একবার এক পত্রিকায় তাঁর সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, এক মহান বিজ্ঞানী।
এডিসন প্রবন্ধটি পড়ে বললেন, আমি বিজ্ঞানী নই, আমি একজন উদ্ভাবক। বিজ্ঞানী হচ্ছেন মাইকেল ফ্যারাডে। তিনি অর্থের জন্য কাজ করেন না। কিন্তু আমি করি। প্রতিটি কাজকেই বিচার করি তার অর্থমূল্য দিয়ে। যে কাজে উপযুক্ত অর্থ পাবার সম্ভাবনা নেই সেই কাজে আমি আগ্রহ প্রকাশ করি না।
প্রকৃতপক্ষে অর্থ নিয়ে নিজের উদ্ভাবিত যন্ত্র বিক্রি করলেও যখন তিনি নিজের গবেষণাগারে কিম্বা কারখানায় কাজ করতেন, তখন তিনি বিজ্ঞানীর মতই নিজের সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর সাধনার বিষয় ছিল যেমন বহু বিচিত্র তেমনি ব্যাপার।
একবার হেনরি ফোর্ড ও টমাস আলভা এডিসন একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। সেখানে বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য খাতা ছিল। তাতে প্রত্যেকের জন্য তিনটি লাইন লেখা ছিল। প্রথম বাড়ির ঠিকানা, দ্বিতীয় পেশা, তৃতীয় কোন বিষয়ে আগ্রহ আছে? এডিসন প্রথম দুটি লাইন শেষ করে তৃতীয় লাইনে লিখলেন, ‘সর্ববিষয়ে।
এতদিন মানুষের শ্রবণযন্ত্র নিয়ে ছিল তার কাজকারবার, এইবার মনে হল ইলেকট্রিক বকারেন্টকে কাজে লাগিয়ে আলো জ্বালাবেন, তখন অবশ্য এক ধরনের বৈদ্যুতিক আলো ছিল কিন্তু তা ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। এডিসনের মনে হল ইলেকট্রিক কারেন্টকে বিভক্ত করা প্রয়োজন কারণ তা না হলে একই লাইনে একাধিক আলো জ্বালানো সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা এডিসনের অভিমতকে অসম্ভব বলে বাতিল করে দিল। কোন কিছুতেই পিছিয়ে পড়ার মানুষ ছিলেন না এডিসন। তিনি তার দক্ষ পঞ্চাশ জন কর্মচারী নিয়ে কাজ শুরু করলেন। প্রথমইে তিনি এমন একটি ধাতুর সন্ধান করছিলেন যার মধ্যে কারেন্ট প্রবাহিত করলে উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে। তিনি বিভিন্ন রকমের ধাতু নিয়ে ১৬০০ রকমের পরীক্ষা করলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “আমি ইলেকট্রিক লাইট সম্বন্ধে যে তিন হাজার তত্ত্ব খাড়া করেছি তাদের অধিকাংশই সঠিক, কিন্তু মাত্র দুটি ক্ষেত্রেই আমি সম্পূর্ণ নির্ভুল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল কার্বন ফিলামেন্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে, আর এই ফিলামেন্টের মধ্যে দিয়েই আলো বিকিরণ করবে।”
দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তৈরি হল কার্বন ফিলামেন্ট। এডিসন নিজেই লিখেছেন সেই চমকপ্রদ কাহিনী। “ফিলামেন্ট তৈরি হওয়ার পর তাকে কাঁচ তৈরির কারখানায় নিয়ে যেতে হবে। ব্যচিলবের (এডিসনের এক সহকর্মী) হাতে কার্বনের ফিলামেন্ট। পেছনে আমি। এমনভাবে দুজনে চলেছি মনে হচ্ছে যেন কোন মহামূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে যাচ্ছি। কাঁচের কারখানায় সবেমাত্র পা দিয়েছি, সম্ভবত অতি সতর্কতার জন্যেই হাত থেকে ফিলামেন্টটি মাটিতে পড়ে দু-টুকরা হয়ে গেল। হতাশ মনে ল্যাবরেটরিতে ফিরে গেলাম। নতুন ফিলামেন্ট তৈরি করে আবার চললাম কাঁচ কারখানায়। কপাল মন্দ, এইবার এক স্বর্ণকারের হাতের স্ক্রু ড্রাইভার পড়ে ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। আবার ফিরে গেলাম। রাত হবার আগেই নতুন একটা কার্বন নিয়ে এসে বাল্বের মধ্যে ঢোকালাম। বারে মুখ বন্ধ করা হল, তারপর কারেন্ট দেওয়া হল। মুহূর্তে চোখের সামনে জ্বলে উঠল বৈদ্যুতিক বাতি।” প্রথম বৈদ্যুতিক বাতিটি প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা জ্বলেছিল। দিনটা ছিল ২১শে অক্টোবর ১৮৭৯ সাল, এডিসন সেদিন কল্পনাও করতে পারেননি তাঁর সৃষ্ট আলো একদিন পৃথিবীর সমস্ত গৃহের অন্ধকার দূর করবে।
প্রথমে তিনি শুধুমাত্র বান্ধের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। এরপর প্রয়োজন দেখা দিল সমগ্র বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির সাধন করা। এডিসন নতুন এক ধরনের ডাইনামো তৈরি করলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার জেনারেটর থেকে শুরু করে। ল্যাম্প তৈরি করা, পর্যন্ত তাকে জ্বালানোর উপায় বার করা সমস্তই তার উদ্ভাবন। যখন নিউইয়র্কে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র গড়ে উঠল, এডিসন ছিলেন একাধারে তার সুপারিনটেন্ডন্ট, তার ফোরম্যান, এমনকি তার মজদুর। এত কাজের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েও কখনো বিব্রত বোধ করতেন না। আসলে দিন-রাতের প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি কাজে লাগাতে চাইতেন। অকারণ বিশ্রাম, হাসি আমোদ সময় কাটাতে চাইতেন না।
একদিন একটি নিমন্ত্রিত বাড়িতে গিয়েছেন তিনি। গৃহকর্তা বিশেষ কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। লোকজনের ভিড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এডিসন। আর অপেক্ষা না করে ফিরে যাবার জন্য বাইরের দরজার সামনে আসতেই গৃহকর্তার সাথে সাক্ষাৎ হল। এডিসনকে দেখামাত্রই তিনি বললেন, “আপনি এসেছেন দেখে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। এখন আপনি কি নিয়ে কাজ করছেন?”
এডিসন সাথে সাথে বললেন, “কি করে আমি বার হতে পারি তাই নিয়ে।”
১৮৪৭ সালে এডিসন তার বিখ্যাত মেনলো পার্ক ছেড়ে ওয়েস্ট অরেঞ্জে এলেন (West Orange)। এই সময় তিনি শব্দের গতির মত কিভাবে ছবির গতি আনা যায় তাই নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করছিলেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে তিনি উদ্ভাবন করলেন ‘কিনেটোগ্রাফ’ যা গতিশীল ছবি তোলবার জন্য প্রথম ক্যামেরা। যখন আমেরিকাতে বাণিজ্যিভাবে ছায়াছবি নির্মাণের কাজ শুরু করার ভাবনা-চিন্তা চলছিল তখন সিনেমার প্রয়োজনীয় সব কিছুই উদ্ভাবন করে ফেলেছেন এডিসন। প্রথম অবস্থায় সিনেমা ছিল নির্বাক। ১৯২২ সালে এডিসন আবিষ্কার করলেন কিনেটোফোন যা সংযুক্ত করা হল সিনেমার ক্যামেরার সাথে। এরই ফলে তৈরি হল সবাক চিত্র।
