যখন তিনি ঔষধ কারখানাতে কাজ করতেন তখনই প্রথম তিনি সাহিত্যের দিকে আকৃষ্ট হন। কাজের অবসরে যখনই সময় পেতেন নানান বিষয়ের বই নিয়ে পড়তেন, সাহিত্যচর্চা করতেন। প্রথম কবিতা রচিত হয় যখন তার ১৯ বছর বয়সে। স্থানীয় একটি পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতা রচনার সাথে সাথে রাজনীতির প্রতিও আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দু বছরের মধ্যে তাঁর বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হল। কবি হিসাবে জনগণের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ইতিমধ্যে কিছু অর্থ সঞ্চয় করে ঔষধ কারখানার চাকরি ছেড়ে দিলেন। আসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পড়াশুনা আরম্ভ করলেন। ২২ বছরে তিনি ভর্তি হলেন আসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক সংকীর্ণ পরিবেশ থেকে এলেন এক উন্মুক্ত জগতে। এখানে তিনি পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। গ্রীক নাট্যকারদের নাটক পড়ে তার মনের মধ্যে ধীরে ধীরে নাটক লেখার রচনা করেন Cataline. বন্ধুবান্ধবদের সহযোগিতায় তা প্রকাশিত হল। এর অল্পদিনের মধ্যেই রচনা করলেন The Viking’s Tomb নাটকটি মঞ্চস্থ হল কিন্তু তা কয়েকদিনের বেশি চলল না।
সাহিত্য সাধনায় এত বেশি মনোযোগি হয়ে ওঠেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেন। বাধ্য হয়ে একটি পত্রিকায় কয়েক মাসের জন্য সাংবাদিকের চাকরি নিলেন। নাটকের প্রতি তাঁর ছিল স্বভাবসিদ্ধ আকর্ষণ। সাংবাদিক হিসাবে কাজ করবার সময়েই নাট্যজগতের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৮৫১ সালে ওল বুল নামে একজন বিখ্যাত বেহালাবাদক বার্গেন শহরে একটি রঙ্গমঞ্চ স্থাপন করলেন। তিনি ইনসেনকে এখানে মঞ্চসজ্জা ও কবিতা রচনার জন্য নিযুক্ত করলেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর ইবনেস বার্গেন রঙ্গমঞ্চের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই সময় শুধু যে তাঁর রচিত কয়েকটি নাটক এখানে মঞ্চস্থ করতে পেরেছিলেন তাই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন নাট্যকারদের নাটকের সাথেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাছাড়া নাটক দর্শক রঙ্গমঞ্চ সম্বন্ধেও বিস্তৃত ধারণা হয়। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল। এক বছর পর ১৮৫২ সালে ইবসেনকে দেশ-বিদেশের নাট্যকলার সাথে পরিচিত হবার জন্য বার্গের থিয়েটারের তরফ থেকে একটি বৃত্তি মঞ্জুর করা হল। ইবসেন প্রথমে গেলেন ডেনমার্কে তার পর জার্মানী। জার্মানীতে থাকার সময় তিনি লিখলেন মিড সামার ইভ (Mid summer Eve) নামে একটি নাটক। পরের বছর এই নাটকটি মঞ্চস্থ হল। এই সময় আরো কয়েকটি নাটক লিখেছিলেন। এই সব নাটকগুলোর মধ্যে তার ধারাবাহিক উন্নতির চিহ্ন লক্ষ্য করা গেলেও প্রতিভার কোন পরিচয় প্রকাশ পায়নি। তাছাড়া কোন নাটকই মঞ্চে সফল হয়নি।
বাৰ্গেনের রঙ্গমঞ্চটি দর্শকের অভাব বন্ধ হয়ে গেল। অন্য সকলের মত ইবসেনকেও চাকরি হারাতে হল। সংসারে তখন আর ইবসেন একা নন, সাথে সদ্য বিবাহিতা পত্নী সুসালা থোরসেন। সুসালার বাবা ছিলেন নরওয়ের একজন প্রেম পরিণয়। সুসালা সমস্ত জীবন ছিলেন ইবসেনের যোগ্য সঙ্গিনী।
চাকরি হারিয়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়লেন ইবসেন। অভাব আর দারিদ্র্য দীর্ঘ দিন পর্যন্ত ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী। এক বছর পর ক্রিস্টিয়ানিয়া নরওয়েজিয়ান থিয়েটারের ম্যানেজারের চাকরি পেলেন।
পঁয়ত্রিশ বছর বয়েস পর্যন্ত তিনি প্রায় ৮টি নাটক লিখেছিলেন। এই নাটকগুলোর মধ্যে বিছিন্নভাবে কিছু শিল্পকর্ম থাকলেও কোন মৌলিকত্ব বা পরিণত শিল্পসৃষ্টির প্রকাশ ছিল না। এর মধ্যে একটি নাটক Lover’s Comedy কিছু কিছু নাট্যমোদীর ভাল লাগলেও তার থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারেননি।
এর পরের নাটকে The Pretenders (১৮৬৪) প্রথম তাঁর প্রতিভার চিহ্ন ফুটে উঠল, মাঝখানে কিছুদিন কাব্য নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এই নাটকে পুনরায় গদ্য ভাষা ব্যবহার করতে আরম্ভ করলেন। এয়োদশ শতাব্দীতে নরওয়ের গৃহযুদ্ধের কাহিনী অবলম্বন করে এই নাটক লেখা হয়েছিল।
নরওয়েজিয়ান থিয়েটারের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে আসছিল। চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলেন ইবসেন। নরওয়ের পরিবেশ আর ভাল লাগছিল না ইবসেনের। তাঁর মনে হল এখানকার মানুষ নাটকের মর্মকে উপলব্ধি করতে পারছে না। সরকারী তরফে কিছু অর্থ সাহায্য পেলেন। স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে গেলেন ডেনমার্ক, সেখান থেকে জার্মানি তারপর ইতালির রোম।
রোমের শিল্প-সাহিত্যের পরিমণ্ডল ইবসেনকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করছিল। এখানেই রচিত হল তাঁর প্রথম সার্থক নাটক ব্রানদ (Brand) এটি বিয়োগান্ত নাটক। এই নাটকে নরওয়ের সমাজ জীবনের মূল্যবোধের অভাবকে তুলে ধরেছেন। এরপরেই লিখলেন পীয়েরয়িনত (Peer Gynt} এই দুটি নাটক ইবসেনকে খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা এনে দিল। কিছু পরিমাণে আর্থিক স্বচ্ছন্দ্য এনে দিল।
তিনি একের পর এক রচনা করে চললেন তাঁর নাকট। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য The League of youth (1869), Pillars of Society (1877) এই পর্যায়ের নাটকগুলোর মধ্যে অলংকার ভূষিত রোমান্টিকতার প্রভাব বেশি। যে ইবসেনের লেখনী সমাজের সব অবক্ষয়কে ছিন্নভিন্ন করে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল, জীবনের মধ্য-পর্ব পর্যন্ত তার কোন প্রকাশ দেখা যায়নি। তাঁর Pillars of the Society কে প্রথম বাস্তববাদী রচনা হিসাবে অভিহিত করা যায়। ইবসেন বিশ্বাস করতেন সমগ্র বিশ্বের শুভবোধ একসঙ্গে জাগ্রত করা সম্ভব নয়, কিন্তু ব্যক্তিগত উন্নতি করা সম্ভব। প্রত্যেকটি মানুষ নিজেই তার নৈতিক চিকিৎসা করতে পারে। প্রত্যেকটি নারী-পুরুষ নিজেই নিজেকে শিক্ষা দেবে।
