তবুও বিশ্রাম নেই ফ্লোরেন্সের। শুধু আহত মানুষের দেহের সুস্থতা নয়, মনের আনন্দের ব্যবস্থা করতেও তিনি সচেষ্ট হয়ে উঠলেন। আহত সৈনিকরা যাতে নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারে, তিনি তার ব্যবস্থা করলেন। প্রতিটি হাসপাতালে গড়ে তুললেন লাইব্রেরি। সেখানে আমোদ-প্রমোদের জন্য শুধু বই ছাড়াও বিভিন্ন সংবাদপত্র আনার ব্যবস্থা করলেন। হাসপাতাল ব্যবস্থার সমস্ত চেহারাটাই পরিবর্তিত হয়ে গেল। এতদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা ভেঙে জন্ম নিল নতুন সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার।
শুধু হাসপাতাল নয়, বহুবার তিনি গিয়েছেন যুদ্ধের প্রান্তরে। বুঝেছিলেন শুধু অস্ত্র বা সামরিক শিক্ষা একজন সৈনিককে তার দক্ষতার চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে না। তাদের জন্যেও পাঠাতেন গরম খাবার, নানান বই।
এই অক্লান্ত পরিশ্রমে তার শরীর ক্রমশই ভেঙে পড়ছিল, মাঝে মাঝই অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি। একবার এত অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ডাক্তাররা প্রায় তার জীবনের আশা ত্যাগ করেছিল। কিন্তু তার অদম্য মনোবল, জীবনীশক্তির তাগিদে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু নষ্ট হয়ে গেল তার সুন্দর চুল, দেহের সৌন্দর্য। আগেকার দেহের শক্তি আর ফিরে পাননি ফ্লোরেন্স।
অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার কাজ করতেন। ডাক্তাররা, উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা তাকে লন্ডনে ফিরে যাওয়ার জন্য বারংবার অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু সকলের সমস্ত অনুরোধই তিনি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, যতক্ষণ না শেষ আহত সৈনিকটি দেশে প্রত্যাবর্তন করছে ততক্ষণ তাঁর পক্ষে স্কুটারি ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের এই অজেয় মনোভাবের জন্য সমস্ত ইংলন্ড তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় প্রশংসায় মুখরিত হয়ে ওঠে। মহারানী ভিক্টোরিয়া তাঁকে লিখলেন, “যেদিন আপনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন সেই দিনটি আমর কাছে বিরাট আনন্দের দিন হবে কারণ সমস্ত নারী জাতিকে আপনি সুমহান গৌরবে মহিমান্বিত করেছেন। আপনার সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করি।”
অবশেষে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটল। ১৮৫৬ সাল, দীর্ঘ দু বছর আহত সৈনিকদের সেবার করে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলে ফিরে চললেন তার স্বদেশভূমিতে। তার সম্মানে ব্রিটিশ সরকার একটি আলাদা জাহাজ পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন, সকলের সাথেই দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সমস্ত দেশ তাঁকে বিপুল সম্মান জানাবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সবিনয়ে সব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করলেন সামান্যতম আকাক্ষা ছিল না। শুধুমাত্র মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের মধ্যে তিনি শুধু নিজেকে একজন সেবিকা নিয়ম ভেঙে নারীকে দিলেন সম্মানের আসন। প্রচলিত কুসংস্কারে নিগড় ভেঙে সেবার কাজকে (Nursing) মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কিন্তু তখনো তার কাজ শেষ হয়নি। তাঁর আদর্শ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজ বাকি রয়ে গিয়েছিল।
ফ্লোরেন্সের ইচ্ছা ছিল দেশে প্রথম নার্সিং স্কুল স্থাপন করবেন। সমগ্র ইংলন্ডের মানুষ তাকে সম্মান জানাতে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড অর্থ তুলে দিল। সেই অর্থে ১৮৫৯ সালে সেন্ট টমাস হাসপাতালে তৈরি হল প্রথম নার্সিং স্কুল, “নাইটিঙ্গেল হোম” যা আধুনিক নার্সিং শিক্ষার প্রথম পাঠগৃহ।
শারীরিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই স্কুলের পঠন-পাঠন পরিচালনা বিধি ব্যবস্থা নিজেই নিরূপন করতেন। নার্সিং শিক্ষার সাথে সাথে সামরিক চিকিৎসা সম্বন্ধেও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। ১৮৫৮ সালে তিনি প্রকাশ করলেন আটশো পাতার একখানি fa59, Note on matters affecting the health, efficiency and Hospital Administration of the British Army, এছাড়া তিনি নার্সিং-এর উপর একাধিক বই লিখলেন।
শুধু নার্সিং নয়, হাসপাতাল পরিচালনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তার মূল্যবান পরামর্শ শুধু ইংলন্ড নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও গ্রহণ করতে থাকেন। সমগ্র হাসপাতাল পরিচালন ব্যবস্থার তিনি আমূল পরিবর্তন করেন।
ভারতবর্ষ সম্বন্ধেও ফ্লোরেন্সের আগ্রহ ছিল গভীর। সিপাই বিদ্রোহের সময় তিনি ভারতবর্ষে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
ফ্লোরেন্সের দেহের কর্মক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে আসছিল। একসময় শারীরিক দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন তিনি। এর পরেও বহু বছর বেঁচেছিলেন তিনি। রোগ যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে তার অন্তরে জেগে থাকত এক গভীর আনন্দ। তিনি তাঁর জীবিতকালেই প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর শিক্ষা, সাধনা ব্যর্থ হয়নি। দেশে দেশে গড়ে উঠছে নার্সিং স্কুল। যে পেশা একদিন ছিল ঘৃণিত তাই হয়ে উঠেছে। পরম সম্মানের। নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নার্সিংকে জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করছে।
জীবিতকালে বহু সম্মান পেয়েছেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। কিন্তু তার আদর্শের বাস্তব রূপ দেখে যে আনন্দ পেয়েছেন তার চেয়ে বড় পাওয়া তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না।
অবশেষে ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট এই মানব দরদী মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয়।
৮. আল ফারাবী (৮৭০-৯৬৬ খ্রি:)
মুসলিম জাতির বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাদের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানে না। জানার তেমন আগ্রহও নেই। আগ্রহ থাকলেও জানার তেমন কোন পথ ও পাথেয় নেই। রাষ্ট্রশক্তি হারা মুসলমানরা তাদের অতীত ঐতিহ্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানকে ধরে রাখতে পারেনি। মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা করে অমুসলিম বিশ্ব আজ উন্নত। অন্যদিকে বর্তমান মুসলিম বিশ্ব তাদের পূর্ব পুরুষদের দেয়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে হারিয়ে আজ মূর্খ ও পরনির্ভরশীল জাতিতে হয়েছে পরিণত। এমন এক যুগ ছিল যখন সমগ্র বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল মুসলমানদের হাতে। জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য ও সভ্যতায় মুসলিম জাতি ছিল উন্নত ও শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ পাকের আশীর্বাদে মুসলিম জাতির মধ্যে ধন্য মানুষের জন্ম হয়েছিল, যারা ছিল ঐশী জ্ঞানে মহিমান্বিত। তাঁদের মধ্যে এবং মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত সম্পর্কে হতভাগা মুসলমানদের অনেকেই জানে না। না জানাটাও অস্বাভাবিক নয়। কারণ মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আজ বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণের অধিকাংশের নামই বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করেছে। তাই বর্তমান প্রজন্মের জানতে হতে তাদের গৌরবোজ্জ্বল হারানো দিনগুলো সম্পর্কে এবং বিভিন্ন মুসলিম মনীষীদের দেয়া জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্কার সম্পর্কে। অগ্নিপুরুষ সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী বাঙালি মুসলমানদের চোখের সামনে তাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাস তুলে ধরার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি তাঁর ‘স্পেন বিজয় কাব্য গ্রন্থে যথার্থই লিখেছেন
