ফ্লোরেন্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল তিনি দল নির্বাচন সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। এই ধরনের সমালোচনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। অবশেষে এগিয়ে এলেন মহারাণী ভিক্টোরিয়া। তিনি পূর্ণ সমর্থন জানালেন ফ্লোরেন্সকে। স্বেচ্ছাসেবী দলের উদ্দেশ্যে পাঠালেন তাঁর আশীর্বাদ। সব সমালোচনা বন্ধ হয়ে গেল।
সমস্যা সৃষ্টি হল অন্য ক্ষেত্রে। সামরিক বাহিনীর কিছু অফিসার কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে মেয়েরা পুরুষদের সেবা করবে। এতদিন তো এই কাজ পুরুষরাই করে এসেছে। কোন সমালোচনাতেই বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করলেন না ফ্লোরেন্স। তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে রওনা হলেন স্কুটারির দিকে। পনেরো দিন পর তারা এসে পৌঁছলেন স্কুটারির প্রান্তরে। সেখানেই গড়ে উঠেছে আহত সৈনিকদের জন্য হাসপাতাল।
দীর্ঘ পথশ্রমে সকলেই ক্লান্ত অবসন্ন তবুও মুহূর্তের জন্য বিলম্ব করলেন না ফ্লোরেন্স। প্রথমেই গেলেন হাসপাতাল পরিদর্শনে। সেখানকার ভারপ্রাপ্ত একজন অফিসার বললেন, এখানে কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু ফ্লোরেন্স সমস্ত হাসপাতাল ঘুরে দেখলেন সর্বত্রই শুধু অভাব আর অভাব। রুগীদের শোবার মত বিছানা নেই, পরিবার পোশাক নেই, সাবান নেই, খাবার নেই, পাত্র নেই, সবচেয়ে বড় কথা ঔষধ, খাবার যেটুকু আছে প্রয়োজনের তুলনায় নেই বললেই চলে।
সামরিক বিভাগের ভাণ্ডারে যদিও এই সমস্ত জিনিস ছিল কিন্তু নানান বিধিনিষেধের জন্য কিছুই পেলেন না ফ্লোরেন্স। সাথে করে যা কিছু নিয়ে এসেছিলেন তাই দিয়েই কাজ শুরু করলেন।
ইতিমধ্যে আহত সৈনিকদের ভিড়ে হাসপাতাল চত্বর পূর্ণ হয়ে ওঠে। চতুর্দিকে শুধু আর্তনাদ আর যন্ত্রণাকাতর ধ্বনি। সর্বশক্তি নিয়ে আহত মানুষদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন ফ্লোরেন্স। প্রয়োজনীয় সঙ্গতি নেই। একটি সরকারী তদন্তকারী দল ও টাইমস পত্রিকার প্রতিষ্ঠিত ফান্ডের কাছ থেকে কিছু সাহায্য পাওয়া গেল, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অকিঞ্চিৎকর। ফ্লোরেন্স সাহায্যের জন্য দেশবাসীর কাছে আবেদন জানালেন। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে সমস্ত ইংলন্ডের মানুষ দু’ হাতে অর্থ প্রেরণ করতে আরম্ভ করল।
সর্বপ্রথমে হাসপাতাল চতুর পরিষ্কার করবার জন্য ঝাড়ুন তোয়ালের প্রয়োজন দেখা দিল। সরকারী দপ্তরের যে কর্মচারীর কাছে এই সব ছিল, ফ্লোরেন্স বুঝতে পারলেন তা সগ্রহ করতে গেলে আইনের নানা বেড়াজাল পেরিয়ে আসতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তিনি টাইমস্ তহবিলের কাছে আবেদন জানালেন। সেখানেও অনিয়ম। আহত সৈনিকদের জন্য পরিচ্ছন্ন পোশাক দরকার। নিরুপায় হয়ে ফ্লোরেন্স স্কুটারিতে নিজেই একটি বিশাল লন্ড্রী খুলে ফেললেন, ততদিনে পোশাক তোয়ালে আসতে আরম্ভ করেছে। ফ্লোরেন্স আদেশ দিলেন মালের পেটি আসা মাত্রই যেন তা খুলে ফেলা হয়। আইনকানুন আর নিয়মের বেড়াজালে যেন এক মুহূর্ত বিলম্ব না হয়।
ফ্লোরেন্সের আত্মত্যাগ কর্মনিষ্ঠা ভালবাসা মানুষকে উজ্জীবিত করতে থাকে। সকলেই কর্মতৎপর হয়ে ওঠে। হাসপাতাল পরিষ্কার করে আহত সৈনিকদের যত্নের দিকে মনোযোগ দিলেন ফ্লোরেন্স। এতদিন বাহিনীর হাসপাতাল যে পদ্ধতিতে পরিচালিত হত তিনি তার আমূল পরিবর্তন করলেন। সে সমস্ত কর্মচারীরা হাসপাতালের কাজের উপযুক্ত নয় বিবেচনা করলেন, তিনি তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিলেন। একদিকে তিনি ছিলেন দয়ার প্রতিমূর্তি অন্যদিকে কঠিন কঠোর। কাজের সামান্যতম বিশৃঙ্খলা বিচ্যুতি সহ্য করতে পারতেন না।
ফ্লোরেন্স স্কুটারিতে পৌঁছবার কয়েকদিন পর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “ সেই সমস্ত অফিসারদের প্রতি আমার কিছু সহানুভূতি আছে যারা আমার ক্রমাগত চাহিদা পূরণ করতে করতে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই সমস্ত লোক যারা মানুষের মৃত্যু মেনে নিতে পারবে কিন্তু সরকারী কেতা-কানুন ভেঙে একটি ঝটা দেবে না–তাদের প্রতি আমার সামান্যতম সহানুভূতি নেই।”
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রাথমিক কাজকর্ম শেষ করে সমস্ত হাসপাতালকে ঢেলে সাজাবার ব্যবস্থা করলেন। হাসপাতালের কর্মচারীদের স্বতন্ত্র দল তৈরি করে তাদের উপর জিনিসপত্র ভার অর্পণ করলেন। কারোর উপর জিনিসপত্র কেনার ভার পড়ল, কারোর উপর সমস্ত হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা, কারো উপর রুগীদের পোশাক পরিচ্ছদের দায়িত্ব দেওয়া হল। শুধুমাত্র দায়িত্বভার আরোপ করেই নিশ্চিন্ত হলেন না ফ্লোরেন্স। যাতে প্রত্যেককে আপন আপন কর্ম দায়িত্বভার সুষ্ঠুভাবে পালন করে তার দিকে প্রতি মুহূর্তে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। দিনের শেষে সকলের কাজের বিশ্লেষণ করতেন, ভুল-ত্রুটি দূর করে আরো কর্মদক্ষ হয়ে উঠবার পরামর্শ দিতেন।
অল্প কিছুদিনে মধ্যেই সমগ্র হাসপাতালের চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হল। শুধু তাই নয়, নতুন কয়েকটি ওয়ার্ড খোলা হল। চার মাইল অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠল এই হাসপাতাল।
ফ্লোরেন্স ছিলেন এই হাসপাতালের এক সেবার প্রতিমূর্তি। দিন-রাত্রির প্রায় সবটুকু অংশই তার কেটে যেত এই হাসপাতালের আঙিনায়। কখনো তিনি আহতদের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছেন, কখনো তাদের পোশাক পরিয়ে দিচ্ছেন। আবার সহকর্মীদের হাতে হাত লাগিয়ে হাসপাতাল আঙিনা পরিষ্কার করছেন। রুগীদের জন্য খাবার তৈরি করছেন। আবার তিনিই রাতের গভীরে সকলে যখন ঘুমিয়ে আছে, প্রদীপ হাতে রুগীদের বিছানার পাশে ঘুরে বেড়াতেন। রুগীরা মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে দেখত। তাদের। মনে হত এক মূর্তিময়ী দেবী যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সব দুঃখ যন্ত্রণা মুহূর্তে ভুলে যেত তারা। একজন সৈনিক লিখেছেন যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হাঁটতেন, এক অনির্বচনীয় আনন্দে আমাদের সমস্ত মনপ্রাণ ভরে উঠত। তিনি প্রত্যেকটি বিছানার পাশে এসে দাঁড়াতেন। কোন কথা বলতেন না, শুধু মুখে ফুটে উঠত মৃদু হাসি। তারপর তিনি যখন আমাদের অতিক্রম করে যেতেন, তার ছায়া পড়ত আমাদের শয্যার উপর। সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধার সেই ছায়াকেই চুম্বন করত। তারা বলত ‘দীপ হাতে রমণী। এই নামেই তিনি সমস্ত পৃথিবীর মাঝে অমর হয়ে রইলেন। যুদ্ধ যতই এগিয়ে চলল তার কর্মভার বেড়েই চলল। যুদ্ধের প্রয়োজনে যেখানে যত হাসপাতাল তৈরি হয়েছিল, সব হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালের দূরত্ব কিছু কম ছিল না। কিন্তু কোন দায়িত্বভার গ্রহণেই তিনি অসম্মতি প্রকাশ করতেন না। প্রবল তুষারপাত, বৃষ্টির মধ্যেই তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় মৃত্যুর হার হাজারে ষাট থেকে তিনি এসে দাঁড়াল।
