ইউরোপ ভ্রমণ কালেই ফ্লোরেন্সের পরিচয় হয় সিডনি হার্বার্টের সাথে। হার্বার্ট ইংলন্ডের এক আর্লের পুত্র। সম্ভ্রান্ত সুদর্শন সুঠাম চেহারায় এক ৩৮ বছরের যুবক। ফ্লোরেন্সের বয়স তখন ২৮। প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ হলেন ফ্লোরেন্স। এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে ছিল হার্বার্টের মধ্যে। ফ্লোরেন্সের প্রতিভা, তার অন্তস্থিত আকাক্ষাকে উপলব্ধি করতে সামান্যতম বিলম্ব হল না হার্বার্টের। তিনিই প্রথম সম্মান জানালেন, উৎসাহিত করলেন ফ্লোরেন্সের মনের আকাক্ষাকে। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব দুটি জীবনকেই মহৎ উদ্দেশ্য আর মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করতে সাহায্য করেছিল।
আবার দেশভ্রমণে বার হলেন ফ্লোরেন্স। ১৮৪৯ সাল, তখন তার বয়স মাত্র ১৯, প্যারিসে সেন্ট ভিনসেন্ট সোসাইটির একটি বড় হাসপাতাল ছিল আলেকজান্দ্রিয়ায়। সেখানে গিয়ে প্রত্যক্ষ করলেন হাসপাতাল পরিচালনার কাজ।
ইউরোপের যে দেশেই তিনি গেলেন, প্রত্যক্ষ করলেন সেখানকার হাসপাতালের সেবামূলক কাজকর্ম, তার ধারা পদ্ধতি। এইভাবে যেমন তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে, তার সাথে সামান্য যা কিছু নার্সিং-এর বই ছিল সমস্ত পড়ে ফেললেন।
একদিকে যখন চলছিল তাঁর জ্ঞান অর্জন, অন্যদিকে মনের মধ্যে জেগে উঠছিল এক নতুন স্বপ্ন। ইংলন্ডে ফিরে গিয়ে এই সেবার আদর্শকেই জীবনে গ্রহণ করবেন।
দীর্ঘদিন পর স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন ফ্লোরেন্স। তাঁর বাবা-মার মনে হয়েছিল তাদের মেয়ে এইবার নিশ্চয়ই কোন অভিজাত ঘরের ছেলেকে বিবাহ করবে। কিন্তু ফ্লোরেন্স বললেন আমি সেবিকা হতে চাই।
মেয়ের কথা শুনে চমকে উঠলেন বাবা-মা। নানাভাবে ফ্লোরেন্সকে বাধা দেবার চেষ্টা করলেন তারা। কিন্তু নিজের সংকল্পে অটল ফ্লোরেন্স। অবশেষে তাঁর দৃঢ়তার কাছে হার মানতে হল। অশ্রুসিক্ত চোখে কন্যার ইচ্ছায় সম্মতি দিলেন।
লন্ডনের হার্লে স্ট্রীটে ডাক্তাররা একটি মেয়েদের জন্য হাসপাতাল তৈরি করেছিলেন। ফ্লোরেন্স সেই হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্ট পদে যোগ দিলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফ্লোরেন্সের উপর ব্যাপক দায়িত্বভার অর্পণ করল।
ফ্লোরেন্স লক্ষ্য করলেন হাসপাতালের পরিবেশ রুগীদের স্বাস্থ্যের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকূল। চারদিকে নোংরা আবর্জনা, শুধু মাত্র ঔষধ দেওয়া ছাড়া কোন স্বাস্থ্যবিধিই সেখানে মানা হয় না।
ফ্লোরেন্স সর্বপ্রথম হাসপাতাল পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিলেন। চারদিকের নোংরা আবর্জনা পরিষ্কার করা হর। প্রতিটি বন্ধ জানালা খুলে ফেলা হল। মুক্ত বাতাস বইবার। জন্য নতুন জানালা বসানো হল। রুগীদের সেবা-শুশ্রূষার দিকে সর্বাদিক গুরুত্ব দিলেন ফ্লোরেন্স। তিনি বিশ্বাস করতেন শুধু ঔষধ নয়, একমাত্র সেবাই পারে কোন রুগীর নতুন জীবন দান করতে। তাঁর প্রবর্তিত ব্যবস্থায় কয়েক মাসের মধ্যেই হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সুফল দেখা দিল। রুগী মৃত্যুর হারও কমতে থাকে।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল প্রবির্তত নতুন ধারার চিকিৎসা পদ্ধতির সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। লন্ডনের প্রতিটি বড় বড় হাসপাতাল ফ্লোরেন্সকে আমন্ত্রণ জানায় সেখানে যোগ দিতে। সেই সময় ইংলন্ডের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ছিল কিংস কলেজ হাসপাতাল। ফ্লোরেন্সের মনে হল একমাত্র কিংস কলেজে গেলেই তিনি তাঁর শিক্ষা অভিজ্ঞতা হার্লে স্ট্রীটের হাসপাতালের লব্ধ প্রত্যক্ষ জ্ঞানকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারবেন। যখন তিনি নতুন কাজে যোগদানের জন্য সম্পূর্ণভাবে মনস্থির করে ফেলেছেন, ঠিক সেই সময় ইংলন্ডের ভাগ্যাকাশে নেমে এল এক বিপর্যয়।
১৮৫৪ সাল। তুরস্কের বিরুদ্ধে রাশিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করল। বিপন্ন তুরস্ককে সাহায্য করবার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইংলন্ডের সেনাবাহিনী। শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। ক্রিমিয়ার প্রান্তরে এই যুদ্ধ হয়েছিল বলে ইতিহাসে এই যুদ্ধের নাম ক্রিমিয়ার যুদ্ধ।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরেই দি টাইমস পত্রিকার এক সংবাদদাতা যুদ্ধের প্রান্তর ঘুরে এসে জানালেন যুদ্ধে আহত সৈনিকদের অবস্থা ভয়বহ। তাদের সেবার পরিচর্যার জন্য সামান্যতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। প্রতিদিন অসংখ্য সৈনিক মারা পড়ছে। সংবাদপত্রের এই ভাষ্যে দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। জনসাধারণ ক্ষোভে রাগে ফেটে পড়ল। বিচলিত হয়ে পড়লেন দেশের উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীরা। সেই সময় প্রতিরক্ষা দপ্তরের সেক্রেটারি ছিলেন সিডনি হার্বাট। তিনি ফ্লোরেন্সকে লিখলেন যুদ্ধের এই বিশৃঙ্খলা অবস্থায় আহত সৈনিকদের তত্ত্বাবধান করবার মত একজনও উপযুক্ত ব্যক্তি নেই। যদি আপনি এই কাজের ভার গ্রহণ করেন, দেশ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। দেশের এই ডাক উপেক্ষা করতে পারলেন না ফ্লোরেন্স। আত্মীয় পরিজনের সব বাধা ভয়কে উপেক্ষা করে ফ্লোরেন্স হার্বার্টের অনুরোধে সাড়া দিলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে তুরস্কের হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্ট পদে নিযুক্ত করা হল। সাথে সাথে চতুর্দিকে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। একজন সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারের সুন্দরী শিক্ষিত মহিলা যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে আহত সৈনিকদের সেবা করবেন! বিস্ময়ে শ্রদ্ধায় সকলেই অভিভূত। চতুর্দিক থেকে মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ফ্লোরেন্সের দিকে। দান আর উপহারে ভরে উঠল তাদের ভাণ্ডার। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নার্সিং-এর জন্য প্রয়োজনীয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী তৈরি করা। ফ্লোরেন্স ৩৮ জন মহিলার এক দল তৈরি করলেন। তার মধ্যে দশজন রোমান ক্যাথলিক সিসটার, আটজন চার্চের সভ্য, ২০ জন বিভিন্ন হাসপাতালের নার্স।
