তবে এই সব নাটকগুলোতে তাঁর ব্যক্তিগত শিল্প চিন্তা বিশ্লেষণ এত প্রাধান্য পেয়েছে যে নাটকগুলোর গতিস্বতন্ত্রতা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হয়েছে।
এরপরে লেখেন The Master Builder (1892), When we dead awaken (1899)। ইউরোপে যে নারী জাগরণের ঢেউ উঠেছিল, তারই জয়ধ্বনি শোনা যায় শেষের নাটকটিতে।
ইবসেন তাঁর জীবিতকালেই ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসাবে সম্মান পেয়েছেন। ১৮৮০ থেকে ১৯২০–এই দীর্ঘ চল্লিশ বছর ইউরোপের রঙ্গমঞ্চে ইবসেনের প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তার নাটক। ইউরোপে প্রথম তাঁর নাটকের সার্থক মূল্যায়ন করেছিলেন বার্নার্ড শ।
তিনি শুধু যে নাটকের মধ্যে দিয়ে সামাজিক আন্দোলন স্থাপন করেছেন তাই নয়, তিনি নাটকের আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও নিয়ে এসেছেন নতুন যুগ। চিরাচরিত রীতিকে বর্জন করে নাটকের গঠনশৈলীকে সহজ-সরল করেছেন। নাটকে তিনি রোমান্টিকতা বর্জন করে ন্যাচারলিজম বা বাস্তবদের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। বিংশ শতাব্দীর নাট্যকারদের উপর তাঁর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।
জীবিতকালে প্রচুর পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু পুরস্কারের কোন মোহ ছিল না ইবসেনের। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁর লেখালেখি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯০০ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, বিশেষ হাঁটা-চলা করতে পারতেন না। ধীরে ধীরে তার স্মৃতিভ্রংশ হতে থাকে। ১৯০৩ সালে একেবারেই পঙ্গু হয়ে যান। ১৯০৬ সালের ২৩শে মে বেলা আড়াইটের সময় তাঁর জীবন দীপশিখা চিরদিনের মত নিভে গেল।
তাঁর উদ্দেশ্য শ্রদ্ধা জানিয়ে সমালোচক এম, ব্লক বলেছিলেন, Modern Drama begins with Ibsen-যথার্থই তিনি আধুনিক নাটকের জনক।
৮১. টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১)
প্রচলিত অর্থে বিজ্ঞানী বলতে যা বোঝায় টমাস আলভা এডিসন সেই ধরনের বিজ্ঞানী নন। তিনি ছিলেন যন্ত্রবিদ, আধুনিক যন্ত্র সভ্যতায় প্রতিদিন আমরা যে সুফল অনুভব করছি, প্রকৃতপক্ষে তিনিই তার পথিকৃৎ।
তার আবিষ্কৃতি প্রতিটি যন্ত্রটি আজ মানবজীবনের সাথে একাত্ম হয়ে আছে। তাদের বাদ দিয়ে আমরা আমাদের জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাও করতে পারি না।
যখনই আমরা কোন ইলেকট্রিক লাইট জ্বালি, টেলিফোন তুলে অন্যের সাথে কথা বলি, অথবা গ্রামাফোনে রেকর্ড বসিয়ে সুরের মূৰ্ছনায় মুগ্ধ হই, কিম্বা সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখি, তখন কল্পনাও করতে পারি না এ সমস্তই একজন মানুষের সৃষ্টি। গত শতাব্দীতে যে যান্ত্রিক সভ্যতার সূচনা হয়েছিল, এডিসনকে বলা যেতে পারে সেই সভ্যতার জনক।
এডিসনের জন্ম ১৮৪৭ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি কানাডার মিলানে। তার পিতা ছিলেন ওলন্দাজ বংশোদ্ভুত। কয়েক পুরুষ আগে এডিসন পরিবার হল্যান্ড ত্যাগ করে আমেরিকায় এসে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর তারা আমেরিকা ত্যাগ করে কানাডায় এসে বসবাস শুরু করেন। এডিসনের পিতার আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ছেলেবেলার দিনগুলো আনন্দেই কেটেছিল। সাত বছর বয়েসে এডিসনের পিতা মিচিগানের অন্তর্গত পোর্ট হারান নামে একটা শহরে নতুন করে বসবাস শুরু করলেন।
এখানে এসেই স্কুলে ভর্তি হলেন এডিসন। ছেলেবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী ছিলেন তিনি। কিন্তু স্কুলের বাঁধা পাঠ্যসূচী তাঁর কাছে খুব ক্লান্তিকর মনে হত। তাই ক্লাসে ছিলেন সকলের পেছনের ছাত্র। ক্লাসে ছিলেন সকলের পেছনের ছাত্র। ক্লাসে বসে খোলা জানলা দিয়ে বাইরের মুক্ত প্রকৃতির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে প্রায়ই আনমনা হয়ে যেতেন। শিক্ষকরা অভিযোগ করতেন, এ ছেলের পড়াশুনায় কোন মন নেই। শিক্ষকদের কথা শুনে মনে মনে ক্ষুব্ধ হতেন এডিসনের মা। ছোট ছেলের প্রতি তাঁর বরাবরই দুর্বলতা ছিল। তাঁর মনে হত এই ছেলে একদিন বিখ্যাত হবেই। স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলেন এডিসনকে। শেষ হল এডিসনের তিন মাসের স্কুল জীবন। এর পরবর্তীকালে আর কোনদিন স্কুলে যাননি। এডিসন মায়ের কাছেই শুরু হল তার পড়াশুনা।
ছেলেবেলা থেকেই এডিসনের ঝোঁক ছিল পারিপার্শ্বিক যা কিছু আছে, যা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হয়, তা নিয়ে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বার করতে পারেন কিনা দেখবার জন্য ঘরের এক কোণে ডিম সাজিয়ে বসে পড়লেন। কয়েক বছর পর কিশোর এডিসন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার জন্য একটা ছোট ল্যাবরেটরি তৈরি করে ফেললেন তার বাড়ির নিজের তলার একটা ঘরে। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি বলতে ছিল কিছু ভাঙা বাক্স, কিছু। শিশি বোতল, ফেলে দেওয়া কিছু লোহার তার, আর এখান-ওখান থেকে কুড়িয়ে আনা যন্ত্রপাতির টুকরো। অল্প কিছুদিন যেতেই তিনি বুঝতে পারলেন হাতে-কলমে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন যন্ত্রপাতি আর নানান জিনিসপত্রের। বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অর্থ ছাড়া তো কোন পরীক্ষার কাজই চালানো সম্ভব নয়। এডিসন স্থির করলেন তিনি কাজ করে অর্থ সংগ্রহ করবেন। তেরো বছরের ছেলে চাকরি করবে! বাবা মা দুজনেই তো অবাক। কিন্তু এডিসন জেদ ধরে রইলেন, একগুঁয়ে ছেলে একবার যা স্থির করবে কোনভাবেই তার নড়চড় হবে না। অগত্যা মত দিতে হল এডিসনের বাবা মাকে।
কিন্তু তেরো বছরের ছেলেকে কাজ দেবে কে? অনেক খোঁজাখুঁজির পর খবরের কাগজ ফেরি করার কাজ পাওয়া গেল। ট্রেনে পোর্ট হুরোন স্টেশন থেকে ড্রেট্রয়েট স্টেশনের মধ্যে যাত্রীদের কাছে খবরের কাগজ বিক্রি করতে হবে। বিক্রির উপর কমিশন। আরো কিছু বেশি আয় করবার জন্য এডিসন খবরের কাগজের সাতে চকলেট বাদামও রেখে দিতেন। কয়েক মাসের মধ্যেই বেশ কিছু অর্থ সংগ্রহ করে ফেললেন।
