নতুন রূপ দিলেন এডিসন। তারপর তাতে ধরা পড়ল এডিসন। তারপর তাতে ধরা পড়ল এডিসনের কথা, মেরির কবিতা। সৃষ্টি হল ফোনোগ্রাফ যা আধুনিক কালের গ্রামোফোন রেকর্ড। তখন এডিসনের বয়স মাত্র ত্রিশ বছর।
সমস্ত মানুষ বিস্ময়ে হতবাক। চতুর্দিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ল, “মেনলো পার্কের জাদুকর”। শুধু মানুষের মুখে নয়, বিভিন্ন পত্রিকাতেও এই নামে তাঁকে ডাকা হত।
