A Doll’s house আর Ghosts নাটক দুটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে সমাজের বুকে যেন ঝড় বয়ে গেল। বিভিন্ন সংবাদপত্রে কুৎসিত ভাষায় ইবসেনের বিরুদ্ধে প্রচার আরম্ভ হল। বলা হল, বিবাহের সুপবিত্র বন্ধনকে অস্বীকার করে ইবসেন সমাজের বুকে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বহু দেশে এই নাটক নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছিল। এমনকি জনগণ ইবসেনকে আক্রমণ করতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু নির্ভীক সৈনিকের নিজের লেখনী থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হননি ইবসেন। তিনি জানাতেন সমাজের ক্ষত দূষিত জঞ্জাল দূর করতে গেলে আঘাত আসবেই।
সমাজের তথাকথিত উঁচুতলার মানুষদের মুখোশ খুলে দেবার জন্য এইবার লিখলেন “An Enemy of the People” (1882)। আগের দুটি নাটকে ছিল বিবাহ, নারী স্বাধীনতা–এইবার দেখালেন সমাজ কল্যাণের নামে ক্ষমতাবান মানুষেরা কি করে অন্যকে শোষণ করে, সমাজকে দূষিত করে।
শহরের স্নানাগারে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ স্নান করে। কিন্তু বাইরে থেকে দূষিত জল এসে স্নানাগারের জলকে স্বাস্থ্যের পক্ষে অযোগ্য করে তুলেছে। ডাক্তার স্টকম্যান চান এই স্নানাগার বন্ধ করে তাকে সংস্কার করা হোক। স্নানাগার বন্ধ হওয়ার অর্থই তা থেকে অর্থ উপার্জন বন্ধ হওয়া। তাই নগরের চেয়ারম্যান, মেয়র, পুলিশ প্রধান অর্থের অভাব দেখিয়ে সংস্কারের কাজ করতে অস্বীকার করেন। ডাক্তার জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সমস্ত বিষয়টি জনগণের কাছে প্রকাশ করতে চাইলে কমিটির পক্ষ থেকে তাঁকে বাধা দেওয়া হল। বলা হল, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সমালোচনা প্রকাশ করার তাঁর কোন অধিকার নেই। কিন্তু ডাক্তার এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। তাঁকে চাকরি থেকে বিতাড়ন করা হল। সংবাদপত্রের মালিকেরা স্নানাগার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগ দিল।
ডাঃ স্টকম্যান একা, তাঁর কন্যাকে স্কুল শিক্ষিকা পদ থেকে ছাঁটাই করা হল। চারদিকে প্রতিকূলতা, ডাক্তারকে বলা হল সমাজের শত্ৰু। কিন্তু সত্যের স্বপক্ষে দাঁড়াতে ভীত হলেন না ডাক্তার। তিনি জানতেন তাঁকে একাই সংগ্রাম করতে হবে “The strongest man in the world is the man who stands most alone.”
এই নাটকের মধ্যে দিয়ে ইবসেন দেখালেন মালিকপক্ষ নিজেদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্য কোন ন্যায় নীতিকেই মানে না। নিজেদের কর্মচারীদের উপর নির্যাতন করতেও তাদের সামান্যতম বিবেক বাধে না। এরই পাশাপাশি দেখালেন সংবাদপত্রগুলোর নিলজ্জ ভণ্ডামি। অর্থের জন্য মিথ্যা অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে এতটুকু বাধে না। সমাজের এই শ্রেণী বৈষম্য, এই অন্যায় অবিচারের কাহিনী ফুটিয়ে তুলে প্রশ্ন রেখেছেন সমাজের প্রকৃত শত্রু কে?
সত্যজিৎ রায় এই কাহিনী অবলম্বন করে তৈরি করেছিলেন তাঁর একটি ছবি “গণশত্রু”। এই ছবি দেখে প্রখ্যাত ইংরেজ সাংবাদিক মন্তব্য করেছিলেন একশো বছর পরেও ইবসেনের এ্যান এনিমি অব দি পিপল এর প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি।
An Enemey of the People-র স্টকম্যান যেন ইবসেনেরই প্রতিরূপ, যিনি ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী। তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজের অন্যায়ের সাথে কোন সমঝোতা নেই। প্রতিবাদ ও সত্যের পথেই আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা যায়। তার এই আদর্শের প্রতিফলন দেখতে পাই ডেনমার্কের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধের সময়। নরওয়ে প্রথমে ডেনমার্কের সাথে যুক্ত ছিল। ১৮১৪ সালে ডেনমার্কের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে সুইডেনের সাথে যুক্ত হয়। রাশিয়া ডেনমার্ক আক্রমণ প্রতিহত করবার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। ইবসেন ডেনমার্কের সহায়তার জন্য নরওয়ে ও সুইডেনের কাছে আবেদন জানালেন, কিন্তু তার আবেদনে নরওয়ে সুইডেন কেউ সাড়া দিল না। তার নীরব দর্শক হয়ে রইল। স্বদেশবাসীর এই আচরণের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ ফেটে পড়েছিল Brand নাটকটিতে।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনদিন রাজনৈতিক আন্দোলন বা দলের সঙ্গে যুক্ত হননি। কিন্তু মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ক্ষুরধার হয়ে উঠেছে। নির্মমভাবে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের মিথ্যাচার, ভণ্ডামি, পারিবারিক জীবনের কলুষতা, মালিক শ্রেণীর হাতে শোষণ লাঞ্ছনাকে লুটিয়ে তুলেছেন তাঁর সাহিত্যের পাতায় পাতায়। এরই মধ্যে দিয়ে তিনি নরওয়েরর মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন।
ইবসেন জীবনের প্রথম পর্যায়ে ছিলেন রোমান্টিক, তারপর হলেন বাস্তববাদী। ১৮৮৪ সালে নাটকে দেখা গেল পরিবর্তন, এই সময়ে লেখা নাটকগুলো প্রধানত প্রতীকধর্মী–The Wild Duck (1889), The lady from the sea (1888), এই নাটকগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় সমসাময়িক জীবনের সমস্যা থেকে সরে গিয়ে সচেষ্ট হয়েছেন মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে। তাঁর Hedda Gables একটি অসাধারণ নাটক। নোরার পরে হেডড়া সবচেয়ে বিখ্যাত নারী চরিত্র। তাকে সমালোচকরা লেডি ম্যাকবেথের সাথে তুলনা করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে হেড়া ঘৃণিত, দুশ্চরিত্র এক নারী। তবুও লেখক সেই পঙ্কের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন পদ্মকে। হেড্ডার সৌন্দর্য বোধ, তার সাহস লেখককে মুগ্ধ করেছে তার মধ্যেকার সব হীনতা, কর্মদর্যতা, প্রতারণার অন্তরালে জীবনের সব বাধাকে অতিক্রম করে মুক্তি পাওয়ার যে তীব্র কামনা, যে দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা, তার মধ্যে দেখা যায় তার কোন তুলনা হয় না। এখানেই তাঁর মহত্ত্বতা।
