এই সময় এডিসন সংবাদ পেলেন একটি ছোট ছাপাখানা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। সামান্য যে অর্থ জমিয়েছিলেন তাই দিয়ে ছাপাখানার যন্ত্রপাতি কিনে ফেললেন, এবার নিজেই একটি পত্রিকা বার করে ফেললেন। সংবাদ জোগাড় করা, সম্পাদনা করা, ছাপানো, বিক্রি করা, সমস্ত কাজ তিনি একাই করতেন। অল্পদিনেই তাঁর কাগজের বিক্রির সংখ্যা বেড়ে গেল। এক বছরের মধ্যে তাঁর লাভ হল একশো ডলার। তখন তাঁর বয়েস পনেরো বছর।
স্টেশনে স্টেশনে ঘোরাঘুরি করতে করতে অনেক রেল কর্মচারীর সাথে আলাপ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। সমস্ত বিষয়েই ছিল তার অদম্য কৌতূহল। একদিন এডিসন মাউন্ট ক্লিসেন্স স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় তাঁর চোখে পড়ল একটি ছেলে লাইনের উপর খেলা করছে। দূরে একটি ওয়াগন এগিয়ে আসছে। ছেলেটির সেদিকে নজর নেই। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে হাতের কাগজ ফেলে দিয়ে এডিসন ঝাঁপিয়ে পড়লেন লাইনের উপর। ছেলেটিকে তুলে নিয়ে লাইন থেকে নিচে নেমে এলেন। ছেলেটি স্টেশনমাস্টারের একমাত্র পুত্র। কৃতজ্ঞ স্টেশনমাস্টার যখন এডিসনকে পুরস্কার দিতে চাইলেন, এডিসন টেলিগ্রাফি শেখবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সানন্দে রাজী হলেন স্টেশনমাস্টার। কয়েক মাসের মধ্যেই নিজের অসাধারণ মেধায় মোটামুটিভাবে টেলিগ্রাফি শিখে নিলেন, সেই সঙ্গে সাংকেতিক লিপি ও তার অর্থ বুঝে নিতে সক্ষম হলেন।
স্টেশন আর রেলগাড়ি হয়ে উঠল এডিসনের ঘর-সংসার। এখানেই তাঁর দিন রাতের বেশির ভাগ সময় কাটত। নিজের ইচ্ছাকে পুরোপুরি কাজে লাগাবার জন্য ট্রেনের মাল রাখবার একটি ছোট ল্যাবরেটরি গড়ে তুললেন। কাগজ বিক্রির ফাঁকে যতটুকু সময় পেতেন এখানে গবেষণার কাজ করতেন। একদিন চলন্ত ট্রেনে তার হাত থেকে একটুকরো আগুন ছিটকে পড়ল কম্পার্টমেন্টের মেঝেতে। সাথে সাথে আগুন জ্বলে উঠল। বহু কষ্টে আগুন নেভানো হল। কিন্তু কন্ডাকটার রাগে ফেটে পড়ল। পরের স্টেশনে আসতেই ল্যাবরেটরির সব জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এডিসনের কানের উপর এক ঘুষি মেরে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিলেন। সেই আঘাতের ফলেই সমস্ত জীবন কানে কম শুনতেন এডিসন। এইবার শুরু হল তাঁর নতুন এক জীবন। স্টাফোর্ড জংশনে রাত্রিবেলায় ট্রেন ছাড়বার সিগনাল দেওয়ার কাজ পেলেন। রাত জেগে কাজ করতে হত আর দিনের বেলায় সামান্য কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে নিজে তৈরি করলেন যেটি আপনা থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে সিগনাল দিত। এক জায়গায় বেশিদিন কাজ করবার অভ্যাস ছিল না এডিসনের। বোস্টন শহরে টেলিগ্রাফ অফিসে অপারেটারের কাজ নিলেন। কিন্তু প্রচলিত কলাকৌশলে কখনো সন্তুষ্ট হতেন না এডিসন। প্রতিমুহূর্তে তিনি চিন্তা করতেন নতুন কোন কৌশল উদ্ভাবন করতে যা আরো বেশি উন্নত আর সহজ।
এডিসন যেখানে চাকরি করতেন সেই অফিস জুড়ে ইঁদুরের ভীষণ উৎপাত। মাঝ মাঝেই তারা যন্ত্রপাতির মধ্যে ঢুকে পড়ে কাজকর্মের ব্যাঘাত ঘটাত। এডিসন একটি যন্ত্র বার করলেন যাতে সহজেই ইঁদুরদের ধ্বংস করা যায়। এছাড়াও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আরো কিছু যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করলেন। কিন্তু তাতে কারোই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেন না।
১৮৬৯ সালে যখন তিনি বোস্টনে চাকরি করছেন তখন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করলেন যা দিয়ে ভোল্ট গণনা করা যায়। এই যন্ত্রের পেটেন্ট পাবার জন্য তিনি আবেদন করলেন। এই যন্ত্রের গুণাগুণ বিবেচনা করে উদ্ভাবক হিসাবে তাকে পেটেন্ট দেওয়া হল। এই পেটেন্ট এডিসনের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। তিনি স্থির করলেন যা কিছু প্রত্যক্ষভাবে মানুষের ব্যবহার্য হিসাবে গণ্য হয়, শুধুমাত্র তেমন জিনিসই তৈরি করবেন। সমস্ত জীবনই তিনি এই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেছেন বোস্টন শহর আর ভাল লাগছিল না। সেখানকার কাজ ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে এলেন নিউ ইয়র্কে। হাতে একটি পয়সা নেই, দুদিন প্রায় কিছু খাওয়া হয়নি। কোথায় যাবেন, কি করবেন কিছুই জানেন না। এমন সময় আলাপ হল এক অল্পবয়সী টেলিগ্রাফ অপরেটারের সাথে। সে এডিসনকে এক উলার ধার দিয়ে গোল্ড ইনডিকেটর (Gold indicator Company) কোম্পানির ব্যাটারি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। দু দিন সেখানে কেটে গেল। তৃতীয় দিন এডিসনের নজর পড়ল অফিসের ট্রানসমিটারটি খারাপ হয়ে গিয়েছে। অফিসের ম্যানেজার, কর্মচারীরা বহু চেষ্টা করেও যন্ত্রটি ঠিক করতে পারছে না। কিছুক্ষণ লক্ষ্য করতেই যন্ত্রটির খারাপ হওয়ার কারণ বুঝতে অসুবিধা হল না এডিসিনের। ম্যানেজারের অনুমতি নিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে ট্রানসমিটারটি ঠিক করে দিলেন। ম্যানেজার খুশি হয়ে তখনই তাকে কারখানার ফোরম্যান হিসাবে চাকরি দিলেন। তার মাইনে ঠিক হল ৩০০ ডলার। কিছুদিনের মধ্যেই নিজের যোগ্যতায় ম্যানেজার পদে উন্নীত হলেন।
ম্যানেজার হিসাবে যে অর্থ পেতেন এডিসন তা দিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় নানান যন্ত্রপাতি কিনে গবেষণার কাজ করতেন। গোল্ড ইন্ডিকেটর কোম্পানি টেলিগ্রাফের জন্য এক ধরনের যন্ত্র তৈরি করত যার ফিতের উপর সংবাদ লেখা হত। এডিসনের মনে হত বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে আরো উন্নত ধরনের যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু তার জন্যে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার। চাকরিতে ইস্তফা দিলেন এডিসন। কয়েক মাস নিরলস পরিশ্রমের পর উদ্ভাবন করলেন এক নতুন যন্ত্র যা আগের চেয়ে অনেক উন্নত আর উৎপাদন ব্যয়ও কম। এডিসন যন্ত্রটি নিয়ে গেলেন গোল্ড ইন্ডিকেটর কোম্পানির মালিকের কাছে। যন্ত্রটি পরীক্ষা করে খুশি হলেন কোম্পানির মালিক। এডিসনকে জিজ্ঞাসা করলেন, কত দামে সে যন্ত্রটি বিক্রি করতে চায়? এডিসন দ্বিধাগ্রস্তভাবে বললেন, যদি পাঁচ হাজার ডলার দাম বেশি বলে মনে হয় আবার তিন হাজার খুব কম হয় তবে কোম্পানি স্থির করুক তারা কি দামে যন্ত্রটি কিনবে।
