এই নাটকে তিনি দেখিয়েছেন একটি ছোট শহরের দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষের ছবি। এদের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠেছে। এখানে সমাজের উপরতলার কিছু মানুষ যাদের মধ্যে আছে বিশালদেহি ধর্মযাজক, প্রবঞ্চক ব্যবসায়ী, অসৎ শাসক আর এদের প্রতিই রয়েছে সমাজের সকলের আনুগত্য। এই মানুষেরাই যেন রাষ্ট্রের প্রতিরূপ।
প্রকৃতপক্ষে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত বলা যেতে পারে ইবসেনের নাট্য সাহিত্যের পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্ব। ১৮৭৭ থেকে ১৮৯০ এই সময়ে রচিত নাটকগুলোর মধ্যেই ইবসেনের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে এবং এই সময়ে লেখা নাটকগুলো তাঁকে শেকস্পীয়র বার্নার্ড শ পিরেনদেল্লোর সাথে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের পাশে সমমর্যাদা দিয়েছে। এই নাটক একদিকে যেমন তাকে বিশ্বখ্যাতি দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সমসাময়িক সমাজে চরম নিন্দিত করেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সমাজে ছিল পুরুষের শাসন। নারীর অবস্থা ছিল শোচনীয়। সব কিছুতেই তাদের পুরুষের শাসন মেনে চলতে হত। আদালতে নারীর কোন অধিকার ছিল না। বিবাহের পর নারীর সব কিছুর স্বামীর সম্পত্তি বলে অভিহিত হত। স্বামীর ইচ্ছ-অনিচ্ছাকেই মেনে চলত স্ত্রীরা। নারীজাতির এই শোচনীয় দশা ইবসেনকে বিচলিত করে তুলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন নারীর আত্মমর্যাদার অধিকার। সমাজে তাদেরও পুরুষের মতই মর্যাদা আছে।
নারীর অধিকারের স্বপক্ষে লিখলেন তার যুগান্তকারী নাটক A Doll’s house (পুতুল ঘর) নোরা ও হেলমার স্বামী-স্ত্রী। হেলমার অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তার স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ইতালি নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল কিন্তু কারোর কাছেই টাকা ছিল না। নোরা বাবার সই জাল করে টাকা জোগাড় করল। কিন্তু সে কথা গোপন করে হেলমারকে বলেছিল তার (নোরার) বাবা মারা যাবার আগে সে টাকা নিয়েছিল। নোরা ভেবেছিল অল্প অল্প করে নেই টাকা শোধ করে দেবে।
তারপর তিন বছর কেটে গিয়েছে। এই টাকা শোক করতে পারেনি নোরা। ঘটনাচক্রে সবকিছু স্বামী জানতে পারে। স্ত্রীকে অভিযুক্ত করে।
ইবসেনের মনে হয়েছে প্রয়োজনে নারীও মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে। কারণ ন্যায় অন্যায় সৎ-অসৎ এর বিচার করবার কোন মাপকাঠি নেই। অবস্থার সাথে সত্য-মিথ্যা পরিবর্তনশীল। তাই অসুস্থ স্বামীকে সুস্থ করে তোলবার জন্যে বৃদ্ধ পিতাকে আর বিব্রত করতে চায়নি। হাতনোটে পিতার সই জাল করে টাকা তুলেছিল। আইন একে অপরাধ বললেও ইবসেনের নৈতিক সমর্থন রয়েছে নোরার প্রতি। কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, প্রয়োজনের সময়ে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ না করে কিছু করবার জন্যে চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় হেলমারের কাছে এই ঘটনা মনে হয়েছে অপরাধ। নোরা তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করে এক প্রশ্ন করেছে, এক কন্যার কি অধিকার নেই এক মৃত্যুপথযাত্রী পিতাকে রক্ষা করা…অথবা কোন স্ত্রীর কি অধিকার নেই তাঁর স্বামীর জীবন রক্ষা করা?
নোরার এই কথার মধ্যে দিয়েই নারীর অধিকার প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠেছে।
কিন্তু হেলমারের কাছে নোরার একমাত্র পরিচয় সে স্ত্রী এবং মা। এর বাইরে স্বতন্ত্র কোন অধিকার নেই।
নোরা বুঝতে পারে স্বামীর চোখে সে একটি পুতুল মাত্র, তার কোন স্বতন্ত্র সত্তা নেই। তাদের বিবাহিত সম্পর্ক ভালবাসা শ্রদ্ধার উপর দাঁড়িয়ে নেই। তাই নোরার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে ওঠে, “আমি বিশ্বাস করি আমিও একজন মানুষ–তোমারই মত আমারও স্বাধীন সত্ত্বা আছে। এবং যে কোন মূল্যেই আমার সেই স্বতন্ত্র সত্তাকে রক্ষা করব।”
পুরুষশাসিত সমাজে হেলমার নোরার এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে মেনে নিতে পারে না। সে বলে ওঠে, নোরার এই আচরণ সমাজের প্রচলিত নিয়মবিরুদ্ধ। নোরা সমাজের নিয়মকেই ভাঙতে চায়। কিন্তু নোরার প্রতিবাদী সত্তা জানতে চায় সমাজ না তার আচরণ- কে সত্য? সে স্বামী সংসার ছেড়ে মুক্ত পৃথিবীর বুকে বেরিয়ে পড়ে, এক আশ্চর্য সুন্দর মুক্ত পৃথিবীর আশায়।
সম্ভবত নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তি ও ব্যক্তিস্বতন্ত্রবাদের ক্ষেত্রে এই নাটক যে সুদূর প্রসারী ভূমিকা নিয়েছিল, বিশ্বসাহিত্যে তার কোন তুলনা নেই। ডলস হাউস শুধু ইবসেনের নয়, বিশ্বসাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ নাটক।
ডলস হাউসের পর রচনা করলেন তার আর একটি বিশ্ববিখ্যাত নাটক Ghosts (1881)। এই নাটকটির নায়িকা মিসেস আলভিংক। তিনি বধূ আবার জননী। তারই জীবনের বিয়োগান্ত কাহিনীর মধ্যে ইবসেন সমাজের বিকৃতি রূপকে নির্মমভাবে উন্মোচন করেছেন। সেই যুগের পটভূমিকায় তিনি হয়ে উঠেছেন দুঃসাহসিক। পুত্র অসওয়াল্ড উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছে পিতার যৌন ব্যাধি। তাঁর মা মিসেস আলভিংকে দেখতে হচ্ছে পুত্রের অমানুষিক যন্ত্রণা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যে স্বামী অন্যায় করে, পাপ করে, তাকে ছেড়ে যাওয়া কি অন্যায়? তাকে উত্তর শুনতে হয়, স্বামীর পাপ-পুণ্যের বিচার করবার কোন অধিকার নেই স্ত্রীর। স্বামী যাই করুক না কেন স্ত্রীকে সংসারের দায়-দায়িত্ব পালন করতে হবে, সন্তান পালন করতে হবে।
কিন্তু মিসেস আলভিং তা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর কাছে এ নারীত্বের অপমান। সমাজের প্রচলিত আইন-কানুনের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ ফেটে পড়ে, “আইন আর নিয়ম এরাই সমাজের সব সমস্যার কারণ,” নোরার মত তার কণ্ঠেও ধ্বনিত হয় I must somehow free myself.
